Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ২৭, ২০২৪

হলুদ মানুষেরা

ময়ূরী মিত্র
হলুদ মানুষেরা

চিত্র: দেব সরকার

 
কটকটে হলুদ চামড়ায় জ্বলজ্বলে কালো ডোরা৷ জীবের চামড়ার রঙ, তার মধ্যে কোথাও একটু কমাবাড়া নেই গা ! ছ-ছটা জেব্রা একই পরিমাণ হলুদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ মুখের কাছে ছটা খুরিতে রাবড়ি৷ খেয়েই লাফ দিল ছয় জেব্রা ৷ সেই – একই পরিমাণ উচ্চতায় ৷ লাফের সঙ্গে ঘুঙুরের আওয়াজ৷ একী ! জেব্রাগুলোর পায়ে ঘুঙুর বাঁধল কে ! দেখো দিকিনি! কী বিচ্ছিরি আওয়াজ করে ছুটবে এখন গঙ্গার পাড় দিয়ে! সেখানে আবার পরপর সাজানো চিতা৷ মোহিনীমোহনের পোষ্যের ঝুমঝুমে শবগুলো যদি বুক চিতিয়ে উঠে দাঁড়ায় ! নাহ ! মহা ঝামেলায় পড়া গেল ! নিশ্চয় এ কমলপদ্মের কাজ ! এ বাড়ির মালিকের সঙ্গে সঙ্গে তার পোষ্য ধরেও টান দিচ্ছে আজকাল৷
 
–কমল…পদ্ম…কমলপদ্ম…ধরে দাও…ধরে দাও শিগগির জেব্রাগুলোকে৷ কী সাহস তোমার ! আমার বাবার জেব্রাগুলোকে ঘুঙুর পরাও তুমি কোন আক্কেলে ? জান না, বাবা দুবেলা গঙ্গা চান করেন ! নিজের পায়ের বিষঘুঙুর কেন দিয়েছ জেব্রাগুলোকে ? সারা বাড়ি বিষ হয়ে গেল আমার৷
 
– ইঃ ওনার বাবা গঙ্গাচান করেন ! শুধু গামছা জড়িয়ে গঙ্গায় নামত কেন, আমি বুঝিনি ভেবেছ ! উনি কোন কূলের শুদ্ধ লোক গো ! হি হি হি …দেখত গ দেখত…আমাদের দেখত…
 
একটানা নিজের ও কমলপদ্মের সংলাপ বলে চোখ খুললেন মোহিনীমোহন৷ না রে বাবা…ঘুমোননি৷ আজকাল দীর্ঘ সময় চোখের পাতা বুজিয়ে কমলপদ্মের সঙ্গে কথা বলে যান ! এ এক অদ্ভুত অভ্যেস৷ স্বপ্ন নয়, জাগরণ নয়, শুধু বন্ধ চোখে গ্যাজানো৷ হপ্তা দুয়েক আগে সূর্য তাঁকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল৷ মোহিনী যাননি৷ হ্যানাত্যানা করে পাশ কাটিয়েছেন৷ ডাক্তার সুস্থ করে দিলে কমলের সঙ্গে গল্প বন্ধ হয়ে যাবে তাঁর৷ তবে সূর্য যেমন ধূর্ত, তেমনি তার ধৈর্য্য৷ ঠিক একদিন মোহিনীকে সারিয়ে ফেলবে৷ ভয়ে থাকেন মোহিনী৷ কমলের সঙ্গে, না হওয়া কথার মৌতাত ছাড়তে চান না৷
 
জানলার সবুজ পর্দা সরিয়ে দিলেন মোহিনী৷এত ধুলো পর্দায়! সূর্যকে বলতে হবে ডাক্তারের পিছনে দৌড় না করিয়ে, বউকে দিয়ে যেন বড় দাদার পর্দাগুলো কাচিয়ে দেয়৷ বাবার আমলে এ বাড়িতে ধোপার চল ছিল৷ জেব্রা ডিঙিয়ে মোহিনীর যেদিন ও পাড়ায় চলাচল শুরু হলো, মোহিনীর কাপড় একপাশে ফেলে পুঁটলি বেঁধে ধোপা চেঁচাত– বৌদি পরশুদিন সব পাবেন৷ মোহনী জানেন, এর পেছনে হিংসুটে বাবার নির্দেশ পুরো কাজ করেছিল৷
 
