- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ২৮, ২০২৪
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৩৬
মালা গলায় হেমশশী ঠাকুরানী দুচোখ মেলে চেয়ে দেখতে থাকেন ওদের, সর্বংসহা মা আছেন প্রহরায়...তারপর
।। ফলকান্ড ।।
সারারাত দ্বৈরথ
ক্লান্তি ছিল শরীর জুড়ে। রসনা জুড়ানো আহার্যে উদর গলিত ছিল। সাধন রমা বিপদাগম নিয়ে অভয় দিয়ে রেখেছে, তবু…। ঘুম কই ! একদিন, ক্যাম্পে, অসহায় এ দুটি প্রাণীকে দেখেছিল, বয়স তখন ওদের কতই বা। তার নিজেরও বা কী বয়স তখন। সেদিন মানবাত্মার অসম্মান দেখেছিল। মানুষ গবাদি পশুর মতো, কীট কেন্নোর মতো শুধু টিঁকে থাকতে চাইছে, লাঞ্ছনায় চাপাপড়া কুন্ডলী পাকানো ভীত প্রাণশক্তি। কত লড়াই, মিছিল, শপথ, কলকাতা দাপানো চরণোক্ষেপ, সমবেত কন্ঠরোল, সরকারের কেদারার কাষ্ঠপদ থরথর কেঁপে উঠেছিল। তারপর ওরা এই চরগাঙপুর গড়ে তুলেছে। এ কলোনীর মতো আরও কত পুর, নগর, পল্লী এ বাংলার সর্বত্র। প্রতিজ্ঞামুঠো শক্ত করে মানুষের মর্যাদায় পা ফেলেছে ওরা। আজ এখানে সাধন রমার সুখীসংসার দেখতে পেয়ে তৃপ্তি লাগছে আনিসুরের। এজন্য নিতাইদার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। পরম প্রাপ্তি তার। কতকিছু শিখেছে ওদের জীবন থেকে, মাটিভেজা ভালোবাসা থেকে। এও তো একটা বিপ্লব। বিপ্লব বস্তুটা একক নিরেট ঘটনা নয়, সে যে চলিষ্ণু প্রক্রিয়া। একটার পর একটা ঘটে যেতে থাকে, কোনটা ঠিক পথে, কোনটা বেভুল রাস্তায়, কিন্তু প্রত্যেকটি বদলে দিয়ে যায় চেনা পৃথিবীটাকে, তার দেশ,কাল,ঘট,পট সব।
সাধনেরও ঘুমটা আর আসে না। গাঢ় নিদ্রা আচম্বিতে ভেঙে গেলে উত্তেজনা আসে মগজে। আরও একটা কারণ— এতদিন পর বিছানায় চেনা সঙ্গিনীর বদলে অন্যজন। আনিসুর ঘুমে আছে, ভাবলো সাধন। এখনও তেমনভাবে কথা হয়নি তার সঙ্গে। আদৌ হবে কি ! কাক ডাকার আগে রমা ডেকে দেবে, সাধন ফার্স্ট ট্রেনে উঠিয়ে দেবে আনিসুরকে সবার অলক্ষ্যে। আপে না ডাউনে, জেনে নেওয়া দরকার। ওই ভোরে সবজির ফোড়েরা যায়, সাধারণ যাত্রীর ভিড় তেমন থাকে না। ভিড় হলে ভালো হয়। সাধনের মনে হচ্ছে যে আনিসুরের ধরা পড়ার ভয় আছে। পুলিশ খুঁজছে কি তাকে হয়রান হয়ে! কিংবা একদা তার নিজেরই দল, এখন শত্রুদলের, মিত্রেরা! বা তাদের বরাত পাওয়া চেলাচামুন্ডারা ! দল বা দলগুলো এখন কাদের ! নেতারা চেলাদের চালায় ! চেলারা নেতাদের ! ঘড়ির দোলন। ডানদিকে যায় বাঁদিকে যায়, কচ কচ, তারপর ঢং ঢং, জানিয়ে দেয় সময় নামধারী সবচেয়ে দুষ্টু দানবটা এগিয়ে যাচ্ছে। খুশখুশানিতে হাতটা বোধহয় নড়ে গেছিল, তখনই শুনতে পেল, — ঘুমোওনি, সাধনদা ?
— তুমি ঘুমাও নাই ? ঘুম আসতেছে না, নাকি আমাগেরি ঠিক বিশ্বেস করতি পারতিছো না ?
