- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুন ২৯, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ১০
হিরণবালা কর তেত্রিশ বছর বয়সি নতুন ভারতবর্ষের একজন মহিলা নাগরিক । দেশ যেদিন স্বাধীন হল, সেই দিনটাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না সে । নাহ, মধ্যরাতে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর বক্তব্য সে শোনেনি । এই স্বাধীনতা লাভের জন্যই হিরণের মতো মানুষদের যে-ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা কি কোনোদিনই কোথাও স্বীকৃতি পাবে ? সত্যও কি এক ধরনের শহিদ নয় ? ... তারপর
অনিবার্য কারণে ১৫ জুন রোব-e-বর্ণের এই ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়নি।এজন্য আমরা পাঠকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। ২৯ জুন থেকে ‘হিরণবালা ‘ প্রতি রবিবার প্রকাশিত হবে নিয়মিত ।
১৫
সত্য এখন হিরণের সঙ্গেই থাকে। কাঁথিপর্ব হিরণের জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে । ও এখন আছে বাঁকুড়ার বেলেতোড়ে। গ্রামটার ভালো নাম বেলিয়াতোড়। কিন্তু লোকের মুখে মুখে হয়ে গেছে বেলেতোড়। কেউ কেউ বেলাতোড়ও বলে। বেলিয়াতোড় একেবারেই কাঁথির মতো নয়। কাঁথি ছিল একটা শহর। সমুদ্র খুব দূরে ছিল না সে শহর থেকে। বেলেতোড় একটা ছোট্ট গ্রাম। প্রকৃতি এখানে ভীষণ রুক্ষ। কাঁথির থেকেও বেশি। এখানের মাটি লাল রঙের। মরুভূমির মতো খেজুরগাছ আছে। গরমকালে ভয়ঙ্কর লু বয়। জল থাকে না কুয়োতে। গোয়ালন্দ বা নড়িয়ার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের এই অংশের কোনো মিলই নেই। হ্যাঁ, অবিভক্ত বাংলা আর নেই। ‘বাংলা’ শব্দটারই আর রাজনৈতিক অস্তিত্ব নেই। পদ্মার ওই পাড়টা এখন পাকিস্তানের অংশ। তার নাম হয়েছে পূর্ব পাকিস্তান। এ রাজ্যটার নাম পশ্চিমবঙ্গ। এর মধ্যে বাংলা কোথাও নেই। স্বাধীনতা আর দেশভাগের ধাক্কায় ‘বাংলা’ নামটা হারিয়ে গিয়েছে।
বেলিয়াতোড়ে এসে হিরণের বড়ো বেশি করে গোয়ালন্দ আর নইড়্যার কথা মনে পড়ে। দেশ ছেড়ে যখন কাঁথিতে চাকরি করতে চলে এসেছিল হিরণ তখন বেশি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসতে পারেনি। ওর পান খাওয়ার অভ্যেস আছে। ওর নিজের ঠাম্মার একটা পান খাওয়ার বাটা আর জাঁতি ছিল। গোয়ালন্দে থাকতে এই বাটা আর জাঁতি ও আর মা দুজনেই ব্যবহার করত। বিয়ের সময় মা ওকে দিয়ে দিয়েছিল বাটা আর জাঁতিটা। এইগুলো নিয়ে এসেছিল হিরণ। বিয়ের বেনারসি শাড়িটা নিয়ে এসেছিল। কিছু গয়নাগাটি। এখনও ওই পানের বাটাতে পান রাখে হিরণ। ওই জাঁতিতেই সুপুরি কাটে। প্রতিদিন পান সাজতে গিয়ে ও যেন পদ্মার ডাক শুনতে পায়। সবুজ ধানের খেতগুলো চোখের সামনে ভাসতে থাকে। নারকোল গাছগুলোকে দেখতে পায়। নিমফলের গন্ধ নাকে