- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ১৯, ২০২৫
হিরণবালা। পর্ব ২৫
যেভাবেই হোক দাদাকে রাজি করিয়ে অভিমান ভাঙিয়ে হাজির করতে হবে সত্যর বিয়েতে আর মনোরঞ্জনদের বাড়িতে জানিয়ে দিতে হবে নির্মলার কথা । দুটো কাজ সোজা নয়, কঠিন । কিন্তু এই জীবনে কত কঠিন কাজই তো এখনও পর্যন্ত সহজেই করে ফেলেছে হিরণ... তারপর
৪৫
সত্যর বিয়েটা যে এভাবে রাজনীতির যাঁতাকলে পড়ে যাবে, তা কখনও ভাবতেও পারেনি হিরণ। গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বামপন্থীদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটা। গত বিধানসভা নির্বাচনে হেরে গিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেস যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কখনও হারতে পারে, এ কথা কেউ ভাবতেই পারত না। কিন্তু, হয়েছে তাই। তৈরি হয়েছিল যুক্তফ্রন্টের সরকার। সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। উপমুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। যুক্তফ্রন্টের সরকারের সময়টা প্রথম থেকেই ভালো যাচ্ছিল না। ১৯৬৭ সালের মে মাসে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়িতে শুরু হয়েছিল কৃষক আদিবাসীদের আন্দোলন। যুক্তফ্রন্টের শরিক সিপিআইএম পার্টি থেকেই একাংশ ভেঙে গিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনের। এরই মাঝে যুক্তফ্রন্টের ভেতরের নানা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ মন্ত্রিসভা থেকে হঠাৎ পদত্যাগ করেন। তিনি ১৬ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট ত্যাগ করে প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নতুন দল তৈরি করেই প্রফুল্ল ঘোষ সরকার গঠনের ইচ্ছা প্রকাশ করলে কংগ্রেস তাঁকে সমর্থন জানায়। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়কে নির্দেশ দেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে বিধানসভার অধিবেশন ডাকতে হবে। কিন্তু অজয় মুখোপাধ্যায় রাজ্যপালকে জানান যে, তিনি বিধানসভার অধিবেশন ডাকতে পারবেন না। এরপরই ১৬ নভেম্বর রাজ্যপাল যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে অজয় ঘোষকে নতুন সরকার গঠনের সুযোগ দেন। যুক্তফ্রন্ট তাদের মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করে তার প্রতিবাদে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বড়ো জনসভার আহ্বান জানায়। সেই সভা রুখতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালায়। এর প্রতিবাদেই যুক্তফ্রন্ট, রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম সমিতি ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন মিলে পশ্চিমবঙ্গে কাল আর পরশু দু-দিনব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। আর কালই সত্যর বিয়ে। হিরণ বুঝেই উঠতে পারছে না বরযাত্রীরা যাবে কীভাবে।
জীবন একটা সময় এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায় যে, মনে হয় জীবনের বাকি ঘটনাগুলিও দ্রুত ঘটতে থাকুক। মনে হয় শেষে যা আছে, তা এক্ষুনি দেখতে চাই। অন্তত আভাস পেতে চাই তার। মন কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছটফট করতে থাকে সারাক্ষণ
