- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ৬, ২০২৪
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪৬
।। শুকনাকান্ড ।।
ছিড়া পাটের সুতেলি
আগামীকাল সতেরো দিন ।
মুনলজে ব্যস্ততা শান্ত হয়েছে। সমস্ত শোকভার উথলদশা শেষে থিতোলো।
চন্দ্রমৌলি ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিল। ভাবেনি এখানে পরিস্থিতিটা এমন হয়ে যাবে যে দশদিনের ছুটি পোনেরো দিন পার। প্রথমদিনটা ম্যানেজ ছিল। ছুটি অবশ্য যথেষ্ট জমা আছে, অথরিটির কিছু বলার নেই। তবে অফিসে যে তার হাই লেভেল পোষ্ট ,তাই…।
আরও কয়েকটা দিন থেকে যেতে পারলে কি ভালো হয় ! কি থেকে যাওয়াটা উচিত ! দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কিনা ও হিসেব করতে পারছে না।
লোকজনের মধ্যে কানাকানি হতে পারে, বিশেষ করে আত্মীয়স্বজনের। ওদের স্বভাবটাই এমন। কোথাও কিছু নেই, অথচ ঠিক খুঁত খুঁজে বের করে নেবে। ত্রুটিবিলাসী !
আনন্দের কথা, আত্মীয়ের সংখ্যা নেই- ই প্রায়।
কতযুগ পর মালদা থেকে মামারা এসেছিল। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, কবে, চন্দ্রমৌলি জানেই না। ওর বর, ওর ছেলেটাও এসেছিল। মামা মামি খুব কান্নাকাটি করছিল। ডিসগাসটিং ! গেঁয়ো ডিজাইনড ! পশ সোসাইটির কাছে রীতিমত রিডিকুলাস, অভব্য, ওরা বোঝেই না।
অনেকদিন পর একটা দৃশ্য দেখে চন্দ্রমৌলি বিস্মিত— মা ‘দাদা’ বলে ডেকে হরীশচন্দ্রের বুকে মাথা রেখে দমকে দমকে কাঁদছিল, আর মামি মায়ের পিঠে হাত বোলাচ্ছিল — ঠাকুজ্জি, আর কায়ন্দো না, শান্ত হও — বারবার বলছি।
মামার পরিবার তিনদিন আগে ফিরে গেছে মালদায়। বোন ভগ্নীপতির সঙ্গে ঠিক আলাপ হল না। যাওয়ার আগে মা সবসময় ওদের কাছে কাছে রেখেছে। হঠাৎ মায়ের আচরণ বদলে গেল ! চন্দ্রমৌলির সংশয় জাগে, মা ইচ্ছে করে ওরকম করছে ! টারগেট কি ছেলে ? না পুত্রবধূ অঞ্জনা ?
মালদার বাড়ির কথা ভাসাভাসা মনে পড়ছিল চন্দ্রমৌলির। মামাবাড়িটা নিকটেই তো ছিল। তখন একছুটে ওবাড়ি। ওখানে দাদু দিদিমা। ওদের মৃত্যুর আগেই মামারা এসে উঠেছিল। তারপর দাদু দিদিমার দেহান্ত হল। চন্দ্রমৌলি আর যায়নি। ওর যাওয়াটাও নিষেধ হয়েছিল, যেন ছায়া মাড়ানোও পাপ। যাকগে, চন্দ্রমৌলির ভাবনাটিকে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করলো। মায়ের সঙ্গে একটু নিবিড় হওয়া দরকার। অনেকটা দূর তৈরি হয়ে গেছে। অনেক কারণ ছিল, এখনও আছে। তবু আরেকটু কাছাকাছি হওয়াটা কি দুরূহ ! মা আর কতদিন ? বয়স হচ্ছে। স্পষ্ট বোঝা না গেলেও খুঁটিয়ে দেখলে চোখে পড়বে সুঠাম শরীরটা ভেঙেছে। একদা অপরূপ দেহে ভাটার কাদা ভেসে উঠছে।একটু যেন কষ্ট হল।