ভাসে। ওর মনকেমন করে। কাঁথিতে যখন ও গিয়েছিল তখন দেশের জন্য ওর ততখানি মনখারাপ করত না। এর একটা কারণ মনে হয় তখন ছিল ওর নতুন চাকরি। ছিল সেই চাকরির উত্তেজনা। দেশভাগও তখন হয়নি। এখন তো সত্যি গোয়ালন্দ আর নইড়্যা আলাদা দেশ। এখন এক একদিন দেশের জন্য ওর বুক হু হু করে। এই দেশটাকে মনে হয় বিদেশ। মাঝে একদিন এমনকি এই স্বপ্নও দেখেছে যে, গোয়ালন্দের বাড়ির জানালা দিয়ে ও পদ্মা দেখছে।
কাঁথি ছাড়তে হবে এই ভাবনার প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে ওর তাই মনে হয়েছিল, বেলিয়াতোড়ে বদলি শাঁখা-সিঁদুরের জীবনকে পেছনে ফেলে একটা নতুন জীবনে প্রবেশ করার সুযোগ দেবে ওকে। মানুষটা ভালো থাকুক ও চায়। মানুষটার জন্য এখনও মাঝে মাঝে ওর বুক হু হু করে। কিন্তু যে মানুষটা ওকে ত্যাগ করে চলে গেছে, একটি বারের জন্যও ভাবেনি ওর কথা, বাচ্চাদের কথা, তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার সময় এবার হয়েছে
বেলিয়াতোড়ে যখন হিরণের বদলি হয়, তখন ও প্রথমদিকে বেশ খানিকটা মুষড়ে পড়েছিল। কাঁথির জীবনের সঙ্গে ও আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছিল। ওখানে সুশীল জানা যেমন ছিল, তেমনই নইড়্যার ছিদামের মতো ও পেয়েছিল বামাপদকে। আর ছিলেন স্যার। রামকৃষ্ণকাকু, কাকিমাও নানা কিছু বলতেন বটে, কিন্তু ওর জন্য করতেনও অনেক। তাই প্রথমদিকে কাঁথি ছেড়ে চলে যেতে হবে জেনে বেশ খানিকটা মুষড়েই পড়েছিল হিরণ। পরে ওর মনে হয়েছিল এই বদলিটা একটা সুযোগ, জীবনের আরেকটা পর্বে প্রবেশ করার। কাঁথিতে মানুষটার ছায়া ওর জীবনের ওপর প্রবল ভাবে পড়েছিল। এইবার সেই ছায়া থেকে ও বেরিয়ে আসতে পারবে। কাঁথিতে যেহেতু ও জীবনে প্রথমবার উপস্থিতি হয়েছিল শাখা-সিঁদুর পরে, তাই সেসব জীবন থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ আর পায়নি। লোকের প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার হয়েছে বরং। কাঁথি ছাড়তে হবে এই ভাবনার প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠে ওর তাই মনে হয়েছিল, বেলিয়াতোড়ে বদলি শাঁখা-সিঁদুরের জীবনকে পেছনে ফেলে একটা নতুন জীবনে প্রবেশ করার সুযোগ দেবে ওকে। মানুষটা ভালো থাকুক ও চায়। মানুষটার জন্য এখনও মাঝে মাঝে ওর বুক হু হু করে। শরীরের ভেতরে কিছু একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু যে মানুষটা ওকে ত্যাগ করে চলে গেছে, একটি বারের জন্যও ভাবেনি ওর কথা, বাচ্চাদের কথা, তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবার সময় এবার হয়েছে। এই কথাটা হিরণ এখন বোঝে। স্নান করার সময় ঘষে ঘষে মাথার থেকে সিঁদুর যেদিন তুলে দিয়েছিল ও, সেদিনই খুলে রেখেছিল শাঁখা, পলা, নোয়া। ওর খারাপ লাগেনি। বরং কেমন একটা স্বস্তি বোধ করছিল।