সত্যর বিয়েটা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা কিছু ঘটেছে। দাদাদের নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিল হিরণ আর সত্য দুজন মিলে। কিন্তু দাদা স্পষ্ট ভাষায় ওদের জানিয়ে দিয়েছে যে, সত্যর বিয়েতে ওরা আসবে না। হিরণ বুঝেছে যে, ও ঠিকই বুঝেছিল। দাদার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা ওই আঘাত লাগা প্লাস্টিকের কাপের মতোই হয়ে গেছে। কাচের কাপের মতো এক ধাক্কায় সে সম্পর্ক ভেঙে চুরচুর হয়ে যায়নি ঠিক, কিন্তু এক চিড় ধরেছে; যে-চিড় সহজে মেরামত হবে না। ভালো খবর বলতে এটাই যে, মনোরঞ্জনদের নির্মলা আর ওই মানুষটার কথা খুলে বলতে পেরেছে হিরণ। এবং ওকে আশ্চর্য করে মনোরঞ্জনের মা এবং মনোরঞ্জন দু-জনেই ঘটনাগুলোকে খুব সহজভাবেই নিয়েছে। এই সমস্ত কিছু নিয়েই বেশ টেনশনেই ছিল হিরণ। তার ওপর এসে পড়ল এই ধর্মঘটের উটকো ঝামেলা। আগামীকালই লাবণ্যদেরও অশোকনগর থেকে আসার কথা। ওরাই বা কীভাবে রামসাগরে এসে পৌঁছবে হিরণ বুঝে উঠতে পারছে না। খবর যে নেবে, সে উপায়ও তো নেই।
সুরেন গোঁসাই বলল, বরযাত্রীর সংখ্যা কমাতে হবে আর খুব ভোরের দিকের লোকাল ট্রেন ধরে প্রথমে চলে যেতে হবে মেদিনীপুর তারপর সেখান থেকে আবার লোকাল ট্রেন ধরে হাওড়া। দিনের আলো ফুটে হাঙ্গামা লাগার আগেই ওদের কলকাতায় পৌঁছে যেতে হবে। তারপর ঠিকই একটা ব্যবস্থা হবে টালিগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার।
কথা ছিল বরযাত্রী যাবে ৩০ জন। গোবিন্দ, গীতা, মনোরঞ্জন, ঘোঁতন, কুট্টি, হিরণদের পাড়ার কয়েকজন লোক, হিরণের হাসপাতালের সহকর্মী, সত্য আর গোবিন্দর বন্ধুবান্ধব মিলে এই সংখ্যাই দাঁড়াচ্ছিল। সেই সংখ্যাকে কমিয়ে ১০জনে নামিয়ে আনল হিরণ। এসব করতে ওর খুব লজ্জাই লাগছিল। কিন্তু, অন্য উপায়ও তো নেই! রাত দুটোর সময় রওনা করে দিল বরযাত্রীদের। দুরু দুরু বুকে দুটো দিন অপেক্ষা করার পর যখন শেষ পর্যন্ত বউ নিয়ে সত্য ফিরল, তখন কী যে শান্তি পেল হিরণ তা ও বলে বোঝাতে পারবে না। তবে সুরেন গোঁসাইয়ের প্ল্যান অনুযায়ী মাঝরাত্তিরে বরযাত্রীটা বেরিয়ে যাওয়াতেই শেষ পর্যন্ত বিয়েটা তিথি নক্ষত্র মেনে হয়েছিল। যদিও হাওড়া স্টেশন থেকে সকলকে পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছিল অনেকটা। এরপর হাতে টানা রিকশাতে টালিগঞ্জ। এত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সত্যর বিয়েটা যে শেষমেশ হল, সেটাই সবচেয়ে শান্তির হিরণের কাছে।
৪৬
জীবন একটা সময় এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায় যে, মনে হয় জীবনের বাকি ঘটনাগুলিও দ্রুত ঘটতে থাকুক। মনে হয় শেষে যা আছে, তা এক্ষুনি দেখতে চাই। অন্তত আভাস পেতে চাই তার। মন কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছটফট করতে থাকে সারাক্ষণ। হিরণ বোধহয় এখন জীবনের সেই পর্বে এসে দাঁড়িয়েছে। সত্যর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেই ওর বারবার মনে হচ্ছে আর দুটো কাজ ওর জীবনে দেখা বাকি আছে। গোবিন্দর একটা পাকাপাকি চাকরি হওয়া আর ওর বিয়ে। যত দ্রুত এই দুটো ঘটনা ঘটে, ততই ও খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়। কলকাতার আলোকিত জীবন ছেড়ে এই রামসাগরের মতো গায়ে এসে কতখানি মানিয়ে নিতে পারবে মঞ্জুশ্রী সে নিয়ে খানিকটা উৎকণ্ঠা ছিল হিরণের। মঞ্জুশ্রী কিন্তু দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, ঘোঁতনের সঙ্গে তার মামির বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দ্রুত। বিষয়টা নিয়েও খানিকটা চিন্তা ছিল হিরণের। এই চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছে ও। মঞ্জু ঘরে আসায় অনেকখানি নিজের কাজেরও সুরাহা হয়েছে হিরণের। গীতা থাকার সময় যেমন হাতে হাতে অনেকখানি কাজ করে দিত গীতা, তেমনটাই হচ্ছে এখন। ঘোঁতনের ব্যাপারেও খুব বেশি ভাবতে হচ্ছে না হিরণকে। সেও এক স্বস্তি।
