- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুন ৮, ২০২৫
হিরণবালা । পর্ব ৮
আড্ডায় ভোটই এখন আলোচনার বিষয় । নির্বাচনে সারাদেশে কংগ্রেস বেশ ভালো করলেও বাংলাতে মুসলিম লিগের জয়জয়কার । বামাপদ বলল, গান্ধীজি দেশভাগ চান না । স্যারের মতে, গান্ধীজি এখন কংগ্রেসে মাইনরিটি, তাই ওঁর মত রাজনৈতিকভাবে খুব একটা ম্যাটার করবে না। ভট্চাজ কাকুর মত দেশভাগের পক্ষেই । এসব কথায় শঙ্কিত হয় হিরণ । ভাবে, দাদাকে কি বলবে, বাবা আর মাকে এখানে নিয়ে চলে আসার জন্য? তর্কাতর্কির মাঝেই একটা টেলিগ্রাম এলো .... তারপর
১১
বিপদ কিছুতেই হিরণের পিছু ছাড়ছে না। বিধাতা বোধহয় চাইছেন না ও ভালো থাকুক। না হলে সত্যর এত বড়ো বিপদ হয়? দাদার সঙ্গে ট্রেনে করে শ্রীরামপুর যাচ্ছিল সত্য। জানলা দিয়ে বারবার মুখ বাড়িয়ে দেখছিল বাইরের প্রকৃতি। দাদা ওকে বারবার নিষেধ করেছিল জানালা দিয়ে মুখ বাড়াতে। সত্য সেকথা শোনেনি। ট্রেনের ধোঁয়ার মধ্যে থাকা কয়লার একটা ছোট্ট কুচি এসে বিঁধে যায় সত্যর চোখে। চোখটা প্রথমে লাল হয়, তারপর ফুলে যায় মারাত্মকভাবে। এখন সারাদিন চোখ থেকে জল পড়ছে। দাদা সত্যকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বড়ো ডাক্তার দেখিয়েছে। তিনি বলেছেন দ্রুত অপারেশন করে ওই কয়লার কুচিকে চোখ থেকে বের করতে হবে। তবে এই অপারেশনের ঝুঁকি আছে। দাদা হিরণের সঙ্গে আলোচনা না করে অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। তাই টেলিগ্রাম করে হিরণকে ডেকে পাঠিয়েছে কারণ ডাক্তারবাবু বলেছেন এভাবে কয়লার কুচি থেকে চোখের মধ্যে রেখে দেওয়া যাবে না। ক্ষতি হবে এতে। অপারেশন করতে হবে দ্রুত।
১৭ই আগস্ট অপারেশনের দিন ঠিক হল। সত্যকে নিয়ে দাদার সঙ্গে হিরণ নিজেই গেছিল ডাক্তার মুখার্জির চেম্বারে। হিরণ নার্স এই কথা জেনে ডাক্তারবাবু ওকে বুঝিয়েছেন অপারেশনের ঝুঁকি কতটা। একথাও বলেছেন যে, অপারেশন ঠিকঠাক না হলে, সত্যকে একটা চোখ হারাতে হতে পারে। সত্যর সামনেই এই কথাগুলো ডাক্তারবাবু বলছিলেন হিরণ আর দাদাকে। শুনে ভয়ে সত্যর মুখ একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। এই কদিন ধরে হিরণকে টানা ওকে অভয় দিতে হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে কি, হিরণ নিজেও একটু ঘাবড়ে আছে। আর কত পরীক্ষার মুখে ঈশ্বর ওকে ফেলবেন ?