গীতার পড়াশোনার পাট চুকে গেছে। বেলিয়াতোড় হাইস্কুলেই সত্য এখন পড়ে ক্লাস টেনে। গোবিন্দর ক্লাস ফাইভ। দুটো ছেলেরই বুদ্ধি হয়েছে বেশ। গোবিন্দ ক্লাসে ফার্স্ট হয়। তবে সত্য যতখানি শান্ত, গোবিন্দ ততখানি শান্ত নয়। দুরন্ত খুব। বন্ধু করে নিতে পারে। পড়ার বইয়ে ওর যতখানি মনোযোগ ততখানি মনোযোগ খেলার মাঠেও। সত্য ছোটো থেকেই ছিল একটু লাজুক প্রকৃতির। একটা চোখ হারিয়ে ফেলার পরে বাইরের অপরিচিত লোকেদের সঙ্গে তেমন একটা কথা বলতেই চায় না আর। হিরণ শুনেছিল যে-সমস্ত মানুষের অঙ্গহানি হয়, তাদের নাকি বাকি অঙ্গগুলি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। সত্যকে দেখে মনে হয় এই কথাটা অনেকটা ঠিক। এক চোখ দিয়েই ও কত কাজ করে। দারুণ ছবি আঁকে। হাতের কাজও চমৎকার। হাওড়ায় থাকার সময় কুমোরটুলিতে গিয়ে সত্য বসে বসে ঠাকুরগড়া দেখেছিল কয়েকদিন। এবার সরস্বতী পুজোর সময় সত্য নিজেই একখানি ঠাকুর গড়ে নিয়েছিল। সত্যর গড়া ঠাকুরেই এই প্রথম বাড়িতে সরস্বতী পুজো হল। গোবিন্দ ওর বেশ কিছু বন্ধুদের সন্ধেবেলা খিচুড়ি খেতে বলেছিল। হিরণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রান্না করেছিল গীতা। গীতা এখন ঘরের কাজের অনেকখানি সামলায়। গোবিন্দর বন্ধুরা ওদের খিচুড়ি, লাবড়া আর চাটনিকে খেয়ে খুব খুশি হয়েছিল। বাঙাল রান্না ওরা আসলে প্রথম খেয়েছিল সেদিন। কাঁথিতে পদ্মার ওপারের লোকজনের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হত হিরণের। বেলিয়াতোড়ে এখনও পর্যন্ত একজন দেশের মানুষের সঙ্গেও মুখোমুখি হয়নি হিরণ। অথচ দেশভাগ হওয়ার পর থেকেই বন্যার মতো ওই দেশ থেকে মানুষ চলে আসছে এই দেশে। কিন্তু পদ্মা পেরিয়ে তারা মনে হয় এত দূরে আসছে না। জমি দখল করে বাড়িঘর বানিয়ে নিচ্ছে কলকাতা আর তার আশেপাশের জেলাগুলোতে। বাঁকুড়া কলকাতার থেকে অনেক দূরের জেলা, লাল মাটির রুখাশুখা দেশ। এখানে বাঙালরা থাকবে কী করে ?
১৬
কল্যাণীয়াসু হিরণ
আশা করি কুশলে আছ। অনেক কষ্টে দেশের বেশ কিছু সংবাদ সংগ্রহ করিয়াছি। সেগুলির একটিও ভালো সংবাদ নহে। আমাদিগের নূতন বাড়ির গলির শেষ মাথায় থাকিতেন কালীকান্ত রায়চৌধুরী। আশা করি তাঁহার কথা ভুলিয়া যাও নাই। তিনি দেশ ছাড়িয়া পরিবার লইয়া সদ্য এদেশে আসিয়া পৌঁছাইয়াছেন। হাওড়া স্টেশনে বিশেষ একটি প্রয়োজনে আসিয়াছিলেন। হঠাৎই আমার সঙ্গে দেখা হয়। তাঁহার কাছে শুনিলাম আমাদিগের পিতা-মাতা উভয়ই দেহত্যাগ করিয়াছেন। মা-ই আগে গত হন। মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে। মায়ের মৃত্যুর ধাক্কা বাবা সামলাইয়া উঠিতে পারেন নাই। মাত্র তিন মাসের মধ্যে উনিও দেহত্যাগ করেন। বিজলীরা কুশলে আছে, কিন্তু লাবণ্যর কোনো সন্ধান নাই। উহাদের সম্পর্কে কালীকান্তবাবু কিছুই জানাইতে পারিলেন না। তোমার দেবররা নির্মলার বিবাহ দিয়াছে। এর বেশি উহার সম্বন্ধেও কোনো সংবাদ কালীকান্তবাবু দিতে পারিলেন না।