গঙ্গা থেকে জেব্রা–হাঁটার সময় বাঁদিকে চোখ ফিক্সড হয়ে থাকত কাশীমোহনের৷ তারপর নিজেকে এবং পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে হতাশ করে বাড়ি ঢুকে পড়তেন৷ উঠোনে উদোম হয়ে ভিজে গামছা বউয়ের হাতে ধরিয়ে দিতেন৷ অলকা শুকনো লুঙ্গি ছুঁড়ে দিয়ে তক্ষুণি গামছা কাচতে বসতেন৷
 
থুপথুপ আওয়াজ শুনে সবাই বুঝত জেব্রাবাড়ির মালিক ফিরলেন৷ সন্ধেবেলা পটলার কচুড়ি খেতে খেতে জেব্রার ওপাশে জিনিয়া মাসির বাড়িতে চোখ পেতে রাখতেন কাশী অলকা দুজনেই৷ মনে হতেই ফকফক করে হাসলেন কাশীর বড়ছেলে৷ তখন হয়ত দুজনের দুজনকে তাপ দেওয়ার জন্য, জিনিয়ামাসীর খোপরিগুলোর সান্ধকালীন সিনসিনারীর দরকার লাগত৷ কথাটা একবার সূর্যকে মুখ ফস্কে বলেও ছিলেন৷ দাদাকে প্রচণ্ড বকুনি দিয়েছিলেন সূর্য৷ সূর্যটা চিরকাল এরকম নেকুপুসু৷ ঘাড়ের কাছে গুচ্ছের ডবকা ছুঁড়ির বাস৷ কারোর বর তিন চারদিনের বেশি স্থায়ী নয়৷ তবু ব্যাটা সূর্য মুখ গুঁজে পড়াশুনো করে যৌবন শেষ করে ফেলল৷ দর্শনে এমএ করে এখন প্রফেসরি করছে৷ কোনো পরীক্ষায় টুকত না সূর্য৷ মোহিনীর হাজার উৎসাহ দেওয়া সত্ত্বেও না৷ টুকলে হয়ত আরো ভালো রেজাল্ট করতো৷ এতদিনে বিলেতে মেম নিয়ে ডিঙি নৌকো থেকে মাছ ধরত৷ সূর্যের কথা ভেবে এতদিন পরে সামান্য হতাশ হলেন মোহিনী৷ গুড বয় ইমেজ ভাঙতে পারল না সূর্য ৷ গুড শব্দে যে এত ঘেন্না তার দাদার, বুঝলই না !
 
যে জেব্রার ব্যারিকেড পেরোবার সাহস করেননি মোহিনী সূর্যের বাবা, মোহিনী পেরোলেন অনায়াসে৷ হিংসেতে তখন মটমট করছেন বাবা৷ মায়ের কাছে মোহিনীর নামে টানা খিস্তি দিতেন৷ বরের মন রাখতে মোহিনীর জামাকাপড় ধোপাবাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছিলেন অলকা৷ তাতে অবশ্য প্রতি সন্ধেতে কাচা কাপড় পরা বন্ধ হয়নি মোহিনীর৷ গেরস্ত বাড়ি থেকে সামান্য দূরে, জিনিয়া মাসির বাড়িটা, বিশাল এক ছাদ ও অগুনতি খুপরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত রাতদিন৷ প্রতি ঘর হাসিতে ভর্তি৷
 
মাঝে মোহিনীর পূর্বপুরুষের গড়া ছটা জেব্রা৷
 
মোহিনী যেদিন কমলপদ্মের দিদি সরস্বতীর ঘরে প্রথম ঢুকেছিলেন সেদিনই দরজার কাছে খ্যারখ্যার করে উঠেছিল চোদ্দ বছরের কমল –
 
এই দিদি ! জেব্রা বাড়ির নোংরা ভূত তাড়া দিকি৷ তুই এত সুন্দর! আর এটার ধূতি দিয়ে পায়খানার গন্ধ বেরোচ্ছে৷ বলি হেগো কাপড়ে সরস্বতী ছুঁতে এলে !
 
সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে জিনিয়া তার টিপিক্যাল হিন্দুস্থানি চড়টা যখন মারল কমলপদ্মকে, হা হা করে ছুটে গিয়েছিলেন মোহিনী৷ জিনিয়া আর সরস্বতী অবাক হয়েছিল খুব৷ দু বিনুনীর কমলপদ্ম হেগোর কোলে ! আর দাঁত না মাজা মুখে হেগো ছড়া কাটছে…
 
তুই কমল তুইই পদ্ম  ⁄  এই তো পেলাম  ⁄ সদ্য সদ্য
 
রাতের কাপড়-প্যান্ট মোহিনী ছেড়ে আসতেন সরস্বতীর ঘরে৷ কেচে ইস্ত্রি করে রাখালচন্দ্রকে দিয়ে সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন জিনিয়ামাসীর বাড়ির একনম্বর৷ সরস্বতী তখন সত্যিই একনম্বর৷ নাইন অব্দি পড়েছে, রঙ সূর্যাস্তের মতো৷ জামাকাপড় পৌঁছে দেওয়া ছাড়া রাখালচন্দ্র আরেকটা কাজ শুরু করেছিল৷ কমলপদ্মকে নিয়ে মোহিনীর সঙ্গে দর কষাকষি৷ বছর ঘুরল না – কমলপদ্মে তাঁকে ট্রান্সফার করেছিল রাখাল৷ যেদিন প্রথম কমল মোহিনীর প্যান্ট কাচল সেদিনই ট্যাক্সিতে দুদিনের মেয়ে নিয়ে ফিরল সরস্বতী৷ ছয় জেব্রা মাঝে …৷
 
– বড়দা চা৷
 
চা নিয়ে সূর্যের বউ বীরা ঘরে এসেছে৷ পনেরো বছর এ বাড়িতে এসেছে বীরা৷ তবু কখনো ওর সঙ্গে দুমিনিটের বেশি কথা এগোয়নি৷ ইচ্ছেই করে না মোহিনীর৷ অত্যন্ত অনাটকীয়ভাবে পূববাংলার এই মেয়েটাকে বিয়ে করে এনেছিল সূর্য৷ চট্টগ্রাম উনিভার্সিটিতে টানা দশদিন বৌদ্ধ দর্শনের হাবিজাবি নিয়ে সেমিনার চলছিল৷ সূর্য বীরার পরিচয় সেখানে৷ সূর্যের মতো ছেলেদের পক্ষে একটা মেয়েকে জীবনে জড়াবার জন্য দশদিনই কাফি৷ এইধরণের টিপিক্যাল আদর্শবাদী ছেলেরা দুমদাম মেয়েদের বিশ্বাস ও বিয়ে করে ফেলে৷ বীরা অবশ্য অবিশ্বাসের কাজ করেনি৷ ভাসুরকে পুরো অপছন্দ করলেও তাঁর সব কাজ নিজের হাতে করে৷
 
মোহিনী চা নিয়ে বললেন–প্যাকিং শেষ ?
 
আপনারটা সব শেষ৷ নতুন সুটকেসটায় দিয়েছি৷ ওটা অনেকটা বড়ো৷
 
– বীরা দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল৷ কাজের কথাটুক ছাড়া মেয়েটা একটাও বাড়তি বলে না৷
ঠিক দুদিন পরে এ বাড়ির শিফটিং হবে পাশের পাড়ার ফ্ল্যাটে৷
 
নিজেদের সংসারের জিনিস গোছাবার আগেই মোহিনীর সব শার্ট প্যান্ট গুছিয়ে ফেলেছে৷ সুটকেস খুলে চেক করে দেখেও নিয়েছেন মোহিনী, একটিরও কলার ভাঙেনি, ভাঁজ পড়েনি৷বাবার কিছু পুরোনো জামা বেশ ভালো ছিল৷ ওগুলোও ভরে দিয়েছে৷ মোহিনীর বেশ পছন্দ হয়েছে বীরার প্যাকিং প্রণালী৷ পূববাংলার মেয়ে৷ মাল গুছিয়ে বর্ডার পেরোবার চিন্তাটা জন্ম থেকেই ওদের মাথায় ঘোরে৷
 
সূর্য বলেছিল– প্যাকিংয়ের ঝামেলা আছে বীরা৷ এ কদিন হোমসার্ভিস আনিয়ে নাও৷বীরা শোনেনি৷ আজো দুপুরে মোহিনীর জন্য মৌরিফোড়ন দিয়ে বিউলির ডাল রেঁধেছে৷ খেতে বসে মোহিনী অস্বস্তিতে পড়েছিলেন–এত জিনিস এখনো প্যাকিং হবে৷ দেখেশুনে পুরোনো ফার্নিচার কিছু শাহুর দোকানে দিতে হবে৷ কত কিছু বাকি ! সূর্যর কথা শুনলে পারতে৷
বীরা মৃদু স্বরে বলেছিল– দুশো বছরের পুরোনো বাড়ি ভাঙা পড়বে আপনার চোখের সামনে৷ নতুন ফ্ল্যাটে বিউলির ডাল পোস্ত রুচবে তো আপনার ?
 

