Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • জুন ২, ২০২৪

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ২৯

রোদ্দুরটা এখন একটু চড়া, মাথায়, চোখের পাতায় পড়ছে, পড়ুক, সে যে পরীক্ষা নিচ্ছে হেমশশীর, জানতে চাইছে পথের সাধনায় কতখানি জীবনসর্বস্ব পণ করেছেন...তারপর

সুধীরকুমার শর্মা
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ২৯

অলঙ্করণ: দেব সরকার

।। কাদাকান্ড ।। 

অনন্তাভিসার

 
দুপুরে খেতে যেতে হয় ঘরে। হকার্স কর্ণারে অর্ধেক দোকানের ঝাঁপ পড়ে গেছে।
 
সাধন গোছগাছ করছিল। পোশাক আশাকের দোকান, বাতাসে আসা ধুলো পড়ে বিস্তর। ফুলঝাড়ুতে ঝাড়তে কম সময় লাগে না। প্যাকেট কি বাক্স ময়লা হলে খদ্দের উলটো মুখো হবে।
 
দেরি রোজই হয়। সে সময়সীমা পেরিয়ে গেলে রমার ধমকধামক মুখে নির্ঘাৎ পতন। ভয় আছে সাধনের। মেয়েমানুষের বুদ্ধি। শুনতে চায় না, বুঝতে চায় না। সাধন জোরে জোরে র‌্যাকে ঝাড়ু মারলো, তারপরেই হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো। বাবারে ! নাক ডলে সাধন।
 
তখনই দুজন, সাধন চেনে না, সাইকেল নিয়ে এসেছে সামনে, হাঁপাচ্ছে ওরা। একজন বলে — এই তো চন্দ্র রেডিমেড। আচ্ছা আপনিই কি সাধনদা ?
 
— হ্যাঁ, কেন ?
 
— আপনার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিগগিরি চলুন।
 
— মা নাই ? — সাধন আচমকা খুড়িমা বলতে ভুলে গেল। শরীর হারিয়ে যাচ্ছে, বসে পড়েছে পাটাতনের উপর।
অচেনা ছেলে দুটি কালক্ষয় না করে উঠে যায় দোকানে, কোণে রাখা কুঁজোর জল এনে সাধনের মুখে ছিটায়, একগেলাস জল খাওয়ায়। সাধন সহজ হলে বললো — নিন, দাদা, উঠুন, দেরি করবেন না।
 
— বাড়িতে…।
 
— আমরা বাড়িতে লোক পাঠিয়েছি। বোধহয়, বৌদিকে নিয়ে স্টেশনে এসে গেছে এতক্ষণে।
 
— স্টেশনে কেন ?
 
— আমরা ওনাকে রাণাঘাট হাসপাতালে পাঠিয়েছি। এখনই লালগোলা আসবে। আমাদের লোক স্টেশনে আছে, স্টেশনমাস্টারকে বলে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দেবে।
 

হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে জিজ্ঞাসা উঁকিঝুঁকি মারে। কে এই রোগিনীটি। ভর্তি হবার সময় মনে হয়েছিল ভিখারী বৈরাগী হবে বুঝি। পরে অবাক ঘটনা, তার জন্য এমপি নিতাই সরকার এসে ঘুরে যান, এমএলএ সতীন সেন আসেন, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান খোঁজ নেন, পার্টির নেতারা আছেনই, সুপারকে রোজ একবার করে ওয়ার্ডে আসতে হয় ! কে ইনি ?

 
হকার্সের কয়েকজন, এখনও যারা ছিল, ছুটে এসেছে। দোকান ওরাই বন্ধ করে তালা দিল। ওদের মধ্যেও জনা তিন সাধনের সঙ্গে যাবে ঠিক করলো।
 
