Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ১, ২০২৫

জানুয়ারিতে শুরু সারা দেশে বাঘ সুমারি। কর্ণাটক, ওড়িশার বনাঞ্চলে জোর প্রস্তুতি, উত্তরবঙ্গ ও সুন্দরবনে ক্যামেরা–ট্র্যাপ মোতায়েন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জানুয়ারিতে শুরু সারা দেশে বাঘ সুমারি। কর্ণাটক, ওড়িশার বনাঞ্চলে জোর প্রস্তুতি, উত্তরবঙ্গ ও সুন্দরবনে ক্যামেরা–ট্র্যাপ মোতায়েন

মানুষ-প্রাণী সংঘর্ষ বাড়ছে। বিশেষত বাঘের ধরপাকড় ও স্থানান্তর নিয়ে রাজ্যগুলির মাথাব্যথা তুঙ্গে। ঠিক সে সময়ই দেশজুড়ে শুরু হতে চলেছে সর্বভারতীয় বাঘ গণনা। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই ময়দানে নামছে বন দফতর। কর্ণাটক থেকে উত্তরবঙ্গ, সুন্দরবন থেকে ওড়িশা, প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। কেন্দ্রীয় বন মন্ত্রকের লক্ষ্য, ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত রিপোর্ট।

কর্ণাটকের বেঙ্গালুরু সার্কেলে ইতিমধ্যেই বনকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যস্ততা। প্রিন্সিপাল চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট (ওয়াইল্ড লাইফ) পি.সি. রাই জানান, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে বাঘের মূল্যায়ন। প্রথমে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ এলাকার কাজ হবে এবং এরপর দেশের অন্যান্য বনাঞ্চলে প্রসারিত হবে। তবে, প্রকৃত কাজ হবে তিন ধাপে। প্রথম ধাপে মাংসাশী প্রাণী এবং শিকারভিত্তির ঘনত্বের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট এবং তৃতীয় ধাপে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে প্রাপ্ত চিত্র এবং তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে। তবে গোল বেঁধেছে একটি জায়গায়। প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ না হওয়ায় কর্ণাটকের বার্ষিক বাঘ গণনা, যা নভেম্বরের শেষের দিকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা পিছিয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় বন দফতর সব বাঘ-রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছে এবার থেকে একটি সমন্বিত ক্যালেন্ডার অনুসরণ করতে, যাতে এম-স্ট্রাইপস পোর্টাল এবং মোবাইল অ্যাপ-এ তথ্যের দ্বৈততা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়।

একই সঙ্গে কর্ণাটক বন বিভাগের সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট চিন্তায় ফেলেছে সবাইকে। কর্ণাটক বন বিভাগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫টি প্রধান বাঘ সংরক্ষণাঞ্চলে বাঘের সংখ্যা ২০২০ সালে ৪০৩ থেকে ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯৩। যদিও জাতীয় স্তরের গণনা দেখাচ্ছে, রাজ্যে বাঘের সংখ্যা ২০১০ সালে ৩০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২ সালে ৫৬৩-এ পৌঁছেছে। ৭৮৫ বাঘ নিয়ে কর্ণাটক দেশের মধ্যে মধ্যপ্রদেশের পরে দ্বিতীয় স্থানে রইয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দিপুর এবং নাগরহোলে টাইগার রিজার্ভে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বাঘ থাকায় বাঘে-মানুষে সংঘর্ষ বাড়ছে। তাই বন দফতর নতুন, নিরাপদ আবাসে বাঘ স্থানান্তরের নীতি গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গে বাঘ গণনা নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নেওরা ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক এবং বক্সা টাইগার রিজার্ভে। নেওরা ভ্যালিতে ২০১৭ সালে ৪০ বছর পর বাঘ দেখা যায়। এরপর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেও বাঘের উপস্থিতি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বক্সা টাইগার রিজার্ভে দীর্ঘ ৩০ বছর পর ২০২১ সালে বাঘের ছবি ধরা পড়ে এবং সর্বশেষ দেখা মেলে ২০২৩ সালের শেষ দিনে। বনকর্মীরা তাই দুই অঞ্চলকেই সম্পূর্ণ ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। নেয়োরা ভ্যালি ১৬০ বর্গকিলোমিটারে বিভক্ত করা হয়েছে এক বর্গকিলোমিটারের গ্রিডে, যেখানে প্রতিটি গ্রিডে দুটি হাইটেক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বক্সা টাইগার রিজার্ভ ৭৬০ বর্গকিলোমিটারে বিভক্ত করা হয়েছে দুই বর্গকিলোমিটারের গ্রিডে, যেখানে প্রতিটিতে জোড়া ক্যামেরা বসানো হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সিসিএফ (বন্যপ্রাণ) ভাস্কর জেভি জানিয়েছেন, ‘নেওরা এবং বক্সায় বাঘের উপস্থিতির একাধিক নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এবার বন দফতর বিশেষ নজর দিচ্ছে ওই দুই অঞ্চলে। বক্সা টাইগার রিজার্ভের মূল এলাকা থেকে ভুটিয়া বস্তি এবং গাঙ্গুতিয়া গ্রাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করা যায়। তবে বাঘ সে অঞ্চলে কতটা ঘর বাঁধবে, তা সময়ই বলবে।’