আরও কয়েকটা দিন কি থাকবে ? শ্রীরামপুরে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করা যায়। নৈহাটি ব্যান্ডেল হয়ে কানেকটিভ ট্রেন পেলে একঘন্টার মতো লাগে। বারাকপুর টিটাগড় থেকে নৌকাফেরিতেও যাওয়া যায়। সময় একই লাগে প্রায় । তবে বারবার ট্রেন বদলানোর ভজকট নেই। জলে অনেকে ভয় পায়, যেতে চায় না। সে ভয় তার নেই। দুন স্কুলে সুইমিং পুলে তার দাপট ছিল, মেডেল আছে। আর কয়েকটা দিন কেটে গেলে স্বাভাবিক হয়ে যাবে সব, তখন…।
আসলে সমস্যাটা অঞ্জনাকে নিয়ে। সত্যি বলতে ওকে নিয়েও নয়। কারণ অঞ্জনা সমস্যা নয়, ওর সবটাই সরাসরি। সমস্যাটা তাহলে চন্দ্রমৌলির নিজের। সেই নদীর উপমাটাই মনে পড়লো, পাশাপাশি দুটো নৌকো যাচ্ছে, ওর এক পা একটাতে অন্যটা দ্বিতীয় নৌকায়। একদিকে অঞ্জনা অন্যদিকে মা।
মায়ের সঙ্গে অঞ্জনার বনিবনা হল না । হবেও না । দুজনেই সম দূরত্বের ভিন্ন মেরুতে। আঁটখুঁটি বাঁধন। সে কী করবে ! সে স্বামী, স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব আছে। সব স্বামীরই থাকে, না থাকাটাই অন্যায়।
মায়ের সঙ্গে এবারের বিরোধ টাটকা। চরগাঙপুরে সাধনদের পরিবারকে আমন্ত্রণ করতে স্নেহলতা প্রায় আদেশই দিয়েছিল — তোরা দুইজনে এট্টা রেস্কা ভাড়া নেয়ি যা। গাড়ি নেসনে। গাড়িতি উয়েগের অসম্মেন হতি পারে।
— ওরা কে ? আত্মীয়টাত্মীয় হয় ? — চন্দ্রমৌলি বলেছিল ।
— আত্মেয়র চেয়াও বেশি বাবা — এটুকুই, স্নেহলতা বেশি কথা বলতে ভালোবাসে না ।
অঞ্জনা বেঁকে বসেছিল। এরকম অগরুবগরু রিলেটিভ, যাকে চন্দ্রমৌলি দেখেনি, চেনে না, জানে না, নাম শোনেনি জীবনে, কলোনির বাসিন্দা, ছোটলোক গোছেরই হবে — তাদের কাছে অঞ্জনা কেন যাবে ? যাওয়ার হলে চন্দ্রমৌলি যাক। মায়ের হুকুম ! তাকে তো মানতেই হবে।
অতএব ছেলেকেই যেতে হয়েছিল, রিক্সা নেয়নি, বাবার গাড়িটা বের করেছিল।
চরগাঙপুরে প্রবেশ করে মজাই লাগছিল। কলোনী শ্রীরামপুরেও আছে। উপান্তে। একটেরে। এ যে শহরের বুকের মধ্যে। আস্ত রামায়ণ মহাভারতের আমলের গ্রাম। সাধনের বাড়ি খোঁজ করে করে এগোতে হচ্ছিল। মডার্ণ ইন্ডিয়ার বাইরের দেশ। ছেলেপুলেরা তো বটেই, বয়স্করাও কেমন যেন ভিখিরির চোখে গাড়িটাকে দেখছিল, পিছনে বাচ্চারা ছুটছিল। কী খারাপ লাগছিল তখন ! অবশেষে বলে দেওয়া চিহ্ন বড়ো তেঁতুলগাছটা চন্দ্রমৌলি দেখতে পায়। ঘরের সামনে এসে কাউকেই দেখে না, কেবল ভিতর থেকে সেলাই কলের ঘড়ঘড়ানি শোনে। গলা চড়াতেই হল — সাধনবাবু, বাড়ি আছেন নাকি ?