হেমশশী ফিমেল মেডিকেল ওয়ার্ডে তিনদিন, নাকে অকসিজেনের নল, বাঁহাতে — নিচে কাঠের সরু তক্তায় ব্যান্ডেজ জড়ানো — স্যালাইনের সূঁচ শিরায় গেঁথে আছে, পায়ের দিকে হাতের নিচ-আড়ায় দড়ি বাঁধা বোতল — ক্যাথিটারের নলবহা বর্জ্য টুপ টুপ করে সঞ্চয় করছে, ভরে এলে ওয়ার্ডের সুইপার বিড়াল পায়ে আবির্ভূত হবে, তরলটি বালতিতে ঢেলে নিয়ে যাবে। হেমশশী কিছুই দেখছেন না, শুনছেন না। শ্বেতবর্ণা দেবদূতী সেজে অল্পবয়সী নার্সটি স্যালাইনের রবার নলে সিরিঞ্জ ফুটিয়ে ওষুধ ঢেলে দিল, গায়ে জড়ানো মেরুন কম্বলটি টেনে বিন্যস্ত করলো। অচেতন হেমশশী ভাবতে পারলেন না তার সুনয়নীই কি এ রূপে ফিরে এসেছে ! নিয়ম মেনে ওয়ার্ডের ডাক্তারবাবুটি এসে দাঁড়ান, পারদযন্ত্রে রক্তের চাপ মাপেন, আঙুল টিপে নাড়ির গতি দেখেন, তারপর কেন যেন মাথা নাড়়েন।একবারের জন্যও যদি জ্ঞান ফিরতো রোগিনীকে জিগ্যেস করতেন— কি হয়েছিলো তাঁর, পড়ে গেছিলেন রাস্তায় কেন। হয়তো তখন হেমশশী উত্তর দিতেন, স্টেশনে নেমে ঠিকই ছিলেন। কি যে হলো ! উপর ব্রিজের না উঠে পূর্ব দিকের রাস্তা ধরলেন। তাকে যে পশ্চিমে যেতে হবে সেটা বিভ্রম হলো। দেখলেন তাঁকে— যিনি হেমশশীকে পথের সাধনায় ডাক দিয়েছেন। কতদিন পর শুনলেন তাঁর বাণী, হেম, আস্যো। চোখ বুজেছিলেন তখন হেমশশী, কামনায়, আশ্লেষে। তার মুদে নুইয়ে পড়া চোখের উপর তাঁর শীতল করস্পর্শ ছিলো। কী আমোদ, কী পরম আনন্দ ! হেমশশী আর চোখ খোলেননি। খুললে দেখতেন, আলো ঝলমল রাজপুরীর অন্দরমহলের পালঙ্কে তিনি শুইয়ে আছেন। কত দাসদাসী তার সেবায় ব্যস্ত।
 
হাসপাতালের কর্মীদের মধ্যে জিজ্ঞাসা উঁকিঝুঁকি মারে। কে এই রোগিনীটি। ভর্তি হবার সময় মনে হয়েছিল ভিখারী বৈরাগী হবে বুঝি। পরে অবাক ঘটনা, তার জন্য এমপি নিতাই সরকার এসে ঘুরে যান, এমএলএ সতীন সেন আসেন, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান খোঁজ নেন, পার্টির নেতারা আছেনই, সুপারকে রোজ একবার করে ওয়ার্ডে আসতে হয় ! কে ইনি ?
 
বারান্দায় বসে থাকা এক সুইপার তার সহকর্মীকে বলেছিল — সমঝানু, উনহোনে আজাদীকী জঙ্গ কিয়ে। বোন্দে মাতরং বোলে। জয় হিন্দ বোলে। ইনকিলাব বোলে । উনহোনে আংরেজ সাহাবকো গোলি মারে। — কপালে পেন্নাম ঠোকে সে।
 
সাধনের দোকান বন্ধই এ কদিন। ঘুরে ফিরে হাসপাতালেই থাকে সে ও রমা। বিকেল চারটের আগে কলোনি থেকে কেউ না কেউ আসে। হকার্স ক্যাম্পের পি এল তকমার একজন, কখনো দুজন আসবেই। তারা ভাবে— হেমশশী তাদেরই মতো, আবার নয়ও। মৃত্যু ছাড়া তাদের কেউ নেই। হেমশশীও পি এল-ই ছিলেন, কিন্তু নিজের জন্য পেয়ে গেলেন জগতসংসার। হেমশশী দেবী। ক্ষণজন্মা।
 
সাধন রমা ভিজিটিং আওয়ারসের দুটি ঘন্টা বেডের ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। রমার অশ্রু নীরবে গড়িয়ে যায়। একসময় ছেলেকে বলে — বাবা, ঠাকুমার পায়ে নাড়া দিয়া ডাক, তর কথা মা না শুইন্যা পারে না।
 
গোপাল মায়ের কথা মানে — ঠাকুমা, ও ঠাকুমা গো !
 