— সত্যি বলবো ? এখন আমার চারদিকে অবিশ্বাসটাই বড়ো হয়ে উঠেছে। ঠিক অবিশ্বাস নয়, বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝামাঝি, সন্দেহ। শুধু ভয় লাগে, যে লোকটাকে দেখছি, যে আমার সঙ্গে মিষ্টিমুখে কথা বলছে, সে আমাকে ধরিয়ে দেবে না তো ? সাদা চোখে, সোজা, আর বোধহয় তাকাতে পারি না, আড়ে দেখি, চোখ কুঁচকে নজর করি। আমার নামে ওয়ারেন্ট আছে, সাধনদা।
— সিটা আমি পথমেই অনোমান করিছেলাম।
— কিন্তু তোমাদের কাছে এসে দেখলাম, ভয় কোথাও নেই। তোমাদের ঘরটা যেন বিশ্বাসের আশ্রয়।
আনিসুর চমকে উঠেছে। কার সঙ্গে কথা বলছে ! মহানগরীর জৌলস আর মিছিলের বিশালতায় মুহ্যমান হয়ে গেছিল, সেই যুবকটা ! কোন দর্শন গ্রন্থ থেকে সাধন এমন সুচারু তর্ক উপস্থাপিত করে ! এত সহজ, এত দৃঢ়, এত অবিতর্ক। আনিসুর উত্তর করতে চাইলো না। বুক কাঁপিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ঠেলে বাইরে রওনা দিয়েছিল, হাতে মুখ চেপে সেটাকে হত্যা করলো
— এমুনি হবার কথা, আনিচুরদাদা। একখান বটগাছ, তার শিকড়ে বেদি বানায়ে গপ্পোগুজুবের থান। লোকেরা ছায়ার তলে বসে, হাসে, বিড়িতামুক খায়। গাছখান ডাল পাতার পাখা ঘুরোয়ে তাগের শেতল করে। একদিন কাঠুরে আসি এক কান্ড করলো, গুড়াখান করাতে কাটি আগাখান রশি বান্ধে ঝুলোয়ে দেল। সকলে দেখে বটখান বাঁচি রইছে। সত্যিই তা হয়? কতি পারো? মানষির শরিলে রগে রগে টান বাঁধা। গাছেরও। গুড়াকাটা গাছির ডালি ডালি ওই রগের টান ছিঁড়ি গেছে। তাই এত অবিশ্বেস, এত সন্দিহ।
আনিসুর চমকে উঠেছে। কার সঙ্গে কথা বলছে ! মহানগরীর জৌলস আর মিছিলের বিশালতায় মুহ্যমান হয়ে গেছিল, সেই যুবকটা ! কোন দর্শন গ্রন্থ থেকে সাধন এমন সুচারু তর্ক উপস্থাপিত করে ! এত সহজ, এত দৃঢ়, এত অবিতর্ক। আনিসুর উত্তর করতে চাইলো না। বুক কাঁপিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ঠেলে বাইরে রওনা দিয়েছিল, হাতে মুখ চেপে সেটাকে হত্যা করলো। কথা বদলাতে হবে অন্য সুরে, বললো — তোমরা দুজনাই দেখছি দেশের ভাষাটি ভোলোনি। সবার সঙ্গেই এমন বলো তোমরা ?
— নিজিগের মধ্যি বলি। আর তুমি তো জানো, তোমার বুনির ত্যাজখান সব্বোদা তপ্ত থাকে। তার ঢাকেই ভাষা না হলি ত্যাজ মারা যায়। আমারি ব্যাবসার খাতিরি লোকের সাথি একটু পালটোয়ে পুলটোয়ে নিতি হচ্ছে। এরম তালিতুলি যে দিতি লাগে।
আনিসুর এবার সঙ্গ দিতে রাজি হলো না। সাধন ভাবলো, আনিসুরের ঘুম আসছে। সেও করতে উলটোলো।
—সাধনদা, ঘুমিয়ে পড়েছো ?
সাধন পাশ ফিরলো, অনুমান করে মানুষটা উঠে বসেছে। বাথরুমে যাবে হয়তো। রমা, মনে হয় বলে দেয়নি যে পিছনের দরজার খিলটা খুললেই বাথরুম আছে। হেমশশীর বয়সের কথা ভেবে এমন করা হয়েছিল। বালিশের তলা থেকে তিন ব্যাটারির লম্বা টর্চটা জ্বালে সাধন। ফোকাসের মুখে প্লাস্টিকের লাল ঘেরাটোপ, মশাল আগুনের আভা ছড়াচ্ছে যন্ত্রটা — চলো — বলে সাধন।
— না, না, কোথাও যাবো না। বাথরুমে গেছিলাম। আসলে ঘুমটা এলো না। তাই। ভাবলাম, যদি জেগে থাকো গপ্পে গপ্পে রাতের বাকিটুকু কাটিয়ে দিই। আবার কবে দেখা হবে, কে জানে !