রমাই বেরিয়ে আসে। গুরুদশার পোষাক ঢাকা অচেনা যুবকটিকে দেখে অনুমান করে, বলে — ভিতরে আসেন।
— না, অনেক কাজ আছে তো। — চন্দ্রমৌলি রমাকে ছাপানো সুদৃশ্য কার্ডটি দিয়েছিল, এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হোঁচট খেয়ে খেয়ে মুদ্রিত বক্তব্যের সবটা পড়তে পেরেছিল।
— যাবেন । মা সকলকে যেতে বলেছেন।
— ও । তারে কইবেন, আমাগো গুরদ্যাব আছে তো ! কুনু সেরাদ্ধ শান্তির বাড়িতে ভুজ খাওয়া আমাগো বারণ । গুরুর নিরদ্যাশ । শিষ্য তো । অমাইন্য করতে পারুম না যে। আপনার মায়ে য্যান রাগ করেন না। তিনি বুঝদার মানুষ। ঠিক বুঝবেন। যিনি গেছেন তার আত্মা য্যান শান্তি পায়। অপারগ তো, বুঝাইয়া কইয়েন মায়েরে।
— আচ্ছা।
সাধনরা যায়নি। এতে গঙ্গাজল অশুদ্ধও হয়নি। নিমন্ত্রিতেরা সকলেই কি আসে ! কী ক্ষতি হয় তাতে ? অথচ স্নেহলতা আহত হয়েছিল — বারবার কলাম গাড়ি নেয়ি যাসনে ।
অঞ্জনা ফুঁসে উঠেছিল — কী হয়েছে তাতে ? নিজের গাড়ি থাকতে রিক্সা ভাড়া কেন ? ওর সময়ের দাম নেই! কত কাজের চাপ !
স্নেহলতা জবাব দেয়নি, শুধু বয়সভারে আঁধারি কালো বড়ো দু চোখ শীতল চেয়েছিল পুত্রবধূর চোখে। সে কি ভাবছিল, এ তারই পাপ !
অনঙ্গপুর শোকাচ্ছন্ন । চেয়ারম্যান অকস্মাৎ প্রয়াত হয়েছেন। নিয়তির উপর মানুষের হাত নেই, কঠিন হয়েই আকাশ থেকে হাত বাড়ায়, টুপ করে তুলে নেয় নির্দিষ্টকে, শুন্য খাঁচাটাকে ফেলে দিয়ে যায় আপনজনের কান্না শুনতে । দুঃখ কয়েকদিনের । তারপর শোক নিথরতা । এই ভয়াল অদর্শণ জড়ের বিরুদ্ধে অসহায় অভিযোগ তুলে লাভ নেই । সে বধির । সে মূক । শরীর স্বাস্থ্য বশে ছিল । নিজে ডাক্তার । তার শাস্ত্রের সীমা জানেন, মানেন, দরকারে অ্যালোপ্যাথিক বিশেষজ্ঞকে দেখাতেই পারতেন !
চেম্বারে জনসংযোগ কর্মসূচি ছিল । ঠাসা ভিড় । রোগীদের সঙ্গে কথা, হাসি, মৃদু ধমক হচ্ছিল । হঠাৎ চেয়ারে এলিয়ে পড়লেন । পাশেই অ্যালোপ্যাথ ফার্মেসি । চেম্বার থেকে দৌড়ে এলেন ডাক্তার । সিভিয়ার সেরিব্রাল কোল্যাপস । এরপর গাড়ি উর্ধশ্বাসে পাশের শহরের হাসপাতাল । ইমার্জেন্সির ডাক্তারবাবুরা বলে দিলেন যে শেষবিচারের রায় হয়ে গেছে । না, পোষ্টমরটেম হয়নি, নেতারা সামলে দিয়েছেন ।
শহরে শোকাবহ আসতে আসতে কাটছে, খবরের কাগজের ভাষায় ছন্দে ফিরছে অনঙ্গপুর ।
পারিবারিক শ্রাদ্ধাদি ছদিন আগে চুকে গেছে। শহরে একাধিক শোকসভা হল। পার্টির দৈনিকে তো বটেই, অন্যদলের মুখপত্রেও ডাঃ আচার্যের ছবি, জীবন খতিয়ান কমবেশি স্থান পেয়েছে। খবর এসেছে মালদহে ডাঃ রবীন মজুমদারের উদ্যোগে হোমিও চিকিৎসকদের একটি বড়ো স্মরণসভা হয়।
স্বামীর এত ব্যাপ্তি প্রত্যক্ষ করেও স্নেহলতার ভাবান্তর নেই। ছেলে এসে ছাপা কাগজগুলো দেখাচ্ছিল তখন — মা, এগুলো ল্যামিনেট করে রেখে দেব। বাবা যে এতখানি রিনাউনড ছিলেন আমি তো ভাবতেই পারিনি কোনওদিন। তুমি তো সবটা জানো, তাই না ?