হিরণ কাঁথিতে ফিরে যাওয়াই স্থির করল। স্যারকে দিয়েই আপাতত কিছুদিন সত্যর চিকিৎসা করাতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তখন কলকাতায় আবার এসে অপারেশন করানো যাবে। আর এর মধ্যে যদি সত্য চোখ সত্যিই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কীই বা থাকে ! দাদা তো একটা কথা ভুল বলেনি। চোখের চেয়ে প্রাণ তো বড়ো।
১৭ আগস্ট শেষ পর্যন্ত অপারেশন করানো গেল না। কলকাতার পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। ১৬ই আগস্ট মুসলিম লিগ হরতাল ডেকেছিল। জিন্না একে বলেছিলেন ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে। সেদিন প্রথমে নাকি মুসলিমরা মিছিল নিয়ে বেরিয়ে হিন্দুদের কতগুলো দোকান বন্ধ করে দেয়। জোর করে দোকান বন্ধ করা নিয়েই শুরু হয় তর্কাতর্কি। তারপর হাঙ্গামা। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত শুরু হয় ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। এখনও দাঙ্গার আগুন পুরোটা নেভেনি। এই ক-দিনে প্রচুর মানুষ খুন হয়ে গেছে। প্রাণ গেছে হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের মানুষেরই। কিন্তু, দাদা বলছে দাঙ্গা মুসলিমরা শুরু করলেও তারাই নাকি মারা গেছে বেশি। গোপাল পাঁঠা নামে একজন কেবল হিন্দু মা-বোনেদের সম্মানই রক্ষা করেনি, খুন করেছে প্রচুর মুসলিমকে। অবশ্য এসব খবরের কোনটা যে কতখানি ঠিক হিরণ বুঝে উঠতে পারে না। যা শোনা যাচ্ছে তার অনেকটাই যে গুজব, এটুকু সে ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে। এও বুঝেছে যে, কেবল খুনখুনিতেই দাঙ্গা আটকে থাকেনি। ঘরবাড়ি, সম্পত্তি তছনছ হয়েছে। গাড়িঘোড়া জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এমনকি ধর্মতলায়। আজ ২১ তারিখ। পরিস্থিতি খানিকটা শান্ত। কিন্তু দাদা এই অবস্থাতেও সত্যকে নিয়ে কলকাতায় যেতে চাইছে না। দাঙ্গার আঁচ হাওড়ায় তেমনটা লাগেনি। হাওড়া দিয়েই বরং কলকাতা ছেড়ে মানুষ বাংলার নানা জায়গায় চলে গেছে এই ক-দিনে। সত্যর চোখ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে ভীষণ। কিন্তু দাদা ওকে বলছে, সত্যকে নিয়ে কাঁথিতে ফিরে যেতে। বলছে যে, চোখের চেয়ে প্রাণের দাম বেশি। হিরণ বুঝতে পারছে যে দাদা ভয় পাচ্ছে কলকাতার দাঙ্গার রেশ হাওড়াতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভয় পাচ্ছে এই কঠিন পরিস্থিতিতে পরের ছেলের দায়িত্ব নিতে। সত্য যতই দাদার ভাগ্নে হোক, নিজের ছেলে তো নয়।
অনেক ভেবেচিন্তে শেষমেশ হিরণ কাঁথিতে ফিরে যাওয়াই স্থির করল। স্যারকে দিয়েই আপাতত কিছুদিন সত্যর চিকিৎসা করাতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তখন কলকাতায় আবার এসে অপারেশন করানো যাবে। আর এর মধ্যে যদি সত্য চোখ সত্যিই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর উপায় কীই বা থাকে ! দাদা তো একটা কথা ভুল বলেনি। চোখের চেয়ে প্রাণ তো বড়ো।
