- ব | ই | চ | র্যা রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ২, ২০২৩
মহিলাদের উত্থানের কথা, উপকথা
ইতালি, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কুয়েত, বাংলাদেশ ও ভারতের পটভূমিতে কোভিড কাল এর কাহিনীবৃত্ত গড়ে উঠেছে । উপন্যাসে স্পষ্ট দুটি পর্ব – একটি ঘোষণা পর্ব, অন্যটি ‘এবং জীবন’। মহামারী মানুষের জীবনে চরম বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল । তার রক্তচক্ষু ও ধ্বংসলীলা দেখে মানুষ আঁতকে উঠেছিল। ভেবেছিল, এটাই বুঝি মানব সভ্যতার ক্রমশ এগিয়ে যাওয়ার শেষ ইতিহাস । শোনা গিয়েছিল একের পর এক রাষ্ট্রীয় ঘোষণা । ঘোষণাগুলি আজও আমাদের কানে বাজে । উপন্যাসের প্রথম পর্বে সেই ঘোষণাগুলিকেই লেখক উপন্যাসের ঘটনার প্রেক্ষিতে ধারাবাহিকভাবে নতুন করে শুনিয়েছেন ।
দ্বিতীয় পর্ব ‘এবং জীবনে’ রয়েছে গল্প, জীবনের গল্প । অতিমারীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জীবনের প্রতি আস্থা ও জীবনকে ভালোবাসার গল্প। কাহিনীবৃত্ত গড়ে উঠেছে প্রধান দুই নারী চরিত্র সহেলি ও মেহেরকে কেন্দ্র করে। গবেষণার কাজে ইতালির একটি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল সহেলি। সেখানে অয়নের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। অয়ন দিল্লির জেএনইউ ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ছাত্র। সহেলি চেয়েছিল অয়নকে সঙ্গে নিয়ে জীবন ছুঁতে। অতিমারীর আগ্রাসনের কালো দিনগুলিতে তারা ইতালি থেকে দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিল। সহেলি ফিরে আসতে পেরেছিল, অয়ন পারেনি। ইতালি থেকে ফিরে আসার শেষ বিমান মিস করেছিল সে। তারপর কোভিডে আক্রান্ত হয় অয়ন। টানা দু সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে একদিন তার জীবন থেমে যায়। কিন্তু দেশে ফিরে এসে সহেলি নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। হোম কোয়রান্টাইনের বন্দি জীবন তাকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে তোলে। অয়নের মৃত্যু সহেলির জীবনে নতুন বাঁক এনে দেয়, সহেলিকে নতুন ভাবে বাঁচতে শেখায় । বাবা অভিজিৎ তাকে মানসিকভাবে সাহায্য করেছেন। দায়িত্ব, কর্তব্য আর সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক ডাক্তার অভিজিৎ। কোভিড কালে সমস্ত বাধাকে তুচ্ছ করে মুমূর্ষূ রোগীর পাশে দাঁড়ানো অভিজিতের চরিত্রকে সাবলীল আর দৃঢ় করে তুলেছে। অন্য এক চরিত্র ডাক্তার সামিম । ডাক্তার অভিজিৎ ও ডাক্তার সামিম এই উপন্যাসে মানবতা ও কর্তব্যের প্রতিমূর্তি। পেশাগত দায়িত্ব আর কর্তব্যের বাইরেও মানুষের একটা পরিচয় থাকে, যে পরিচয় তাঁকে মানবিক করে তোলে – ডাক্তার অভিজিৎ করোনাকালে তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে মানবিক মানুষের উত্তারাধিকারকে বহন করেছে, আর কর্তব্য পালন করতে গিয়ে তরুণ প্রতিশ্রতিবান ডাক্তার সামিম হয়ে উঠেছে ট্রাজেডির নায়ক।
মেহেরুন্নেশা উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র। তার ডাক নাম মেহের। পরিযায়ী শ্রমিক সামসুদ্দিনের সে বউ। পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন যন্ত্রণার কথা এই উপন্যাসের আরেকটি দিক – যা এই উপন্যাসের কাহিনীবৃত্তকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিক সামসুদ্দিন রাজমিস্ত্রীর কাজে কেরালায় গিয়ে আটকে পড়ে। অপরিকল্পিত লকডাউনের জন্য তার ঘরে ফেরা হয় না। ঘরে বউ একা। মেহেরুন্নেশাকে ছেড়ে কেরালায় হোমকোয়রান্টাইনের জীবন সামসুদ্দিনকে অস্থির করে তোলে। আর ঘরে একা মেহের অত্যন্ত যোগ্যতা ও দক্ষাতার সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব পালন করেছে। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই সমাজের সাথে তার মেলামেশা এবং দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব একদিকে যেমন তার দেহের সঙ্গে মনের, তেমনি সমাজের সঙ্গে জীবনের। অনুশাসিত পথে চলতে চায়নি মেহেরুন্নেশা । মনে ও প্রাণে সদা চঞ্চল সে। চঞ্চলতার ফাঁক দিয়ে তার মনের গহীনে ঢুকে পড়েছিল আলতা। কিন্তু বিবাহিতা বউ মেহেরের সাথে আলতাবের মেলামেশা সমাজ মেনে নেয়নি। মুসলিম পরিবারের মেয়ে ! সমাজের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। সমাজ ও মনের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত মেহের আলতাবের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পারেনি । শরীরের ডাকে একদিন রাতে আলতাবের কাছে সে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেছে । মেহেরুন্নেশার জীবন সংগ্রাম, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সমাজের সঙ্গে তার লড়াই এবং উত্তরণ তাকে ব্যতিক্রমী চরিত্র হিসেবেই তুলে ধরেছেন লেখক। সহেলি আর মেহের – ‘প্রধান দুই নারী চরিত্রের চরম অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে জীবনকে নতুন করে খোঁজার চেষ্টা রয়েছে উপন্যাসে’।
কোনো বাধা সভ্যতার রথকে থামাতে পারেনা । চলতে চলতে সে সাময়িক থামে । তারপর আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করে । প্রেমের জন্য শরীর, নাকি শরীরের জন্য প্রেম! নাকি শরীর, প্রেম – জীবনেরই দুই সত্ত্বা । সহেলি আর মেহের – প্রধান দুই নারী চরিত্রের চরম অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে জীবনকে নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখক
আর আছে গোপার মা, বীণার মা – যারা সংসার জীবনের বোঝা বইতে গিয়ে গোটা উপন্যাস জুড়ে নিজেদের খুঁজে বেরিয়েছে । সমাজ সংসারে মেয়েদের নিজস্ব কোনও পরিচয় থাকেনা । সংসারের ভার বইতে বইতে কখন কোনো এক সময়ে তাদের ব্যক্তি নাম, ব্যক্তি পরিচয় লুপ্ত হয়ে যায় । গোপার মা বা বীণার মা তাদের নিজের ব্যক্তি পরিচয় বাদ দিয়ে সমষ্টির এককে পরিণত হয়ে ওঠেন । এঁরা সমস্ত মায়েদের প্রতিনিধি – শুধু সমাজ, পেশা আর পরিবেশ আলাদা । গোপার মায়ের স্বামী অসিতও কেরালা কাজ করতে গিয়ে অকস্মাৎ লকডাইনের অভিঘাতে ঘরে ফিরতে পারেনি । বিদেশে কোভিডে আক্রান্ত হয়ে জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে মারা যান বীণার মা বিনীতার স্বামী দিলসাদ । স্বামী হারা বীণার মায়ের জীবন সংগ্রাম এই উপন্যাসের কাহিনীকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে । ‘কোভিড’ এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র – যা সমগ্র উপন্যাসটিকে একই সূত্রে বেঁধে রেখেছে । কোভিডের কাছে সমগ্র পৃথিবী, মানব সভ্যতা অসহায় । মানুষের জীবনকে, জীবনের গতিশীলতাকে সর্বোপরি মানব সভ্যতাকে সে থামিয়ে দিতে চায় । কিন্তু জীবন তো গতিশীল । গতিশীল মানব সভ্যতাও । কোনো বাধা সভ্যতার রথকে থামাতে পারেনা । চলতে চলতে সে সাময়িক থামে। তারপর আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করে । প্রেমের জন্য শরীর, নাকি শরীরের জন্য প্রেম! নাকি শরীর, প্রেম – জীবনেরই দুই সত্ত্বা । সহেলি আর মেহের – প্রধান দুই নারী চরিত্রের চরম অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে জীবনকে নতুন করে খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখক।
‘কোভিড কাল’ সময়ের দলিল এর তাৎপর্য চিরন্তন । সেই সময়ে কত কিছু ঘটে গেছে সভ্যতার অন্তরে । নতুন করে সেজে উঠেছে বিশ্ব । মহামারী নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে । ড্যানিয়েল ডিফো’র ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’, ইতালির আলেসান্দ্রো মানজির ‘দ্য বিট্রথেড’ আলবেয়ার ক্যামুর ‘দি প্লেগ’ প্রভৃতি মহামারীকে নিয়ে লেখা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বা মানিক বন্দোপাধ্যায় মহামারীকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন । তাঁদের উপন্যাসে কাহিনীর প্রয়োজনে মহামারীর প্রসঙ্গ এসেছে, মহামারী উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারেনি । সেদিক থেকে সাইদুর রহমানের ‘কোভিড কাল’ বাংলা সাহিত্যের একটি ব্যতিক্রমী । মহামারীকে পটভূমি করে রচিত এই উপন্যাসের ঐতিহাসিক মূল্যকে অস্বীকার করা যায়না ।
কোভিড কাল ♦ লেখকঃ সাইদুর রহমান ♦ চিন্তা প্রকাশনী ♦ ২০০ টাকা
♦—♦♦—♦
❤ Support Us