— হেরিকেনখান ধরাই। চিমনিখান মুছি রাখিছে কিনা বলতি পারিনে। সলতিটারেও কাটে নাই বুধায়।
— আলো থাক। আঁধারেই কথা বলি, তাহলেই হবে।
তারপরও চুপ বসে থাকে ওরা, যেন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। বাইরে কতকগুলো কুকুর গর্জনে দৌড়ে গেল, প্রাণীগুলোর পায়ের শব্দ যেন শোনা যায়। রহস্য ঘন হয়ে আসে। অনেক কুকুর এবার একটানা চিৎকার করতে থাকে। সচকিত হয়ে ওঠে আনিসুর।
বুঝতে পেরেছে সাধন, হেসে উঠলো ছোট্ট, বললো — ভয় নাই তোমার, দাদা।ভেন্ন পাড়ার কুকুর ঢুকিছেল, ইলাকা দখল নেবে। ইদিকে পাড়ার কুত্তেগুলা দখল ছাড়বে কেন ? তাই লড়ালড়ি লাগিছে। আমাগেরি মতন। ভুটের লড়াই যে ওরা করতি পারে না। চেল্লোচ্ছে। তুমি শওরের লোক যে, গিরামপল্লীর নাড়ীনক্ষত্তর বোঝবে কেমনে ! বাদ দেও, যিটা হাতে ধরিছো, সিটা রাখি দেও। কচ্ছি, উটা চালাতি জানো তো? সত্যি কবা।
— সাধনদা, তোমাকে লুকোবো না। আমি এটা চালাতে জানি না। শুধু সঙ্গে রাখলে গায়ে তাপ থাকে। সাহস ফিরে আসে সঙ্গে সঙ্গে। পূলিশ বলেছে, আমি নাকি তিনটে খুন করেছি। বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, তাই না ?
— জানি নে। শিক্ষে নাই। মোছবার পারি। পার্টির নিতা হই নাই, পার্টির বই বানাম করি করি পড়লিও বুঝি নাই। নিতারা যা কয়েছেন, মাথা নেচূ করি মানি চললাম। জানতেম তারা ভুল করে নাই, করে না। তবে দাদা, ওই খ্যামতার ওৎস না কী কলে, সিটা যদি কিছু থাকে, তয় আছে মানষির গভ্যদেশে। মানষির চেয়্যা বোন্দোকটারে বড়ো করি তোলো যদি, একদিন দেখতি পাবা মানুষেরা আর কেউ নাই, শুধু নলখান হাতে রইছে। ঘুড়া টেপতেছো, পুড়া বারোদও বেরাচ্ছে না। তোমারে আমি চেনিছেলাম, ডাকাবুকা, দিলবালা। আজ দ্যাখলাম তুমি ভেতু হয়ি গেছো। তুমি না, তোমরা বেবাকে।
— যদি ফিলোসফি মানে দর্শনটা ঠিক থাকে, মেরুদন্ডও সোজা থাকে।
— কী কলা শব্দখান ? জানিনে। তবে, মনি হচ্ছে, ব্যাপারখান আমার ব্যাপারের মতো। কলকেতা থিকি মাল কিনি আনি। তুমার বুন থান কাটি পিস করে। নিজে সিয়োয়, অন্যেরে দিয়ে সিয়ায়। মুজোরি দেয়। সেই তৈয়েরি মালগোলেন বেচি। লাভ কল্লাম দুপয়সা, কলাম ব্যাপারখান ঠিকাছে, লুকসান হলি, কই, ঠিক নাই।
কথা আর না বাড়ানোই ভালো, ভাবে আনিসুর। সাধন অতি সাধারণ। হ্যাঁ, মানুষ হিসেবে পাকা সোনা। সাহসীও। এরকম মানুষকে দরকার, কর্মযজ্ঞে আশ্রয়দাতা। তাত্বিক তর্কাতর্কিতে জ্ঞান না থাকারই কথা। এরা নেতা হয় না, হোমের আগুন হয় না, এরা যজ্ঞের সমিধ। অবশ্যই সম্পদ, ব্যবহারযোগ্য, সারকুলেটিং ক্যাপিট্যাল।
— সাধনদা — আনিসুর ডেকে বসলো।
— হুঁ।
— ঘুম ভাঙালাম ?
— উ হুঁ, কও।
— দুজনেই উঠে বসেছে মুখোমুখি।
— দলটা ছেড়ে দিলে, তোমরা ?