কাঁথিতে ফিরে সোজা স্যারের বাড়ি সত্যকে নিয়ে গিয়ে হাজির হল হিরণ। স্যার সত্যর চোখ দেখে বললেন যে, চোখটার অবস্থা বেশ খারাপ এবং উনি এর চিকিৎসা করতে পারবেন না। কিছু ওষুধ পত্র দিয়ে কোনোরকমে ঠেকনা দেবেন খালি। যত দ্রুত পারা যায় অপারেশন করিয়ে নেওয়াই উচিত।
১২
—দাঙ্গাটা ঘটানো হয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনা করে। জিন্না আর সোহরাওয়ার্দিই হচ্ছেন দায়ী। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে–এ আবার কেমন কথা? নামেই তো বোঝা যাচ্ছে যে, মারদাঙ্গা করার জন্য উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। ‘অ্যাকশন’ মানে তো তাই। আর তুমি কেমন প্রধানমন্ত্রী যে কিনা মিটিংয়ে বলে দিলে পুলিশকে বলা আছে, ওরা কুটোটিও নাড়বে না, নিষ্ক্রিয় থাকবে ? এ কি প্রধানমন্ত্রীর কাজ নাকি ? গোপাল পাঁঠা না থাকলে মোল্লারা কলকাতার সব হিন্দুদের কেটে কুচিকুচি করে ফেলত।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উত্তেজিত স্বরে বললেন রামকৃষ্ণকাকু। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। বৃষ্টি তবু হচ্ছেই। এই সময়টায় হাসপাতালে রুগি আসে প্রচুর। নানা ধরনের রোগ মানুষজনের হতেই থাকে। জল থেকেই মূলত রোগ ছড়ায়। আর আছে সাপের উপদ্রব। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ সাপে কাটা পড়ে। তবে সাপে কাটা রুগি হিরণরা বেশি পায় না। ডাক্তারের কাছে আসার চেয়ে মানুষজন ওঝার কাছে যেতেই পছন্দ করে। মারাও যায় বিনা চিকিৎসায়। কিন্তু তাও হাসপাতালে আসতে চায় না। বামাপদরা গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সাপে কাটলে রুগিকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু এতে পরিস্থিতির তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। আজও সকাল থেকে খুবই চাপ ছিল হাসপাতালে। এখন একটু ফাঁকা হওয়ায় চায়ের আসর বসেছে। একথা ওকথার পর প্রতিদিনের মতোই আজও কলকাতার দাঙ্গাই আলোচনার বিষয়। আজ অন্যদিনের চেয়ে রামকৃষ্ণকাকু অনেক বেশি উত্তেজিত। ওঁকে খানিকটা ঠান্ডা করতেই হিরণ বলে, এত রাইগ্যা যাইতাসেন ক্যান? কাকিমার লগে ঝগড়া করসেন নাকি ?
রামকৃষ্ণকাকু বললেন, রাগব না ? কী সব খবর আসছে, জানো ?
বামাপদ বলল, কী খবর ?
রামকৃষ্ণকাকু বললেন, গতকাল আমার ভাইপো এসেছিল। সে পড়াশোনা করে কলকাতায়। বলল দাঙ্গার সময় খবরকাগজে ছাপা হয়েছিল, মোল্লারা নাকি ঠনঠনে কালীবাড়ি আক্রমণ করেছিল। স্পর্ধা ভাবো একবার। রাজাবাজারের কাছে ভিক্টোরিয়া কলেজের গার্লস হোস্টেলে ঢুকে মোল্লারা মেয়েদেরকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর তাদের খুন করে। ট্রামলাইনে ঝুলিয়ে দিয়েছিল ওদের কাটা হাত-পা।
হিরণ শুনে চমকে উঠল। দাঙ্গায় অনেক মানুষ মারা গেছে ঠিক। কিন্তু এত বীভৎস ঘটনা ঘটে থাকতে পারে খোদ কলকাতার বুকে, সেটা ওর যেন বিশ্বাস হতে চায় না। ও জিজ্ঞেস করে, কোন কাগজে লিখসে কাকু ?
রামকৃষ্ণকাকু বললেন, ওই প্রত্যহ না টত্যহ কী একটা কাগজের নাম করছিল ভাইপো।
হিরণ বলে, কাগজে লিখলেই তা সত্য ক্যামনে কই? এসব দ্যাখসে কেডা ?