কলকাতার কলেজগুলোর বুদ্ধিমান সব ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছে এই আন্দোলনে। এমন একটা অস্থিরতা সমাজের সর্বত্র। মাঝে মাঝে হিরণের মনে হয় ভাগ্যিস এই পর্বটার অনেক আগেই সত্যর পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে। তা না হলে ও যেভাবে রাজনীতির কথা বলত, তাতে বলা যায় না ও হয়তো এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যেতে পারত। ভাগ্যিস তা হয়নি।
একটা বিষয় যদিও হিরণকে ভাবাচ্ছে। সত্য স্কুলের কোয়াটার্স পাবে। ফাঁকাও আছে। কিন্তু, এখনও কোয়ার্টার্স নেয়নি সত্য। কেননা বেলিয়াতোড়ে গিয়ে নতুন সংসার পাতার খরচ অনেকখানি। এখনও হোস্টেলেই আছে সত্য। আগের মতোই সপ্তাহান্তে বাড়ি ফেরে। তবে, এভাবে যে দীর্ঘদিন চলতে পারে না, তা হিরণ বোঝে। একটা সময় সত্যকে অবশ্যই বেলিয়াতোড়েই কোয়াটার্স নিতে হবে। তখন ওর পরিবারের কী হবে তা নিয়ে খানিকটা চিন্তা হয় হিরণের। গোবিন্দ কোথায় চাকরি পায় সেটা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। হিরণের রামসাগরে থাকা অনেক দিন হয়ে গেল। এবার ওকে ট্রান্সফার করে দিতে পারে। হয়তো তিন জায়গায় ছড়িয়ে থাকবে ওরা তিনজন। এজন্যই হিরণ দ্রুত দেখতে চায় গোবিন্দ একটা চাকরি পাক। কেননা তাহলে হয়তো আগামী ১০ বছরে ওদের ভবিষ্যৎটা কী হতে চলেছে তার খানিকটা আন্দাজ হিরণ পাবে। জীবনের একেবারে অনিশ্চিত অন্ধকার একটা পথ ধরে হাঁটতে একসময় ও বাধ্য হয়েছিল। এখন আর তেমনটা ইচ্ছে করে না।
আর কয়েক মাস পরেই বছর পুরে যাবে। গোবিন্দর এই চাকরিটা শেষ হয়ে যাবে। তখন আবার বেকার হয়ে যাবে ছেলেটা। তার আগেই একটা চাকরি ওর হয়ে গেলে ভালো। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকটা চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে গোবিন্দ। কতগুলো কেন্দ্র সরকারের আর একটাই রাজ্য সরকারের। আস্তে আস্তে চাকরির জায়গাটা একটু হলেও খুলছে। যদিও গোটা রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। নকশাল আন্দোলন বেশ ভালো গতি পেয়ে গেছে এ রাজ্যে। কলকাতার কলেজগুলোর বুদ্ধিমান সব ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছে এই আন্দোলনে। এমন একটা অস্থিরতা সমাজের সর্বত্র। মাঝে মাঝে হিরণের মনে হয় ভাগ্যিস এই পর্বটার অনেক আগেই সত্যর পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে। তা না হলে ও যেভাবে রাজনীতির কথা বলত, তাতে বলা যায় না ও হয়তো এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে যেতে পারত। ভাগ্যিস তা হয়নি।
এ-দেশে যেমন অস্থিরতা, ওদেশেও ঠিক তেমনই অস্থিরতা। শেখ মুজিবুর রহমান ক্রমশই পাকিস্তানের সরকারের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠছেন। ওঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ। শুরু হয়েছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এ মামলার আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের বিচার। মামলায় ৩৫জনকে আসামি করা হয়েছে। আবার বছরের শুরুতেই ওপার বাংলা জুড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে উঠেছে। আন্দোলন দমন করতে না পেরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। কী যে হবে ওই পেছনে ফেলে আসা দেশটার ভেবেও মাঝে মাঝে খুবই দুশ্চিন্তা হয় হিরণের। নিজেকে একজন ভারতীয় হিসেবে এখন খুবই ভালো চিনতে পারে হিরণ। কিন্তু, ওপার বাংলার জন্য টান তো যায় না। এ তো নাড়ির টান ! কোনোদিনই হয়তো এই টান থেকে মুক্ত হবে না ও।