আমি শীঘ্রই বেলিয়াতোড় যাব মনস্থ করিয়াছি। সত্যর উচ্চশিক্ষা কলকাতা শহরে সম্পন্ন হইলেই সঠিক হইবে। এই ব্যাপারে তোমার সহিত সাক্ষাতে কথা হইবে।
আশীর্বাদ লইও
শুভার্থী দাদা
চিঠিটি পড়ে চুপ করে বসে থাকে হিরণ। স্বাধীনতার কিছুদিন আগে থেকেই এদেশে ওদেশে চিঠিপত্রের আদান-প্রদানে কিছু সমস্যা হচ্ছিল মনে হয়। হিরণ নিজে আর দাদাও অনেকগুলো চিঠি লিখেছিল বাবাকে। কিন্তু, কোনো উত্তর আসেনি। চিঠিগুলো আদৌ পৌঁছেছিল কি না সে নিয়েই হিরণের সংশয় আছে। দাদাও একই কথা বলত। বেশ কয়েকটা বছর বাবা-মা কিংবা দিদি আর বোনের কোনো খবরই পায়নি হিরণরা। আজ যে খবর এল, তার চেয়ে বড়ো দুঃসংবাদ আর কীই বা হতে পারে। বাবা মায়ের চেয়ে প্রায় পনেরো বছরের বড়ো ছিল। হিরণের চিন্তা হত এই ভেবে যে, বাবা মারা গেলে একা একটি মেয়েমানুষ সবকিছু সামলাবে কী করে। সেই দুশ্চিন্তা থেকে মা হয়তো বাবাকেও মুক্তি দিয়ে আগে চলে গেছে। মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসাও বয়স একটু বাড়ার পর থেকেই নজর করত হিরণ। ওর মনে হত মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা নিছকই একজন নারীর প্রতি একজন পুরুষের ভালোবাসা ছিল না। সেই ভালোবাসার অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছিল স্নেহ। বাবা-মাকে দেখতে দেখতে হিরণের মনে হত একটা সময়ের পর ভালোবাসা হয়তো স্নেহই হয়ে যায়।
প্রায় দশ বছর বাবা-মাকে হিরণ দেখেনি।বাবার চিঠি এলে সেই চিঠিতে বাবার গলার স্বর অবশ্য শুনতে পেত ও। এই স্বরও শুনতে পায়নি শেষ কয়েক বছর। তবু বাবা-মা মাথার ওপর আছে এটাই কেমন যেন একটা শক্তি দিত হিরণকে, একটা সাহস। এবার সেই শক্তিটুকু ও পাবে কোথা থেকে ? বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠবার কথা হিরণের। কিন্তু হিরণ দেখছে ওর চোখে জল আসছে না। বরং কেমন একটা ভয় লাগছে খালি। বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।মানুষটা নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পরেও বেশ কিছুদিন ঠিক এইরকমই লাগত। লাবণ্যদের জন্য ওর দুশ্চিন্তা হতে থাকে। ওরই মতো খারাপ কপাল নিয়ে জন্মেছে মেয়েটা। জানার কোনো উপায় নেই কেমন আছে লাবণ্যরা। কোথায় বিয়ে হল নির্মলার, কার সঙ্গে, তাই বা আজ ও জানবে কী করে ! এ কেমন ধারা স্বাধীনতা এল ! নিজেদের কাছের মানুষেরাই একে অপরের থেকে চলে গেল কত দূরে ! একটা খবর পর্যন্ত পাওয়ার আর উপায় থাকল না ! কী লাভ সেই স্বাধীনতা পেয়ে যে-স্বাধীনতা বাবা মায়ের মৃত্যু হলে অশৌচটুকু পালন করার পর্যন্ত সুযোগ দেয় না ?
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ৯
❤ Support Us