— আমি দল ছাড়ি নাই । দল আমারে একটু একটু করি ছাড়িছে।
— তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী ছিল ?
— ছেল না। সত্য ছেল।
— শৃঙ্খলাভঙ্গ ?
— কতি পারো। নিতারা কাকেতুয়া পক্ষীর মতো এককথা বলতি লাগলেন।সিটা মান্য করি চলতি লাগবে। আমরা নিচির লোক , মান্য করাই ওচিত। তাই না? তাই বলি জিজ্ঞেসাও তুলা যাবে না! খারাপ লাগতেছিল, তাই কয়েকখান মোল্যহীন কথা জিগোয়েছিলাম। দেখলাম, আমারে আড় ঠেরতেছে , সন্দিহ করতেছে। সেই শুরু।
শোধনবাদ, না-শোধনবাদ তোমরা ছাড়া কেউ বোঝে না। এমুনি তার মারপেঁচি। ভোটে নেতাইদার জেমানত জব্দ করতি গেলে, পারলে না। কলে নেতাইদা শত্তুর দলের দালাল।তা তিনি উয়েগের সঙ্গি মিলিজুলি মন্তিরি হতি পারতেন, চিয়ারে বসি তোমাগেরে দুরমুষ করি দিতি পারতেন। তারা কী করলো ? তোমরা যাতি খ্যামতায় যাতি পারো, তার জন্যি ঝাঁপায়ে পড়লো
আনিসুর চুপ করে শুনে যায়।
— দল আমি বুঝিনে ভাই। চাঁড়াল মানোষ, গুঁয়ার লোক। নেতাইদা, বউদিদি, তোমারে ক্যাম্পের সময় ইখানে সতীনদা কোঞ্জবাবু অনিমেষ। সবায়েরে দেখি আপনাআপনি ঢুকি পড়িছেলাম। বলতে পারো, দল নেয়ি তুমার বুন বেশি ভাবিছে। একদিন দোখান ফরোম ধরায়ে দেল, কী লিখা, কী বেত্তান্ত বোঝলেম না। ওরা কলেন, সইসাবুদ করি দাও। দেলেম। খুড়েমশায়ের কাছে সই শিক্ষে। সিটা যে দেখিছে, সে ভয়ে আর ফিরি চাবে না। জানলেম, টোনাটুনি মিম্বর হয়ি গিছি।
— তোমার শিক্ষার দরকার নেই, সাধনদা। তুমি জীবন থেকে শিখেছো। সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা সেখানেই।
— জানিনে। তবে একটু আধটু নেতাইদার কাছ থিকি শিখিছি, মানষির মাঝি মিশি থাকার দল কী বুঝিছি। আমার খুয়াব দেখার দল। একদিন আমার দেশের মানুষে হাসতি হাসতি বাঁচবে। সেই দল তোমরা ভাঙ্গি দেলে। বোঝলাম খুয়াব ভোল ছেল। নেতাইদার মতো মানুষেরে যা কওয়া যায় না, সেই কুকথা কলে। ছিঃ। শুনিছেলাম, আমার দল সভ্য হতি শিখায়। নেতাইদারে যা কিছু কয়েছো তা কি সভ্যতা।
এবার ভয় লাগছে। এ কোন পলিমিকসে আনিসুরকে নিয়ে যাচ্ছে আনপড় একদা সহযাত্রী! বললো আনিসুর — নিতাইদা আনডিভাইডেড পার্টিতে অনেক কাজ করেছেন, সত্যি কথাই, কিন্তু অমন কমরেড শেষে রিভিশনিস্ট মানে শোধনবাদী হয়ে গেলেন !
— শোধনবাদ, না-শোধনবাদ তোমরা ছাড়া কেউ বোঝে না। এমুনি তার মারপেঁচি। ভোটে নেতাইদার জেমানত জব্দ করতি গেলে, পারলে না। কলে নেতাইদা শত্তুর দলের দালাল।তা তিনি উয়েগের সঙ্গি মিলিজুলি মন্তিরি হতি পারতেন, চিয়ারে বসি তোমাগেরে দুরমুষ করি দিতি পারতেন। তারা কী করলো ? তোমরা যাতি খ্যামতায় যাতি পারো, তার জন্যি ঝাঁপায়ে পড়লো। কে তালি ঠিক? আমি বুঝিনে, আনিছুরদাদা, কিন্তু আমার মনে হয় সিদিন সতীনদার দল যে গরমেন্ট বানায়েছে, সিটা নেতাইদার দলের জন্যিই।
— এটা হয়তো ওদের কৌশলগত অবস্থান হতে পারে।
— কৌশল অথ-থে চালাকিও হতি পারে তো ? অত সুযুগ ছাড়ি কী ধুত্তেমি করলো যে তোমাগের নিকেষ করবার বুদ্ধি না খাটোয়ে তোমাগেরে বাড়াবার তাল করিছে !