একটা পোষা বেড়াল আছে গন্ধর৷ সেটাকে পাখির খাঁচায় বেঁধে রেখে বিরিয়ানি খাওয়ায়৷ এ মেয়ে নিয়ে ভোগান্তি আছে৷ পুরো পাগলের ঝামেলা কম। কিন্তু আধাপাগলা গন্ধকে নিয়ে কী যে করবে বীরা সূর্য ! দত্তক নেওয়ার সময় কেউ একবার জানায়নি মোহিনীকে ৷ বীরা সূর্যের দুহাত ধরে গন্ধ যেদিন বাড়ি ঢুকল সেদিনই মোহিনী বুঝেছিলেন, মেয়েটার চোখ বনবন করে ঘরের ছাদে দেওয়ালে ঘুরছে

 
চা শেষ করে জানলায় এলেন মোহিনী৷ শিকের গায়ে নাক ঠেকালেন ছোটবেলার মতো৷ উল্টোদিকের ছাদে কমলপদ্মের শেষ কাচা শাড়িটা ঝুলছে৷কমলপদ্মের মালপত্র আগেই শিফটিং হয়ে গেছে৷ জিনিয়ামাসি মারা যাবার পর বাড়ি বেচার সিংহভাগ পেয়েছে কমলপদ্ম৷ নিউটাউনে এনআরআইদের বাপ মায়ের জন্য যে ফাইভ স্টার বৃদ্ধাবাস তৈরি হয়েছে সেখানেই ঘর বুক করেছে কমলি৷ যাওয়ার দিন জেব্রা ডিঙিয়ে এ বাড়িতে পা দিয়েছিল কমলপদ্ম। প্রণাম করে আশীর্বাদ চাইল৷ বীরা মিষ্টি নিমকি আনিয়েছিল। এ বউটার সবেতে বাড়াবাড়ি ! কমল মালপত্তর চেঁছে নিয়ে গেল৷ অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঝগড়াও করল খুব৷ প্রমোটর সামান্য অঙ্কের টাকা দিয়ে এনওসি নিয়েছে মেয়েগুলোর থেকে৷ এদেরও কারো কারো ঘরে কখনো কখনো তো গিয়েছেন৷ ঠিকানাগুলো নিয়ে রাখলেন না বলে হতাশ বোধ করতে লাগলেন মোহিনী৷
 
বাচ্চাগুলো রথ টানছে৷ এবার রথে একটুও বৃষ্টি হয়নি৷ নীল আকাশে হলুদ রোদ বিকেলবেলাতেও ঝকঝক করছে৷ লাল বেগনে পাতায় রথগুলো সেজেছে চমৎকার৷ ভেতরে ব্যাটারির আলো৷ বাচ্চারা কী ম্যাচিওর্ড ! বাপ মায়ের তোয়াক্কা না করে নিজেরাই দল পাকিয়ে রথ সাজাচ্ছে৷ এদের কেউ কেউ হয়ত ইএমআই দিয়ে নতুন ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হবে৷ বিকেলের রোদে ব্যাটারির আলো একটু নজর করে দেখতে হচ্ছে অবশ্য৷ রাতে নকল আলো স্পষ্ট হবে৷মনে হতেই কমল সরস্বতীর বাড়ির ছাদটাকে শেষবারের মতো বিকেলের রোদে দেখতে চাইলেন মোহিনী।
 
পাইপয়সা বুঝতে গিয়ে প্রায় নতুন শাড়িটা বেমালুম ফেলে চলে গেছে কমলপদ্ম৷ এটাই কি গত পুজোয় পাঠিয়েছিলেন ! মনে করতে পারলেন না ৷ কমল যেদিন প্রথম এ বাড়ি এল সেদিন তার শেষ চলে যাওয়াও ছিল কিনা ৷
 

ডান হাত নুলো আর কমবুদ্ধি হয়ে জন্মাবার পর যখন গন্ধরাজের মা অন্য জোয়ানের সঙ্গে পালিয়ে গেল তখন থেকেই প্রাণীকে ভালোবাসা অভ্যেস করে ফেলেছিল গন্ধরাজ৷ মরা প্রাণী৷ মায়ের গল্প অবশ্য এই কিছুদিন আগে বীরার মুখে শুনেছে গন্ধরাজ৷ বীরা বলে —একবার এক পাখি রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল৷ সেসময় গন্ধরাজকে নাকি মরা পাখিটার থেকে আলাদা করা যায়নি

 
– জেঠু ! আজ আবার আক্রম এনেছি৷ খাবে?
 
