- খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ১৪, ২০২৪
আর একলা নয় পয়লা বৈশাখ। নীল ছোঁওয়া আসমান অপূর্ব। ‘জয় বাংলা’ গাইবে বাংলার সব ভাই বোন
অলোকচিত্র: লালিব ইতাহাদুল
এবারের নববর্ষ, একলা বৈশাখ কোনো কোনো স্তরের নিঃসঙ্গতা আর উদাসীনতাকে ঘা মেরে জেগে উঠবে নবীন আনন্দে, মুক্ত চিন্তার, যুক্তি আর বিবেকের পল্লবিত প্রসারে। গ্রাম বাংলার সহজিয়া চালচিত্র আর বর্ষবরণে একাংশ নাগরিকের উদাসীনতার বিবরণ পেশ করতে গিয়ে আশাব্যঞ্জক গল্প শোনালেন বিদ্যাদাতা চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
নতুন বছরে নতুন সূর্য ওঠে। আশমান অসম্ভব নীল। পয়লা বৈশাখের উষ্ণতা ডানা ছড়ায় দিগন্তে। গাজনের সন্ন্যাসীরা উপবীত বিসর্জন দিয়ে আবার নিজের গোত্রে থিতু। আলাদাভাবে বর্ষবরণের ঢাক-কাঁসর বাজে না গ্রামাঞ্চলে। ফরাস পড়ে না। মাইক বাজে না। এক্কেবারে একলা বৈশাখ। পুরোপুরি পর্ণমোচী।
হালখাতার পুরাতনও বিস্মৃতির শীতলপাটিতে ঘুমে অচেতন। উন্নয়নের রেলে চেপে শহুরে হালখাতার প্রকরণ আমাদের গাঁয়ে-ঘরে ঠাঁই নিয়েছে। প্যাকেটে প্যাকেটে লাড্ডু, সোনপাপড়ি, গজা, দানাদার আর শিব-দুর্গা-কালীর ছবি ছাপা গুটনো ক্যালেন্ডার নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন বছরভরের খদ্দেররা। প্যাকেটের মিষ্টান্ন ভাগের সময় প্রায়ই সে কী কাণ্ড! বন্টনে স্বজনপোষণের অভিযোগ তুলে বাড়ির আবহাওয়া বৈশাখের থেকেও গরম হয়ে ওঠে। কালবৈশাখীর প্রহর গোণে। মেঘ অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
বৈশাখস্য প্রথম দিবসে জমির আলে গিয়ে সৌরপ্রণাম করেন কৃষক। বিড়বিড় করে প্রার্থনা করেন, এবার যেন বস্তা দুয়েক বাড়তি ফসল ঘরে তোলা যায়। এই প্রার্থনার মাঝেই বুনো শেয়াল নিরাপদ গর্ত থেকে মুখটা একবার বের করেই ফের ফুড়ুৎ করে অন্ধকারের বুকে হারিয়ে যায়। হালখাতার বুকের সিঁদুর ফলপাকুড়, গণেশের নাদা পেট থেকে শুরু করে অসাবধানে এখানে-সেখানে লেগে যায়। এ বড় স্থায়ী দাগ। চট করে তোলা যায় না। কতজন খরিদ্দার এলেন, কত টাকা জমা হল, কটা প্যাকেট বাঁচল, তার হিসেব মেলাতে হিমশিম খান দোকানের কর্মীরা। মালিকের গরদের পাঞ্জাবি ঘামে চুবচুবে হয়ে ওঠে। ঘাম শুকিয়ে পাঞ্জাবির হাতায়, ঘাড়ে নুনটুকু আটকে থাকে। ঘামের লবণ-জলের স্পর্শে মালিকের গলার সোনার চেন আরও ঝকঝকে হয়ে ওঠে।
বোলানের দল এ-গাঁ ও-গাঁ, দূর-দূরান্তের আসর মাতিয়ে চড়কের সন্ধেয় বাড়ি ফেরে। পা চলে না। আপাদমস্তক ধারাস্নান করে ভরসন্ধেতেই গরম গরম চাট্টি খেয়ে শুয়ে পড়ে। পয়লা বোশেখের সন্ধেয় নিজের গাঁয়ের আসরে গায়। টানা বিশ্রামের পর গান-নাচের জোশ এতটাই বেশি যে সন্ধ্যা থেকে রাত গড়িয়ে গেলেও গান থামতে চায় না।
এবারের নববর্ষে আবার প্রাক ভোটের উল্লাস। দোকানে দোকানে খরিদ্দারদের ভিড় দেখে ভোট প্রচারকরা ঢুঁ মারেন। বোলানতলাতেও হাজির হন। নিজেদের দলের প্রতীকের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে মনে করিয়ে দেওয়ারও হাজারো দস্তুর। কারও স্বরে ঘাপটি মেরে থাকে হুঁশিয়ারির আবহ। কেউ আবার বিনয়ে বিগলিত। ভোটারের কানের গোড়ায় মুখ নিয়ে গিয়ে পাওনাগণ্ডার হিসেব সারেন। কোথাও ‘নিরুপায়’ উষ্ণ অভ্যর্থনা। কোথাও সরব বিরক্তি, ধুর্ বাপু, ভোটতো এখনও অনেক দেরি। মেলা ঘ্যানঘ্যান কোরো না। জমিয়ে বোলানটা শুনতে দাও দিকি।
বসন্ত থেকে ঋতুকে গ্রীষ্মে অভিষিক্ত করে পয়লা বৈশাখ ছুটি খোঁজে। সেই সন্ধান রাতের পাপড়ি উপুর করা বেল ফুলে আঁক কাটে। গ্রীষ্মের প্ররোচনায় বসন্ত দূর দ্বীপবাসিনী। রাত ঘন হয়। বোলানের আসরের জমিতে মূল গায়েনের আকন্দ মালা চাঁদের মায়া আলোয় নগ্ন শাদা হাড়ের বিভ্রম তৈরি করে। মহাবিশ্ব থেকে নেমে মহাকাশের বিস্তার ভেঙে বিস্ময় ভ্রমণে বের হন আমাদের মনের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। তাঁর চরণস্পর্শে জগতের যত পান্না আকারণে সবুজ, চুনি অকারণেই রাঙা হয়ে ওঠে।
এবার পয়লা বৈশাখের আড়ম্বরের অন্য একটা দিকও প্রসারিত। এদিন রাজ্য দিবস পালনের ডাক দিয়েছেন জনমুখী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ব্যাপক সাড়া, নির্বিশেষের। আজ ভোরে, সকালে, দুপুরে ভোটের তথাকথিত তরজাকে নিভিয়ে দিয়ে সম্মেলিত কন্ঠে জয়ধ্বনি গাইবে বাংলার ঘরে যত ভাইবোন, হাতে হাত রেখে নেচে উঠবে তাদের প্রত্যাশা আর আকাঙ্খা, কবি গুরুর বিশ্বাসের বাস্তবকে স্পর্শ করবে সব অর্থেই দিনটি পবিত্র, মহিমাময়। বাংলা দিবসের আয়োজনের উর্ধ্বারোহণ শুরু। পূর্ণতার পথে এর শেষ নেই। শূণ্যতা আর অবক্ষয়ের শত্রু সে, মিলন আর অন্তরা তার গন্তব্য। সঙ্গী তার কালহীন অনিঃশেষ। জয় বাংলা।
❤ Support Us








