Advertisement
  • বি। দে । শ
  • অক্টোবর ২৯, ২০২৫

মার্কিন ড্রোন নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, ইস্তাম্বুলে ভেস্তে গেল পাক–আফগান শান্তি বৈঠক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মার্কিন ড্রোন নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, ইস্তাম্বুলে ভেস্তে গেল পাক–আফগান শান্তি বৈঠক

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও তলানিতে। সমঝোতা ছাড়াই ভেস্তে গেল ইস্তাম্বুলে দুই দেশের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা হতবাক। যে শান্তি বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, বরং সেখানে গভীর অবিশ্বাস, অনৈক্য এবং প্রতিযোগিতামূলক বিষয় তুলে ধরেছে, বিশেষ করে মার্কিন ড্রোন অভিযান এবং সীমান্ত সন্ত্রাসের বিষয় নিয়ে।

কয়েক দিনের যুদ্ধ শেষে গত ১৯ অক্টোবর কাতারের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইস্তাম্বুলে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসেছিলেন দুই দেশের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু বৈঠকে তাঁরা একমত হতে পারেনি। কোনও সমঝোতা না হওয়ায় দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে। পাকিস্তান চায় তালিবান যেন বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে। তালিবানরা এই বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

ইস্তাম্বুলের বৈঠকটি আশার সঙ্গে শুরু হয়েছিল। বৈঠক বেশ ভালোই এগোচ্ছিল। কিন্তু পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের আচরণে দ্রুত অবনতি ঘটে। আর এই অবনতির মূল কারণ মার্কিন ড্রোন অভিযান ও সীমান্ত সন্ত্রাসের বিষয় নিয়ে। দুই দেশের কর্তারা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন। পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা আফগান প্রতিনিধি ও মধ্যস্থতাকারীদের অসম্মান করেন।

বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, পাকিস্তান প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, তাদের ভূখণ্ড থেকে ড্রোন অভিযানের অনুমতি দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা চুক্তি রয়েছে। পাকিস্তানি কর্তারা জোর দিয়ে জানান, এই চুক্তি ভাঙা যাবে না। এই বিবৃতি আফগান প্রতিনিধেদের ক্ষোভের জন্ম দেয়। তারা দাবি করেন যে, মার্কিন ড্রোনকে আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে দেবে না এমন নিশ্চয়তা পাকিস্তানকে দিতে হবে।

যখন আফগান প্রতিনিধিদল হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা চেয়েছিল, তখন পাকিস্তান প্রথমে নমনীয় বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ইসলামাবাদের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা হঠাৎ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, মার্কিন ড্রোন কিংবা ইসলামিক স্টেটের কার্যকলাপের ওপর তাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এই কারণেই বৈঠক ভেস্তে যায়।

কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের আচরণে অবাক হয়ে যান। একজন পর্যবেক্ষক এই দৃশ্যকে ‘‌কূটনৈতিক মহলে নজিরবিহীন’‌ বলে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তানি প্রতিনিধিরা ধৈর্য হারিয়ে অপমানজনক আচরণ করেছন। পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের প্রধান, আইএসআই-এর স্পেশাল অপারেশনস ডিভিশনের প্রধান, মেজর জেনারেল শাহাব আসলাম, দাবি করেছেন যে আফগান তালিবানরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালিবানসহ সমস্ত সহিংস গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আফগানরা প্রতিনিধিরা বলেন, টিটিপি সদস্যরা পাকিস্তানি নাগরিক, আফগান নয়, পাকিস্তানের নিজস্ব নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করা কাবুলের এখতিয়ারের বাইরে। আইএসআই–এর মেজর জেনারেল আসলাম হলেন সেই পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা, যার বিরুদ্ধে এর আগে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

আফগান প্রতিনিধিরা দৃঢ়ভাবে বলেন যে, তারা আফগান মাটি থেকে পাকিস্তানের উওর কোনও আক্রমণ না ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু  টিটিপি ইস্যুটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। বিনিময়ে, তারা পাকিস্তানকে আফগান আকাশসীমার অখণ্ডতার নিশ্চয়তা দিতে এবং মার্কিন ড্রোন ওড়ানো বন্ধ করার অনুরোধ জানান। এক পর্যায়ে বিতর্কটি সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নেয়, যখন মেজর জেনারেল আসলাম ড্রোন ইস্যুটিকে আলোচনার বাইরে বলে উড়িয়ে দেন।

এই সময় কাতারের রাষ্ট্রদূত হস্তক্ষেপ করেন। তিনি আসলামকে মনে করিয়ে দেন যে, আফগানিস্তানের উদ্বেগ শোনার যোগ্য। উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনার সময়, পাকিস্তানি জেনারেল পাল্টা জবাব দেন যে মার্কিন ড্রোনগুলি কাতারের একটা মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয়। দোহা কেন তাদের থামায় না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তখন কাতারের প্রতিনিধি বলেন, তাদের সঙ্গে আমেরিকার একটা চুক্তি আছে। মেজর জেনারেল আসলামও জানান,  ড্রোন অভিযান নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি আছে।

ইস্তাম্বুল আলোচনার ব্যর্থতা কেবল শান্তি প্রক্রিয়াকেই বন্ধ করে দেয়নি, বরং আফগান-পাক সীমান্তে সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে। আফগান সূত্রগুলি সতর্ক করে দিয়েছে যে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের যে কোনও হামলার জবাবে  কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আফগান ভূখণ্ডে বোমা হামলা করা হলে, ইসলামাবাদকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ইস্তাম্বুল আলোচনার ব্যর্থতা কেবলমাত্র একটা কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয় বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বিপত্তি। এই আলোচনাকে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের একটা বিরল সুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। পরিবর্তে বৈঠকটি তিক্ততা এবং পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যার ফলে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যত আগের চেয়েও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!