কখনো সাধনকে বলে রমা — দেখো, মায়ের মুখখান কী চকচক করে ! খারাব হইলে এমুন উজল দেখায় ? মায় ভালো হইয়া যাইবো, কও । এইবার ঘরে ফিরলে কুলুপ আইট্যা দিমু। মাধুকরীর মুখে ভষ্ম । লোকে কইবো, বউ মন্দ। কউক। বইয়া গেল।
 
সাধন শুধু চেয়ে থাকে, চোখে জল নেই, কেবল বুকটা গুমরায় — ভগবান, আমার চক্ষুতি পানি দেও নাই, চাঁড়াল বলি !
চতুর্থ রজনী অতিক্রান্ত হল। পাঁজি লিখেছে— সেদিন সূর্যোদয় ভোর ৫ ঘটিকা ১৬ সেকেন্ড গতে।
 
খোলা জানালা দিয়ে প্রথম রশ্মি এসে পড়লো হেমশশীর উজ্জ্বল মুখে।
 

লরিটা ছোটোই। ফুলের মালায়, তোড়ায় তোড়ায় তার কালিমা ঢাকা পড়ে গেছে। একটু পাশে নিচে ঘাসে সবুজের উপরে কাঠের শবখাট। হেমশশী শুয়ে আছেন ফুলসজ্জায়, মুখের রেখায় কষ্টের আঁচড় নেই, যেন গভীর আনন্দ, যেন প্রথম মিলন শেষে তৃপ্তির ঘুম। বুকের উপরটা ইউসিআরসি এর পতাকায় যেন রঙিন ঢাকাই শাড়ি। সেজেছেন ফুলের গয়নায়

 
থানা থেকে জরুরি খবর। সাধন রমা গোপালকে পড়শীর ঘরে রেখে ছুট দিয়েছে। কলোনি থেকেও একটা পুরো দলই।
এখন চত্বরে সাধন কেবল বসে আছে, কেন যেন মনে হচ্ছে রমা নেই, গোপাল নেই, সে একা। মুক্তোকান্দির হারানো দৃশ্যগুলো ফিরে ফিরে আসছে এখন — নিমগাছ, পাকের ঘর, ইসমাইলের কুঠি, পুকুর, জয়েনউদ্দিনের দালান, চন্দ্রমোহন, নীলুদাদা বউদিদি। খুড়িমা বসে আছেন বার বারান্দায়, কাঠ চেলা করছে সাধন। খুড়িমা বলছেন — আর চেরতি হবে না, সাধন। হাতিতে ব্যথা হবেনে। রাখি দে ইবারে। — এখানে কলোনির মনোরঞ্জন বসে আছে ওর পাশে, সে-ও নির্বাক। এখন কি করণীয়, এবং সেটা কীভাবে, ভাবনাটা চকিতে সাধনকে নাড়া দিয়েই কোথায় মিলিয়ে গেল। রমা ভাবছে শ্বাশুড়ির মরদেহ বাড়ি নিয়ে যাবে। ভাবছে বটে, সবটা তার হাতে নেই।
 
এদিকে কলোনির মানুষেরা মাঠের মাঝে গোল হয়ে বসে আলোচনা করছে। চরগাঙপুর গ্রামটাই যেন হেমশশীর শেষযাত্রায় সঙ্গী হবে। ভাবছে ওরা, একদা বহতা নদী আনঙ্গিনীর লুপ্তরেখা আনঙি বিলের ধারে একসময় একটা শ্মশানঘাট ছিল। তার ভগ্ন চিহ্নটি এখনও দেখা যায়। ওদের ইচ্ছা সেখানেই মা-ঠাকরুনের শেষকৃত্য হোক।
 
সাধনের মনে সংশয় দোলা খায়, ট্রেনে খুড়িমার দেহ নিয়ে যেতে দেবে কি রেলবাবুরা ! যাত্রীরাই বা কী বলবে ! ভেন্ডার কামরায় অবশ্য ওঠা যায়, তবে ছানা, সবজি, মাছের ব্যাপারিরা যদি উঠতে না দেয় ! কলোনির মাতবর গোছের ছেলেগুলোর সঙ্গে ঝামেলাই বেঁধে গেল। তখন ! মনোরঞ্জন বলেছে, আরও লোক আসছে পরের ট্রেনে। মরদেহ পেতে আরও ঘন্টাদুয়েক অপেক্ষা । ওরা এলে বাঁশ দড়ি এনে মাচা বানাবে।
 