বামাপদ বলে, দিদি এসব গুজব, এসব গুজব। ঠনঠনে কালীবাড়ির বিষয়টা বলতে পারব না। কিন্তু, ভিক্টোরিয়া কলেজের বিষয়টা জানি। দাঙ্গাবাজরা আক্রমণ করতে পারে এরকম একটা খবর পেয়ে মুসলিম ভাইয়েরা আর ট্রাম কোম্পানির মুসলিম শ্রমিকেরা দিন রাত এক করে ওই হোস্টেলটা পাহারা দিয়েছিল। আর বলা হচ্ছে ওরা নাকি খুন করেছিল হিন্দু ছাত্রীদের।
বামাপদ বেশ রেগেমেগেই বলল,খবরকাগজ যারা চালায় তারাও তো আমাদেরই মতো মানুষ। তাদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকতেই পারে। আপনি কোনো খবরই রাখেন না, অথচ তর্ক করেন। বিকেল তিনটের আগেই পুলিশ কমিশনার গভর্নরকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন সেনা নামাতে। ব্রিটিশরাই সেনা নামায়নি। ব্রিগেডিয়ার সিক্সস্মিথই সেনা না নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর কোনো হাতই ছিল না।
স্যার এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন আর মিটিমিটি হাসছিলেন। এবার হাসতে হাসতেই বললেন, কিছু মনে করবেন না রামকৃষ্ণবাবু। কাটা হাত-পা ট্রাম লাইনের তারে ঝুলিয়ে দেওয়া হল–এতটা কি বিশ্বাস করা যায়, বলুন ?
রামকৃষ্ণকাকু বললেন, ছাপার অক্ষরে লেখা কথা কি মিথ্যে হতে পারে নাকি ?
বামাপদ বলল, অবশ্যই হতে পারে। খবরকাগজ যারা চালায় তারাও তো আমাদেরই মতো মানুষ। তাদের অসৎ উদ্দেশ্য থাকতেই পারে।রামকৃষ্ণকাকু বললেন, এই কথাটা কি ভুল যে, সোহরাওয়ার্দি ১৬ তারিখে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছিলেন ? বামপদ বলল, তাতে কি প্রমাণ হয় যে, দাঙ্গা উনিই লাগিয়েছিলেন ?
রামকৃষ্ণকাকু বললেন, ওঁর তো উচিত ছিল সেনা নামানো। সেনা নামাননি কেন ?
বামাপদ বেশ রেগেমেগেই বলল, আপনি কোনো খবরই রাখেন না, অথচ তর্ক করেন। বিকেল তিনটের আগেই পুলিশ কমিশনার গভর্নরকে ফোন করে অনুরোধ করেছিলেন সেনা নামাতে। ব্রিটিশরাই সেনা নামায়নি। ব্রিগেডিয়ার সিক্সস্মিথই সেনা না নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর কোনো হাতই ছিল না।
বামাপদর কথা শুনে রামকৃষ্ণকাকু বেশ গলা উঁচিয়েই বলেন, মোল্লাদের জন্যই এই দাঙ্গা হয়েছে সে তুমি যতই স্বীকার করতে না চাও।
বামাপদ বলে, এই দাঙ্গাটাকে নিছক একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে দেখা উচিত হচ্ছে না কাকু। সে আপনি যতই গলা চড়িয়ে এই কথা প্রমাণ করার চেষ্টা করুন না কেন। আপনি জানেন মুসলিম পট্টিগুলো থেকে মুসলমান পরিবারগুলোকে বের করে দেওয়ার পর সেই বাড়িগুলোর দখল নিচ্ছে প্রোমোটাররা ?
রামকৃষ্ণকাকুর মতোই বামাপদর গলাও বেশ চড়াতেই উঠেছে। তর্ক যে আর নিছক তর্ক থাকছে না এটা বুঝতে পেরেই স্যার এবার বললেন, আর তর্ক করে লাভ নেই। দু-জনের কথাতেই খানিক খানিক যুক্তি আছে বৈকি। বামাপদ, দাঙ্গার নানা ধরনের কারণ থাকে। তবে এইটে বলা কিন্তু ঠিক হবে না যে, এই দাঙ্গাটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। হিন্দু মুসলমানই তো একে অপরকে মেরেছে। আর রামকৃষ্ণবাবু গোপাল পাঁঠা আর তার দলবল যে অনেক মুসলমানকে মেরেছে এ কথা তো সকলেই জেনে গেছে আজ। আবার খবরকাগজ যা লিখছে তার সবটাই বিশ্বাস করা উচিত হবে না। কেননা অমৃতবাজার পত্রিকার মৃণালকান্তি ঘোষ আর দৈনিক বসুমতী পত্রিকার হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ তো ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মিটিংয়ে হাজির ছিলেন।
বামাপদ এবার বলল, অমৃতবাজার পত্রিকার ভূমিকাটা আমার একদম ঠিক লাগছে না স্যার। দেশভাগ আমরা চাই কিনা তা জানতে ওরা একটা গণভোট করল। এর কি কোনো দরকার ছিল বলুন ?