হাঁটুর ওপর ফ্রক পরে হাতে দুপ্যাকেট আক্রমের বিরিয়ানি নিয়ে গেটের কাছে চিৎকার করছে গন্ধরাজ৷ পেছনে আক্রম৷ বোধহয় গন্ধরাজকে পৌঁছে দিতে এসেছে ! মেয়েটার মাথার ঠিক নেই৷ হাসি কান্না সব চেঁচিয়ে করে৷ আক্রম গঙ্গার ধারে বিরিয়ানির দোকান করার পর থেকে গন্ধ ওখানে ডেরা বেঁধেছে৷ যখন তখন বীরার ঘট থেকে টাকা নিচ্ছে আর বিরিয়ানি কিনে আনছে৷ এমন শয়তান, ঘটের নীচে চাকতি সাইজের ফুটো করে রেখেছে !! নীচ থেকে মাল হাপিস৷ বোকা বীরা ওপরের ফুটো দিয়ে পয়সা ফেলে৷ গন্ধরাজের ভবিষ্যত বিরিয়ানির দাম জমে৷ একটা পোষা বেড়াল আছে গন্ধর৷ সেটাকে পাখির খাঁচায় বেঁধে রেখে বিরিয়ানি খাওয়ায়৷ এ মেয়ে নিয়ে ভোগান্তি আছে৷ পুরো পাগলের ঝামেলা কম। কিন্তু আধাপাগলা গন্ধকে নিয়ে কী যে করবে বীরা সূর্য ! দত্তক নেওয়ার সময় কেউ একবার জানায়নি মোহিনীকে ৷ বীরা সূর্যের দুহাত ধরে গন্ধ যেদিন বাড়ি ঢুকল সেদিনই মোহিনী বুঝেছিলেন, মেয়েটার চোখ বনবন করে ঘরের ছাদে দেওয়ালে ঘুরছে৷ কী যে খোঁজে, গন্ধ ! সে চোখ আজো ঘুরছে ! এখন তো এ বাড়ি তোরই বাপু ! তবু এত কৌতুহল কীসের ! কতবার বীরাকে বলেছেন -দত্তক নিলে দু তিন বছরের বাচ্চা নিতে হয় ৷ ছ সাত বছরের ধাড়ি এনে দেখো কী ফ্যাসাদ ! মালী ফুলের গাছে জল দিতে গেলেই তার পেছনে লাথি মারবে গন্ধ৷ কাউকে জল দিতে দেবে না৷ কত গাছ যে শুকিয়ে গেল৷ কদিন পরে ভাঙা মোজাইক আর শুকনো ডাল একত্রিত হয়ে যাবে৷ ফের অন্যমনস্ক হল গন্ধরাজের জেঠু ৷
 
আক্রমের দু প্যাকেটের দাম দিয়ে দেবে ? ওপর থেকে ছুঁড়ে দাও ৷
 
মোহিনী নিঃশব্দে চড় দেখালেন ৷
 
বাঁহাতে আক্রমকে ছুঁয়ে আরও নিঃশব্দে গন্ধ ঢুকে গেল ৷
 
আক্রম হাসল ৷
 

♦২♦

গন্ধরাজ ফুলের ডালপাতা নাকের কাছে সুড়সুড় করতেই ঘুম ছুটে গেল গন্ধরাজের৷ চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে বিছানাটা দেখে নিল৷ ওই তো আছে৷ দামড়া কোমল শরীর নিয়ে চোখ জ্বালিয়ে বসে আছে বেড়ালটা৷ গন্ধরাজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ এই মুহূর্তে বেড়ালটার সামনে একটা বড় প্লেট৷ তাতে আক্রমের দোকানের মাংসের চাপ৷ বিড়ালটা খাবে না তবু গন্ধরাজ তাকে মাংস দেবেই৷ কেননা আক্রম গন্ধরাজের ফেভারিট৷ অতএব বিড়ালটাকেও খেতে হবে৷ এমনই সব বেয়াড়া যুক্তি রোগাভোগা গন্ধরাজের৷ আজ পাঁচ ছ বছর ধরে প্রবল ভালোবাসায় খাঁচাসুদ্ধু বেড়ালটাকে নিয়ে এক বিছানায় ঘুমোচ্ছে৷ প্রতি সকালে সে বিছানা নিপুণ ভাবে প্লেন করে রাখে৷
 
