Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ২৩, ২০২৩

ছায়াযাত্রা

ঋভু চট্টোপাধ্যায়
ছায়াযাত্রা

অলঙ্করণ: দেব সরকার

— তোকে সেই কখন থেকে বলে যাচ্ছি,আস্তে চালা, আস্তে চালা।দেখলি ট্রাকটা কেমন সামনে চলে এসেছিল।একটু হলেই এক্কেবারে পিশে দিয়ে চলে যেত।পলিও সমানে চেল্লাচ্ছে।
— ড্রাইভারকে একটু শান্তি দিতে হয়, এটা খুব চাপের কাজ।
— সেটা জানি বলেই তো তোমাকে এতক্ষণ ধরে আস্তে চালাতে বলছিলাম, শুনলে তো।গাড়িটাতে চেপে তুমি এটাকে রেসিংকার ভাবো।
— পলি, আমি জানি এটা রেসিংকার নয়।তবে এটা আমাদের মত ছোট ফ্যামিলির কাছে এক্কেবারে ড্রিমকার।
— ড্রিমকার বলেই কি এত জোরে চালাতে হবে ? কোথাও লেখা আছে?
— কোথায় জোরে চালাচ্ছিলাম, আশি থেকে একশ, হাই রোডে এর থেকে কম স্পিডে চালালে পিছন থেকে কেউ এসে ঠুকে দিয়ে চলে যাবে।
— হুঁ ঠুকে দিয়ে চলে যাবে ! ঠোকার জন্য সবাই বসে আছে তো।
— বিশ্বাস কর আর নাই কর, ইট ইস আ ফ্যাক্ট।
— ঠুকলেই বা কি, তুই যেভাবে এঁটে সেঁটে বেঁধে রেখেছিস, একটুও সরতে পারিনা।
— সিটবেল্ট খুব কাজের মা, এই দ্যাখো একটু আগেই যেটা হল, ব্রেকটা জোরে দিয়েছিলাম তো জার্ক হল না, হবেও না।
— পলি, তাপ্তিকে তোল এবার, ওই তো সব থেকে বেশি লাফালাফি করছিল।‘গাড়ি চাপব, ঘুরতে যাবো।’আর দ্যাখ গাড়িতে উঠেই কেমন ঘুমিয়ে পড়ল।
— গাড়িতে উঠে নয় গো মা, ব্রিজটা পেরিয়ে।তুমি শুনলে না বলল,‘বাবা গাড়িতে ডানা লাগানো যায় ?’
— হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই তো বললাম,‘তোর বর লাগাবে, সাইকেলেও ডানা লাগানো থাকবে।’এই বাবু তুই কিন্তু গাড়ি চালানোর সময় এতবার ঘাড় ঘোরাবি না।তোর মেয়ে বউ সবাই ঠিক আছে।
—হ্যাঁ ! মেয়ে বউ ? শুধু মেয়ে বউ কেন, আমি তো তোমাকেও দেখতে পারি।
— আমাকে দেখবি না বাবা, এখন আর ছেলেরা মা’কে দেখে না।আমার ভাগ্যটা কি কুক্ষণে একটু ভালো হয়েছে, কে’ জানে ? তবে তোর বাবা সামনের সিটে বসে থাকলে ঠিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখত।
— মা, যা বল না, হাসি পেয়ে যায়।
— হ্যাঁরে পলি, আগে যখন এরা ছোট ছিল ওদের বাবা প্রায়ই বিভিন্ন ছুঁতো করে রান্না ঘরে চলে আসত, জিজ্ঞেস করলে বলত,‘তোমাকে দেখতে এলাম।’
‘আমাকে না হাতি, এলে তো কাজুর সন্ধানে।না হলে চা নিতে।’
— তুই হাসছিস পলি? তোর শ্বশুর এমনিই ছিলরে।রান্নাঘরে এসে প্রায়ই কাজু নিয়ে খেত।খুব ভালোবাসত কাজু খেতে।
— না’গো মা বয়স বাড়লে টানটা এমনিই হয়ে যায়।টান বাড়ে লোভও বাড়ে।আমার বাপের বাড়ির সামনে একটা বাড়ি আছে।এই শীতকালে একটা বুড়োবুড়ি থাকে।
— শীতকালে মানে ?
— বাবু সামনে তাকাবি।পলি বাড়ি গিয়ে বলবি তো।
— না না কথা বল, তবে গলাটা একটু আস্তে কর।
— জানো মা সেই সময়ে ভোর বেলা পড়তে বসে বুড়ো বুড়ির গল্প শুনতে পেতাম।একদিন আবার ভোর তিনটের সময় দেখছি ওরা চা তৈরী করে খাচ্ছে।
— ভোর তিনটের সময় ? বলিস কি’রে?
— তোমাদের ওদিকে সব ওই রকম লোকজন থাকে।সব ছিটিয়াল, সব কুকুরের মাংস খায়, আর পাগলামি করে।
— দেখছ মা কেমন বাজে কথা বলছে।কে তোমাকে কুকুরের মাংস দিয়েছে গো?