স্যার বললেন, শুধু ভোটই করল না, সেই ভোটের রেজাল্টও প্রকাশ করল। দেখাল যে, ৯৮.৬% হিন্দু দেশভাগ চাইছে।
রামকৃষ্ণ বাবু বললেন, আমরা তো চাইছি দেশভাগ। বেঙ্গল পার্টিশন লিগ তৈরি হয়েছে। আমরা দেশভাগ চাইছি। ভাইয়ে ভাইয়ে ঝামেলা হলে আলাদা হয়ে গিয়ে শান্তিতে থাকাই ভালো। উঠোনে পাঁচিল তোলাই ভালো।
স্যার বললেন, পাঁচিল তুললেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না। সমস্যা কিন্তু রয়েই যায়। কখনো-কখনো বাড়তেও থাকে।
বামাপদ বলল, ঠিক এই কারণেই আমি দেশভাগ চাই না।
স্যার বললেন, তুমি না চাইলেও দেশভাগ হবেই। এই তো ইন্টারিম সরকারে মুসলিম লিগ পার্টিসিপেট করতেই চাইছে না। তবে এই দাঙ্গাটার পর একটা জিনিস স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সত্যি সত্যিই যদি মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ হয়ও, সে দেশে ওরা কলকাতাকে নিতে পারবে না কিছুতেই। দাঙ্গা থেকে এই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে গেছে।
এই কথা শুনে রামকৃষ্ণকাকু যেন খানিকটা আশ্বস্ত হয়েছেন মনে হল। বললেন, কলকাতা ছাড়া ওরা যদি দেশ বানায়, সে দেশের কি কোনো মূল্য থাকবে নাকি? ও দেশকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যেই আনবে না। থাক মোল্লারা ওদের ঢাকা আর লাহোর নিয়ে।
স্যার বললেন, আমি কি ভয় পাচ্ছি জানেন? এই দাঙ্গার রেশ গড়াবে অনেক দূর। এখানেই থামবে না। পদ্মার ওই পারে কী হয় দেখুন।
শুনে আবার বুক ঢিপঢিপ করতে থাকে হিরণের। ওখানেও যদি দাঙ্গা ছড়ায়, কী হবে তাহলে বাবা-মা, দিদি-বোনের ? কেমন যেন অমঙ্গলের আশঙ্কা হতে থাকে। বহুদিন পরে ওর মনে পড়ে নির্মলার কথাও। মেয়েটার কোনো খবরাখবরই ও পায়নি বহুদিন। স্যার, রামকৃষ্ণকাকু, বামাপদ কথা বলেই যেতে থাকে। সেসব কথা ওর কানেই ঢোকে না। ও খালি প্রার্থনা করতে থাকে ওখানে যেন আর দাঙ্গা না হয়।
বাড়ি ফিরলে সত্য ওকে বলে, মা চোখের কোণ থেকে রক্ত পড়েছে আজ।
কিরণ দেখে সত্যর চোখ আরও ফুলে গেছে। পাতা প্রায় খুলতেই পারছে না। ওর হঠাৎ মনে হয়, দাঙ্গা আটকানো যাবে না, দেশভাগ আটকানো যাবে না, সত্যর চোখটাকে বাঁচানোও যাবে না। মনে হয় ওর মতো সাধারণ মানুষের দেশের ভবিষ্যতের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ তো নেইই, এমনকি নিজেদের ভবিষ্যতের ওপরেও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অন্যের কৃপাতেই একটা গোটা জীবন বেঁচে থাকতে হয় ওদের। এ যে কী কষ্টের, কী অপমানের, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না ।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
ক্রমশ..
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ৭
❤ Support Us