গন্ধরাজ মেয়েটা একটু একা টাইপের ! ডান হাত নুলো আর কমবুদ্ধি হয়ে জন্মাবার পর যখন গন্ধরাজের মা অন্য জোয়ানের সঙ্গে পালিয়ে গেল তখন থেকেই প্রাণীকে ভালোবাসা অভ্যেস করে ফেলেছিল গন্ধরাজ৷ মরা প্রাণী৷ মায়ের গল্প অবশ্য এই কিছুদিন আগে বীরার মুখে শুনেছে গন্ধরাজ৷ বীরা বলে —একবার এক পাখি রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল৷ সেসময় গন্ধরাজকে নাকি মরা পাখিটার থেকে আলাদা করা যায়নি৷ যতক্ষণ না পাখিটা কাঠ হয়ে গেছে, গন্ধরাজ পাখিটার শরীর উল্টে দেখত৷ ডানার পালক ছিঁড়ত ওই বাচ্চা গন্ধ৷ ওসব দেখেই না গন্ধকে মেয়ে করে নিয়েছিল বীরা ! এখনো বীরা জিজ্ঞেস করে— মনাসোনা অত ছোট বয়সে মরা ছিঁড়ে কী খুঁজেছিলিস রে ? গন্ধ বলে– নাইফুটকি বীরা ৷ সূর্যকে বাবা ডাকলেও বীরাকে বীরা বলতেই পছন্দ করে গন্ধ৷ নাইফুটকি কথাটা পনেরো বছর বয়সে সে আক্রমের কাছ থেকে শিখেছে৷ নাভি— পাখিটার নাভি খুঁজেছিল গন্ধরাজ৷ এখনো ঘুমের সময় বীরার নাভি চোষে গন্ধরাজ৷ কবে থেকে ছড়া কাটে—
 
আমার মায়ের নাইফুটকি
ফুলের গন্ধ খাই৷
 
বীরা মেয়ের নাম দিয়েছিল গন্ধরাজ৷ বাগানে দুটো গন্ধরাজ গাছ পুঁতে দিয়েছিল সূর্য৷ সে এক দিন গেছে বটে৷ এ বাড়িতে আসার পরেও যে কোনো পশু মরলেই গন্ধরাজ সেখানে হাজির হবে আর প্রবল শক্তিতে পশুটাকে নিয়ে ওলটপালট খাবে ধোপার মাঠে৷ ছোটোবেলার কুঁচিফ্রক মৃতের নাভি খোঁজার চোটে বুকের কাছে ঝুড়ি হয়ে যেত ! তবু গন্ধের লজ্জা নেই৷ ডাক্তারের কথামতো সূর্য সুন্দর একটা বিড়াল এনে দিল৷ তবু গন্ধ যেন কেমনতরো হয়ে রইল৷ এই এখন দেখো, বিড়ালকে মাংস চাপ খাইয়ে ফেলল৷ সারা ঘরে বমি ছিটকেছে বিড়ালের৷
 
অন্ধকার রাতে ঘর ঝাঁটাতে শুরু করল গন্ধ৷ যত বয়স বাড়ছে অকেজো ডান হাত আরো রোগা ও জোরহীন হয়ে যাচ্ছে৷ ডাক্তার বলেছে ডান হাতে কাজ করতে৷ তাতে বল জাগতে পারে৷ গন্ধ ডাক্তারের কথা একটুও শোনে না৷ হাগু থেকে আক্রম, সব বাঁ হাতেই চালায়৷ ঘর সাফ করে দাওয়ায় এল গন্ধরাজ৷ ভোর হচ্ছে৷ একটু পরে প্যাকেজিংয়ের গণেশকাকা আসবে৷ এত শুকনো ফুলের গাছ চারদিকে! হাওয়া যে দিক দিয়ে পারছে গন্ধের কাছে আসছে৷ ওকি ! বারান্দায় কোণে ও কে ? বাবা না ? ফুঁপিয়ে কাঁদে কেন বোকা ছেলেদের মতো ?
 