৪৭
লাবণ্যর যে এত বড়ো বিপদ হতে পারে, তা কখনো ভাবতেই পারেনি হিরণ। অকর্মণ্য, মাতাল এক বরের হাতে পড়ে ওর জীবনটা অনেকখানি টালমাটাল হয়ে গিয়েছিল, এটা ঠিক। তবে এইরকম একটা বিয়ের পরিণতি যে এমন ভয়ংকর হতে পারে, তা সত্যিই কল্পনাতেও আনতে পারেনি হিরণ। যে-কাজটা লাবণ্য করছিল তাতে ঝুঁকি ছিল অনেকখানি। প্রথমবার শুনেই এটা মনে হয়েছিল হিরণের। কিন্তু, লাবণ্য যেসব কথা ওকে বলেছিল তাতে ও ভেবেছিল পুলিশের সঙ্গে একটা বোঝাপড়াই হয়ে গেছে লাবণ্যদের। তাই এই বিপদের কথাটা মাথাতেই আসেনি হিরণের।
তিন দিন আগে যখন হঠাৎ করেই বিকেলবেলা অনন্তলাল দুই মেয়ে মীরা আর কৃষ্ণাকে নিয়ে রামসাগরে হাজির হয়েছিল, তখনও হিরণ বুঝতে পারেনি এত বড়ো বিপদের মধ্যে ওরা পড়েছে। কিছু একটা সমস্যা আছে হয়েছে সেটা বুঝেছিল ওদের সঙ্গে লাবণ্য না আসায়, কিন্তু লাবণ্য যে জেলে চলে গেছে সেটা ও দূর কল্পনাতেও আনতে পারেনি। অনন্তলালকে ও জিজ্ঞেস করেছিল, তোমরা এহন? লাবণ্য কই?
উত্তরে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে অনন্তলাল বলেছিল যে, লাবণ্যদের গোটা দলটাকেই চাল পাচার করার সময় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে শিয়ালদহে। ব্যাংকশাল কোর্টে তোলে। এখান থেকে ওদের পুলিশ-কাস্টডি হয়েছে। জেলে রয়েছে লাবণ্য। জামিন কবে পাবে জানে না।
লাবণ্যদের গোটা দলটাকেই চাল পাচার করার সময় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে শিয়ালদহে। ব্যাংকশাল কোর্টে তোলে। এখান থেকে ওদের পুলিশ-কাস্টডি হয়েছে। জেলে রয়েছে লাবণ্য। জামিন কবে পাবে জানে না
অনন্তলালের কথা বিশ্বাসই হচ্ছিল না হিরণের। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ও বুঝতে পেরেছিল যে, ঘটনাটা ঘটে গেছে। আর দুই মেয়েকে কীভাবে সামলাবে বুঝতে না পেরে অনন্তলাল ওদের নিয়ে সোজা চলে এসেছে হিরণের কাছে। দাদার কাছে যায়নি। কারণ দাদার ওপর বাড়তি চাপ চাপাতে চায়নি অনন্তলাল। লাবণ্যর জামিনের জন্য দাদাই দৌড়ঝাঁপ করছে।
মীরা আর কৃষ্ণার দেখাশুনো খুব মনোযোগ দিয়ে করছে মঞ্জু। কিন্তু এইরকম একটা বিপদে ও যেন একটু ঘাবড়ে গিয়েছে। মীরার বছর চোদ্দ বয়স হবে। ও খানিকটা বুঝেছে ঘটনাটার অভিঘাত। কিন্তু মাঝে মাঝেই ফুুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠছে কৃষ্ণা। ওর বয়স মাত্র ১০। বেচারি কখনোই মাকে ছেড়ে এভাবে থাকেনি। ওদের এখানে রেখে ফিরে গেছে অনন্তলাল। এই ঘটনার পরও মানুষটার হুঁশ ফিরবে কি না হিরণ জানে না। ওর এমন একটা আলগা গাছাড়া ভাব আছে, জীবনকে এত সহজভাবে ও নিতে পারে যে, আশ্চর্য হতে হয়! খুব কঠিন সময়েও ও নির্বিকার ভাবে নেশা করতে পারে, ঘুমোতে পারে। এবার যে অন্তত মেয়ে দুটোকে নিয়ে এসে পৌঁছে দিয়েছে হিরণের কাছে, সেটাই অনেক।
মীরা রান্নায় সাহায্য করছে মঞ্জুকে তরকারি কেটে। গল্প করছে ওরা দু-জন। একটু দূরে বসে শুনছে হিরণ। মীরা বলছে, মা ছাড়া না পাইলে আমাগো যে কী হইব কে জানে!