শান্ত স্নেহলতা মাথা নাড়লো সায়ে, কথা বললো না।
— চন্দ্র, শুনছো ? — অঞ্জনা স্বামীকে নামধরে ডাকে। এই, ওগো, হ্যাঁগোজাতীয় পছন্দ করে না।
চন্দ্রমৌলি ছাদে বসেছিল, মনটা উদাস — বলো ।
— ফিরছি কবে ?
— ভাবছি ।
— মানে !
— কাল সকালে, না হলে বিকেলে ।
— গুড। কিন্তু তোমার মাকে একলা ফেলে রেখে যাবে নাকি ?
— সেটাই ভাবছিলাম। ভাবছি, মাকে কদিনের জন্য আমাদের ওখানে নিয়ে যাবো। তুমি আপত্তি করবে কিনা সেটাই…।
— করলেই বা কী ! কে শুনবে ! স্বামীর মা ! এ সংসারে হাজবেন্ডের কথাই তো শেষ কথা তাইনা ?
— এভাবে রিয়্যাক্ট করছো কেন ?
— কীভাবে করবো ! — অঞ্জনা রাগ গোপন রাখতে চায়, ওদিকে গলাটা ভারী হয়ে ওঠে — তুমি জানো, আমাকেও বলেছ বহুবার, উনি অ্যাডামেন্ট । নানারকম কমপ্লেক্স ! হাবেভাবে তো বুঝি আমাকে একদমই লাইক করেন না। আমাদের ফ্ল্যাটে গেলে ওনার, আমার দুজনেরই দম বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে থাকা যায় ! তুমি বলো।
— তাহলে কী করবো ! ভাবো না, একবার ।
— দুটো অলটারনেটিভ বলি।
আপাতত স্নেহলতা এখানেই থাকুক। ঝি, চাকর, সিকিউরিটি রাখা যায়।
— আচ্ছা, উনি কি একবারও তোমাকে বলেছেন যে তোমার বাবার ব্যাঙ্ক, ইনসিওরেন্স, স্টক পেপার্সে কত ব্যালান্স আছে ? বলেননি তো ? আমি জানতাম ।
আরও একটি বিষয় অঞ্জনার চোখে। শ্বাশুড়ি তো এখন অসহায়ই, বিশেষত এইবয়সে। কিন্ত সব হারানোর কান্নাকাটি তো দেখছে না। এ কেমন মেয়েমানুষ ! জীবনে এরকম দেখেনি — আমার মা তো শুনে অবাক। ফোনে বলছিল, ‘ হ্যাঁ রে তোর শ্বশুরশ্বাশুড়ি কি ডিভোর্সি ছিল ?’ শুনতে কী খারাপ লাগছিল। আর এই জমিবাড়িরই বা কী হবে ? আমি বলি…।
অঞ্জনার বুদ্ধি প্রখর। ঠিক সময়ে ঠিক রাস্তাটি বাতলাতে জুড়ি নেই। অনঙ্গপুরের স্থাবর অস্থাবর বিক্রিবাট্টা করে দিক চন্দ্রমৌলি। সমপরিমান জমির মাপে শ্রীরামপুরের চেয়েও বেশি দর মিলব। সেই টাকার কিছুটা দিয়ে ওদের ফ্ল্যাটের কাছাকাছি একটা রেন্টেড ফ্ল্যাট নেওয়া যাবে স্নেহলতার জন্য। বাকি টাকা ব্যাঙ্কে এফডি বা এমআইএস করে দিক। ইন্টারেস্ট থেকেই বিলাসী চালে চলতে পারবে স্নেহলতা। দরকারে বা ইচ্ছে করলে চন্দ্রমৌলি রোজই একবার করে দেখে আসতে পারবে।
তোমার মাকে একটু বুঝিয়ে বলো। প্রথমে রাজি হবেন না। পরে হবেন। সিওর। শেষ বয়সে ছেলের কথা ! তবে আমাদের ফ্ল্যাটে দশ বারোদিন ঠিকাছে। এর বেশি টলারেট করা ইমপসিবল। আমার সাফ কথা। — অঞ্জনা উঠে যায়।
চন্দ্রমৌলি ওঠে না। ডাবলো সেকেন্ড অপশনটাই বেশি পারফেক্ট। তবে মার কাছে কীভাবে কথাটা তোলা যায় ! সমস্যা এটাই, অথচ বলতেই হবে, কালকের পর আর থাকা যাবে না।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৪৫
❤ Support Us