— আরে আমিই তো বিয়ের আগে যে কয়েকবার তোমাদের বাড়িতে গেছিলাম স্টেশন বা ওভারব্রিজে দু’টো বড় বড় কুকুর বসে থাকতে দেখতাম।বিয়ের পর আর দেখতে পাই না।
— খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু, বিয়ের সময় সবাইকে কুকুর খাইয়ে ছিল নাকি আমার বাবা?
— তুইও যেমন, ও বকছে বকুক না।ওর কথাতে কান করতে নেই।ওটা এই রকমই।
— না গো মা জানো ঐ দাদু-দিদাকে দেখে খুব কষ্ট লাগত।দুই ছেলে দু’জন দুদিকে থাকে, মাঝে মাঝে দেখা হয়।আর দেখা হলে সারাটা রাত দাদু-দিদা বসে গল্প করে।
— ওর বাবাও এমনই ছিল।যখন দ্বিতীয়বার হাসপাতালে ভর্তি হল, সেপ্টিসেমিয়াতে শরীরে জল জমে গেছিল, এক্কেবারে আনকনসাস, একটা হাসপাতাল থেকে জবাব দিয়ে দিল, আরেকটা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, অজ্ঞান, কিন্তু গাড়ি ছাড়ার সময় চোখ দুটো হাল্কা খুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত হাসি।
— ও মা, তুমি আবার কাঁদছ কেন?
— কাঁদিনি রে, মাঝে মাঝে বুকটা হু হু করে।একটা মানুষ কেমন চলে গেল।বেঁচে থাকলে এই গাড়ি চেপে ঘোরাঘুরিটাতে সব থেকে ও খুশি হত।বেঁচে থাকতে প্রায় বলত,‘একটা গাড়ি কিনব, সবাই মিলে ঘুরব।’আজ দ্যাখ্ গাড়ি হল কিন্তু মানুষটাই থাকল না।
— তোমরা কি গো, বাইরে ঘুরতে বেরিয়েছি, তাও সবসময় ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ। যে গেছে, কাঁদলে কি আর ফেরত আসবে ?
— ফেরত আসেনা সবাই জানে, তাও কি মন মানে, কষ্ট হয়।এই পলি তাপ্তিকে তুলে কিছু খাওয়া, কখন খেয়েছে বলতো।
— হ্যাঁ মা একটু পরে তুলব।
— মা একভাবে বসে থাকবে না।পা’দুটো ফুলে উঠবে।
— জানিরে বাবু।পা’দুটো ফুলে উঠলে সব থেকে অসুবিধা তো হয় আমার নিজের,ওষুধ, ডাক্তার, সে এক বিরক্তিকর অবস্থা হয়।বাবু, সেই সুদীপের দাদার গাড়িটাতে তোর বাবাকে কলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছিলাম।আমরা সিটে পা তুলে বসে ছিলাম বলে নেমে কত কিছু বলল, মনে আছে?
— এখানে তো পা তুলে বসলে তোমাকে কেউ কিছু বলবে না।
— এই শোন একটু গাড়িটা দাঁড় করাবি তো, এমন এটে সেঁটে বেঁধে বসে আছি, বাতকর্মও হবে না।একটু হাত পা গুলো না ছাড়ালে তো ব্যথা আরম্ভ হয়ে যাবে।
— আর একটু গিয়েই দাঁড়াবো।একটা হোটেল দেখে তো দাঁড় করাতে হবে।মা তখন গাড়ির জন্য কত টাকা নিত বলতো।পার্কিং এ কুড়ি টাকা, নিয়ে নিত পঞ্চাশ টাকা।জিজ্ঞেস করলে আবার রেগে যেত।
— সেই সময়টা সত্যিই খুব কষ্টে গেছে।তোর চাকরি নেই, বাবার ওই’কটা এম.মাই.এসের জমানো টাকার ওপর সংসার, একস্ট্রা বলতে শুধু তোর টিউসন।
— সব সমস্যাই তো কাটিয়ে উঠলাম মা।
— তবে আমাদের এই পলি কিন্তু খুব পয়া।ও আসার পরেই তো তোর প্রমোশন হল।
— আর তাপ্তির জন্মাবার পরে গাড়ি।
— মা, ঠিক জন্মাবার পরে তো নয়, দু’বছর বয়স হয়ে গেল।
— নারে ও পেটে থাকতেই সেই উকিল বাবুর কাছে থেকে পুরানো গাড়িটা কেনা হল,মনে আছে?
— মনে থাকবে না।এই গাড়িতে ওনার ওয়াইফের একটা ছবি ছিল, সরাতে বারণ করে ছিলেন।
— দেখছ মা উনিও কিন্তু ওনার মিসেসকে খুব ভালো বাসতেন।