মনোরঞ্জন বললো — সাধন, ভাই আমার, কথা শুন। তরা দুইজনে একটু চা বিস্কুট খাইয়া আবি। চ, সামনেই দুকান। সকালে না-মুখে বাইরাইছত। ল।
 
সাধন নড়ে না, রমা ওঠে না ।
 
মনোরঞ্জন হাল না ছেড়ে আর একটু পীড়াপীড়ি করতে যাচ্ছিল, তখনই দুটি ছেলে এদিকে আসছে, বয়স সতেরো আঠারোর বেশি হয়তো হবে না। কাছে এলে একজন বললো — আচ্ছা, আপনাদের মধ্যে সাধনদা, রমা বউদি কেউ আছেন ?
 
— আছি, ক্যান? আপনেরা কারা !
 
গালে সুতলি দাড়ি ছেলেটি বলে — আমার নাম সনৎ আর ও মিহির, বউদি। আনিসুরদা আমাদের পাঠালেন। চিন্তা করবেন না সব ব্যবস্থা আমরাই করছি। আনিসুরদা এলেন বলে।
 
লরিটা ছোটোই। ফুলের মালায়, তোড়ায় তোড়ায় তার কালিমা ঢাকা পড়ে গেছে। একটু পাশে নিচে ঘাসে সবুজের উপরে কাঠের শবখাট। হেমশশী শুয়ে আছেন ফুলসজ্জায়, মুখের রেখায় কষ্টের আঁচড় নেই, যেন গভীর আনন্দ, যেন প্রথম মিলন শেষে তৃপ্তির ঘুম। বুকের উপরটা ইউসিআরসি এর পতাকায় যেন রঙিন ঢাকাই শাড়ি। সেজেছেন ফুলের গয়নায়।
 
পুস্পস্তবক নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন নিতাই সরকার, সতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মহিলা সমিতির নেত্রী সবিতা সরকার, মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ফণীভূষণ মালাকার, আরও কারা কারা। কীভাবে রানাঘাট শহরটার টুকরোই যেন ভেঙে পড়েছে হাসপাতাল অঙ্গনে। কোথা থেকে খবর পেয়ে সপরিবারে এসেছেন গায়ক পন্ডিত শশধর চট্টোপাধ্যায়। বিলাপ করছিলেন তিনি — কেন আমি সেদিনজোর করে ঠাকরুন দিদিকে ওই দুপুরে আমার ঘরে রেখে দিলাম না।
 
আনিসুর গাড়ির মুখে দাঁড়িয়েছিল, বললো এবারে— এই, তোরা এবার খাটটা তোল। সাধনদা, তুমিই গাড়িতে উঠে বসো। রমা, তুই ড্রাইভারের কেবিনে বস গে। নিতাইদা, আপনার যাওয়ার দরকার নেই, বউদি যাচ্ছেন। সতীনদা, বউদি আপনারা সকলকে নিয়ে ট্রেনে আসুন।
 
— ওদিকে চরগাঙপুরে কী ঠিক করেছ, আনিসুর ? — নিতাই প্রশ্ন করেন।
 
উত্তর দিলেন সতীন্দ্রনাথ — ওখানে অনিমেষ আর কুঞ্জ আছে। শুনেছি অরুন্ধতী রায়চৌধুরিও নাকি আসবেন শ্রদ্ধা জানাতে।
সনৎ ও মিহির একটা কাপড় বেঁধে দিল লরির মাথায় লেখা — উদ্বাস্তু সমাজের মাতৃস্বরূপা হেমশশী আচার্য অমর রহে।
 
লরির চাকাটা আস্তে নড়লো, গর্জে উঠলো প্রান্তর — সেলাম। তোমাকে সেলাম।
 
হাসপাতালের গেটের সাইনবোর্ডটা পিছলে যাচ্ছে। পিছনে চলে যাচ্ছে।
 

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

ক্রমশ…
 
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ২৮

মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ২৮


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!