আনিসুর নিশপিশ করে।
— এখন তোমরা আবার দল ভাঙ্গেছো। সতীনদারে কচ্ছো নয়া-শোধনবাদী। ভাঙার খেলায় মাতিছো তো ! আরও ভাঙবে, শত টুকরে হয়ি যাবে। যোগের সাধনা নাই, টুকরে হওয়ার চচ্চা। অবেশ্বাস, সন্দিহ। আজ তোমারে তাড়া করতেছে রায়চৌধুরি আর সতীনদার দলের গুন্ডেরা, কাল তোমার দলের চামুন্ডেরা তোমায় মারতি আসবে। দলটা যেমুন শন্যি হয়ে যাবে, তোমরাও একা হতি হতি শেষ হয়ি যাবে।
— কী বলছো, তুমি ? — কন্ঠে কি লুকোনো উষ্মা !
— তোমার মনি হচ্ছে তোমার কমরেড অনিমেষ ইচ্ছি করি ঘর থেকি সরি গিছে, যাতে তুমি ধরা পড়ি যাও।
— কী করে বুঝলে তুমি?
— ইটাই হওয়ার কথা।
— সাধনদা !
উত্তেজনায় আনিসুর যে উঠে বসেছে সাধন টের পেল —রাগ করতিছো, দাদা ? ইটাও হবারই কথা। পোশনো জাগলি, কী তুললি রাগ হয়। দলের পুরেন শিক্ষে। ঘুমাও, দাদা। ফাস টেরেন ভোর চারটেয়। একটুখান চোখ বোজো। — টেনে আনিসুরকে শুইয়ে দিল সাধন, গায়ে ছড়িয়ে দিলো চাদর।
তবু আনিসুরের চোখের পাতা নামলো না। সাধন-রমা জীবনে মোটামুটি স্বচ্ছল। বস্তুর তো পরিবর্তন ঘটে। সেদিনের লড়াকু মন আজ নাও থাকতে পারে। এরা তাকে এ রাত্রে ধরিয়ে দেবে নাতো ! আশ্চর্য, কী প্রবল সন্দেহ আনিসুরকে খাচ্ছে এখন। সাধন ঘুমিয়ে পড়লে সে নিজেই অন্ধকারে বেরিয়ে যেতে পারতো। কোমরে লুকোনো বাসুদেব খনিটা ভয় তাড়াবে, বল জোগাবে। সেটি বের করে হাতে নেয় আনিসুর, অন্ধকারে নির্ঘুম জ্বলন্ত চোখ জাগিয়ে রাখে।
খুট আওয়াজেই সচকিত হয়ে ওঠে আনিসুর। অস্ত্র হাতে তৈরি। সাধন উঠে দরজা খোলে। রমা। হাতে দুটো থানের গাঁটরি, ছোটো টিফিন কৌটো, রাত জেগে খাবার তৈরি করেছে, বললো — আনিচুরদাদা, পথে খাইয়া লইবা। বইন আর কী দিতি পারে। দুইদিন থাকতা, পোছন্দের পাক খাওয়াইতাম। লও, তৈয়ারি হইতে শুরু করো।
— গাঁটরি গুলা আনলা ক্যান ?
— কী বুদ্ধি ! শুনো এই লও চাবি। দাদারে গাড়িতে তুইল্যা গাঁটরি লইয়া সুজা দুকান যাইবা। পথে কারো লগে কথা হইলে কইবা, ফাস টিরনে মাল আনছো।
আনিসুর একবার গোপালকে দেখতে চেয়েছিল।
রমা রাজি হলো না। গোপাল ছোটো। কাল ওর মুখ থেকে খবর জানাজানি হয়ে যাবে।
আনিসুর ভাবলো ভাগনেকে ‘কী করে সাচ্চা মানুষ হতে হয় ‘ বইটা উপহার দিতে পারলে ভালো হতো। এমন কপাল যে হাতে নেই। তারপরই ভাবলো, দরকার নেই ওই বইটার, তার বোনপো জীবনে সাচ্চা হওয়ার শিক্ষা জ্যান্ত বাবামায়ের কাছ থেকেই পেয়ে যাবে।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৩৫
❤ Support Us