এই গণনা কেবল নেয়োরা এবং বক্সা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। কার্শিয়াং ফরেস্ট ডিভিশন, সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক, মহানন্দা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, গরুমারা এবং জলদাপাড়া ন্যাশনাল পার্ক এবং চাপড়ামারি অভয়ারণ্যও এই উদ্যোগের অংশ। প্রত্যেক বনাঞ্চলে বনকর্মীরা প্রায় দিনভর টহল দিয়ে পায়ের ছাপ, নখের আঁচড়, গাছের দাগ এবং অন্যান্য চিহ্ন সংগ্রহ করছেন। এরপর ডিসেম্বরের শুরু থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত থাকবে ক্যামেরা-ট্র্যাপ। তথ্য বিশ্লেষণ করে সঠিক বাঘ সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। সুন্দরবনে ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে বাঘ গণনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ২৫ নভেম্বর থেকে পাঁচ দিনব্যাপী অভিযান চলেছে, তবে ক্যামেরাগুলো দেড় মাসের জন্য স্থাপন করা হয়েছে। পরে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ, সজনেখালি অভয়ারণ্য এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি, রামগঙ্গা ও মাতলা রেঞ্জ সহ সমগ্র অঞ্চলে মোট ১,৪৮৪টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে বনকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০০ এর বেশি। দ্বিতীয় ধাপে অ্যাপের মাধ্যমে পাগমার্ক বিশ্লেষণ করা হবে।

ওড়িশার কেওনঝর বন বিভাগও ১০৫টি বনাঞ্চলে ব্যাপক বাঘ গণনা শুরু করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মাংসাশী প্রাণীর চিহ্ন, খুরওয়ালা প্রাণীর সংখ্যা এবং উদ্ভিদবৈচিত্র্য যাচাই করা হচ্ছে। স্থানীয় বনকর্মীরা জানিয়েছেন, আতেই রিজার্ভ ফরেস্টে বাঘের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ক্যামেরা-ট্র্যাপের মাধ্যমে পুরো বনাঞ্চল পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তিন ধাপের দেশব্যাপী একইসঙ্গে পরিচালিত বাঘ গণনা শেষ পর্যন্ত কতটা নতুন চমক আনবে, তা নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে বিশেষজ্ঞদের। শিকারভিত্তির ঘনত্ব থেকে বন আচ্ছাদন—সবই বদলে যাচ্ছে দ্রুত। কোথাও বাঘ বাড়ছে, কোথাও আবার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। সেই বাস্তব ছবিটাই এবার সামনে আসতে চলেছে বলে আশাবাদী কেন্দ্রের বনদফতর।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!