— আমি প্রথম দিন ভেবেছিলাম আমাদের বাড়ির কেউ, পরে তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে ও সব কিছু বলল।আমার তো খুব ভয় লাগত, মনে হত যেন সিটের পিছনে বসে শ্বাস নিচ্ছে।
— উকিল বাবু প্রথমে কিছু বলেননি, এক্কেবারে শেষের দিন বলেন।তার সঙ্গে কত কিছু কথা, মেয়ে নাকি গাড়িটা বিক্রি করে দিতে বলেছে।আমি তবে শো’রুমে কিছু বলিনি যা ইচ্ছে করুক গে।তবে এই সব গাড়ি টারির সাথে অনেক আবেগ জড়িয়ে থাকে।তার সঙ্গে আবার ভালোবাসা প্রেম।আমরাও তো বাবার ছবি রেখেছি।
— কেন রে আমার ছেলেটা কি তোকে ভালোবাসে না ? তোরা কি ভাবিস বুড়ো হয়ে গেছি বলে তোদের আকার ইঙ্গিত কিছু বুঝিনা?
— তুমি না কেমন যেন।
— ভালোবাসার কথা বললেই কেমন যেন।
— না গো মা এই স্বামী-স্ত্রী’র প্রেমটাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়।আরো কি সব আছে কান্তা প্রেম, দাস্য প্রেম, সখ্য প্রেম এইসব।কলেজের বৈষ্ণব পদাবলী পড়াবার সময় স্যার এই সব আলোচনা করতেন।
— অত বাবা প্রেম জেনে লাভ নেই বুড়ো বয়সে মুখের সামনে একটু খাবার ওষুধ এনে দিও, ব্যাস।
— দেখছ মা কেমন ভাবে বলছে, যেন আমিই কিছু দি না।
— না’রে বাবু পলি আমাদের খুব ভালো মেয়ে কোনো তো অভাব অভিযোগ রাখেনা।মুখের সামনে সব কিছু এনে তুলে দেয়।আমাকেও কিচ্ছু করতে দেয় না।
— ওমা ! তুমি দেখো ওর ঘাড়ের কাছে ওটা কি? ঘাম ! কোনো কিছুর ছায়া? দেখ তো।
—একি রে এতো রক্ত! কি করে এত রক্ত এল? তাহলে কি ওই ট্রাকটাতে লেগে গেল।তাতে মাথার পিছনে এত রক্ত বেরোবে কেন ?
— ওমা, তোমারও নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।
—কই দেখি ! হ্যাঁরে তাহলে কি লাগল? ওই জার্কটাতে ? ইন্টারন্যাল কিছু ?
— ওমা আমারও মাথার পিছনে এটা কি দেখো তো।
—একিরে তোরও তো মাথার পিছনে রক্ত, এক্কেবারে গলগল করে বেরোচ্ছে।কোথায় লাগল বলতো ?
—বাবু ! তোর কিছু কষ্ট হচ্ছে?
— মা ওই দেখ সামনে কত লোক ! ওরা তো আমাদের গাড়ির দিকে আসছে।
— বাবু গাড়ি পিছনে কর, গাড়ি পিছনে কর।পলি তাপ্তিকে ওঠা, তাড়াতাড়ি।বাবু নিশ্চয় কাউকে ধাক্কা মেরেছে, এখানকার লোক সব তাড়া করেছে।
— ওমা আমি মোনাকে ধরতে পারছি না।দেখ মোনা কেমন যেন ভারি হয়ে গেছে, তুমি চেষ্টা করে দেখতো ওঠাতে পারো কিনা?
— তাইতো আমিও তো ওঠাতে পারছি না।কি হল বলতে? বাবু গাড়ি দাঁড় করাস না, আরো জোরে চালা, পালাতে হবে, এরা না হলে মেরে ফেলবে।
— ওমা দেখ গাড়িটার চারদিকে লোক ঘিরছে, এই গাড়িটা ভাঙছ কেন ?
— বাবুরে দেখ, দেখ কি হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না।ওদের বারণ কর, বল কিছু।
—ওমা ওরা মোনাকে কেড়ে নিয়ে চলে গেল, কেন নিয়ে গেল, আমি গাড়িটা খুলতে পারলাম না কেন ? মোনাকে ধরতে পারলাম না কেন ?
—বাবু তুই কিছু কথা বলছিস না কেন ?
—মা ওই দ্যাখো ওপাশে কয়েকজন লোক একজনকে অন্য আরেকটা গাড়িতে তুলল।মুখটা দেখতে পেলাম না, কিন্তু জামার রঙটা তো ওর জামার মত, ওমা তোমার মত একজন ! একই শাড়ি।একি মা ওটা তো আমি ! মা তুমি কথা বললে না যে, দেখো। মোনা কই? ওমা মোনা কই, মোনা মোনা ?
—বাবু ! পলি ! মোনা!
— মা ! পলি! মোনা!
— মা! মোনা! তুমি কই গো !

♣♦♣  ♣♦♣  ♣♦♣


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!