– বাবা কাঁদছ কেন গো ? কালকের আক্রম খানিকটা আছে – দেব তোমায় ?
 
বাবা শব্দহীন ৷
 
ও বাবা বিড়াল পুরোটা খায়নি৷ থালায় অনেকটা আছে এখনো৷ খাও না –
 
দূর থেকে মোহিনী বললেন – গন্ধ বাবাকে জ্বালাসনি ৷ তোর বাবার জন্ম, বিয়ে, আমাদের মায়ের মরা, তুই আসা, সব এবাড়িতে ৷ আজ জ্বালালে খুব মার খাবি ৷
 
ফুলের একটা হদ্দ শুকনো ঝাড় ভাঙা পাঁচিলের ওধারে ফেলে ঘরে ঢোকে গন্ধ৷ পা টেনে টেনে বিড়ালের কাছে যায়৷
দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ৷ এত সকালে কে রে ? — ঘর থেকে চিল চিৎকার দিল গন্ধ৷
 
সুজাতা তুমি ? কোন ট্রেনে এলে ?
 
– বীরার গলা শোনা যাচ্ছে ৷
 
– বৌদি আগে চাবিটা দাও৷ তোমার কাছে রেখে গেছে নাকি! গণেশদা বলল৷ মায়ের ঘরটা একবার…
ও৷ সামনের বাড়ির সুজাতা মাসি এসেছে৷ কী মজা ! ওদেরটাও ভাঙা পড়বে আজ৷ গন্ধ এক দৌড়ে সুজাতাকে জাপটে ধরল৷
 
– গন্ধ ছাড়৷ যাবার সময় দেখা করে যাব৷
 
– সুজাতা চা হয়ে গেছে৷ চা পাউরুটি খেয়ে যাও৷
 
সূর্য কান্না মুছে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে৷
 
চা ঢালতে গিয়ে গরম চা হাতে পড়ে গেছে বীরার !
 

♦৩♦

একপিস পাউরুটি নিয়ে সুজাতা দীর্ঘ আটবছর আগে মায়ের বাড়ি ঢোকে৷ জিনিয়া দিদা মরার পর বাঁদিকটা নিয়ে নিয়েছিল কমলামাসি৷ আর ডানদিকের ছোট দুটো ঘরে সুজাতা মাকে নিয়ে থাকত ৷ সুজাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল৷ বাড়ি এসে রুটি তরকারী করে মাকে খাইয়ে পড়তে বসত৷ টেবিলল্যাম্পের আলোয় বিছানার মাকে আরও রোগা আর আঁধার লাগত৷ চোখ দুটো ধকধক করত৷ কমলামাসি আর মোহিনীমোহনের হাসির আওয়াজ আসত৷ পড়ার তখন এত চাপ চোখ তোলার অবকাশ ছিল না৷ পিঠে শুধু মায়ের দুটো চোখ৷
 
ভাবতে ভাবতে কখন ছাদে চলে এল সুজাতা৷ ছাদ থেকে ঝুঁকল৷ মোহিনীর বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে গন্ধ বেড়ালটাকে ছেড়ে দিচ্ছে রাস্তায়৷
 
প্রাণীটা ছুটছে – বাগানের বেড়া টপকে ছুটছে রাস্তায়৷ আজ থেকে নিজের খাবার খুঁজতে হবে তাকে৷
 
বাঁ হাত তুলে নাচ্ছে গন্ধ৷ এতদিনের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দিনে এত আনন্দ কেন মেয়েটার !
 
পা দুটো লাফাচ্ছে সমান তালে৷
 
গন্ধরাজের আজ শরীর ভরা জোর৷
 
গন্ধরাজ ঠিক করে নিচ্ছে, নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় বাগান করবে৷ গাছের গোড়ায় ভালো করে জল ঢালবে৷ আক্রমকে দিয়ে বীজ আনাবে৷
 
সুজাতা দেখছে –
মোহিনী দেখছে –
সরস্বতীর গন্ধশরীর৷
ছয় প্রাণহীন জেব্রা চুপ৷
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

 

লেখক পরিচিতি:

পেশায় শিক্ষক, নাট্যকর্মী। কলকাতার বাসিন্দা

 
লেখকের অন্য গল্প পড়ুন:

মাটি বলে

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!