মঞ্জু বলে, মাসি ছাড়া পাইব ঠিক। এত চিন্তা করনের প্রয়োজন নাই। মামা যখন লাগছে, তখন ঠিক একখান বিহিত কইর্যা ছাড়ব। তবে এবার ছাড়া পাইলে, মাসিরে কইও ওই চোরাচালানোর কাম যেন আর না করে।
মীরা বলে, আর কী কাম করব মা? লোকের বাড়ি তো আর বাসন মাজতে যাইতে পারে না।
শুনে বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠে হিরণের। ও ভাবতেও পারে না যে, ওর বোন লোকের বাড়িতে ঝাঁট দিচ্ছে, বাসন মাজছে। কত আদরের সঙ্গে ওদের চার ভাইবোনকে মানুষ করেছিল বাবা-মা। আর আজ কী অবস্থা হয়েছে লাবণ্যটার! হঠাৎ ওর সমস্ত রাগটা গিয়ে পড়ে অনন্তলালের ওপরেই। এই লোকটার জন্যই লাবণ্যর আজ এত দুর্গতি। ও ঠিক করে এরপর অনন্তলালের মুখোমুখি হলেই ওকে বিশ্রী ভাষায় অপমান করবে। এই ধরনের লোকেদের একটু অপমান হজম করা উচিত। তাতে যদি ওদের হুঁশ ফেরে।
দু-দিন পরে হিরণ গোবিন্দকে কলকাতা পাঠায় দাদার কাছে। লাবণ্যর খোঁজ নিয়ে আসতে। ভোরবেলা রামসাগর থেকে বেরিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরে গোবিন্দ। জানায় যে, পুলিশ কাস্টডি থেকে এখনও ছাড়া পায়নি লাবণ্য। দু-দিন পরে মামলা উঠবে ব্যাংকশাল কোর্টে। একজন ভালো উকিলকেই লাগিয়েছে দাদা। যতজন চালপাচারকারী একসঙ্গে ধরা পড়েছিল, তাদের পরিবারের সকলে মিলে খরচা ভাগ করে নিচ্ছে উকিলের। কলকাতা শহরে উদ্বাস্তুদের একটা ইউনিয়ন হয়েছে। দাদা তাদেরও জানিয়েছে। দরকার পড়লে কিছু টাকা তারাও দেবে আশ্বাস দিয়েছে। দাদা গোবিন্দকে বলেছে যে, পরেরদিন জামিন পেয়ে যাবে লাবণ্যরা। শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে হিরণ। এ কথা ঠিক প্রতিদিন যোগাযোগ থাকে না লাবণ্যদের সঙ্গে। কিন্তু বোন তো ! রক্তের টান কোথায় যাবে ! হঠাৎই হিরণ দ্যাখে ওর বড়দির কথা খুব মনে পড়ছে। সে হয়তো ওদের কথা আর ভাবেই না। হয়তো দিব্যি আনন্দেই আছে ঢাকায়। এদেশে ওর দুই বোন আর দাদাকে কতখানি কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে, জানেই না, ভাবেও না। নাকি ভাবে? নাকি বড়দিরও এতখানিই কষ্ট হয়, যতখানি কষ্ট আজ হিরণের হচ্ছে?
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ২৪
❤ Support Us








