Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১, ২০২৩

বিজিৎদা

প্রেমতলার মহিমদার আড্ডাঘর মহিমালয়ে আমরা শনিবার বিকেলে সাগ্রহে অপেক্ষা করতাম বিজিৎদার জন্য। কখন রাজার মত এসে পৌঁছবেন ‘সাহিত্য’ হাতে তুলে দেবেন

রণবীর পুরকায়স্থ
বিজিৎদা

 
শিলচরের ‘অতন্দ্র’ কবিগোষ্ঠীর সমসাময়িক হলেও বিজিৎদা ছিলেন আলাদা। হাইলাকান্দির শ্রীকিষেন সারদা কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক বিজিৎ কুমার ভট্টাচার্য ‘অতন্দ্র’র প্রায় কাছাকাছি সময়ে বের করেন ‘সাহিত্য’ কবিতা পত্রিকা। আমি তখন কলেজের শেষবর্ষের ছাত্র। প্রেমতলার মহিমদার আড্ডাঘর মহিমালয়ে আমরা শনিবার বিকেলে সাগ্রহে অপেক্ষা করতাম বিজিৎদার জন্য। কখন রাজার মত এসে পৌঁছবেন ‘সাহিত্য’ হাতে তুলে দেবেন কবিবন্ধু শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, বিমল চৌধুরী জিতেন নাগ  এবং কনিষ্ঠ রণজিৎ দাশ, মনোতোষ চক্রবর্তী আর খুচরো অকবি আমাকে। তারপর বেরিয়ে পড়বেন অন্য গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে, বিজিৎদা কখনো ‘সাহিত্য’ বিনেপয়সায় কাউকে দেননি। আরও কিছু নীতি নিয়ম ছিল তাঁর, ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় তখন শুধু কবিতা ও কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধ ছাড়া কিছুই  ছাপা হতো না।
 
আমি তখন চাকুরি সূত্রে বিজিৎদার প্রতিবেশী, প্রায়ই চলে আসি লালাবাজার থেকে হাইলাকান্দিতে তাঁর ভাড়াবাড়িতে। আড্ডা হয় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর, একবার কথাকার মিথিলেশ ভট্টাচার্যর বিয়ের বরযাত্রী হয়ে এসে তিনদিন বিজিৎদার বাড়িতে লাগাতার আড্ডা দিয়েছি। বউদি বাড়িতে নেই, হয়তো কায়স্থগ্রাম গেছেন। আমরা সকালে একবার চা খেতে বেরোই, দুপুরে হোটেলে ভাত, বিকেলে চা ভাত, এই ম্যারাথন চলেছে। তারপর বিজিৎদা বললেন তুমি কেন ‘সাহিত্য’এ লেখো না, বললাম আমার যে বেদ আলাদা, যযুর্বেদীয়। গদ্য গল্প ছাড়া জানি না। স্নেহময় সম্পাদক নিয়ম ভাঙলেন,বললেন গদ্যই দাও, ছাপব। দিলাম বরাক উপত্যকার গল্পচর্চা নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ। বিজিৎদা পড়লেন সংকটে, কী করে ছাপানো যায়, শেষ পর্যন্ত লেখাটি বেরলো ‘সাহিত্য’র অঙ্কশায়ী হয়ে, ‘সাহিত্য’র প্রথম ও শেষ গল্পবিষয়ক প্রবন্ধ ক্রোড়পত্র। এর কিছুদিন পর তো ‘সাহিত্য’ হয়ে গেল গদ্য- পদ্য-প্রবন্ধের কাগজ। এখন তো উত্তরপূর্ব ভারতের গল্প কবিতার স্থায়ী ঠিকানা কলেজ রোড হাইলাকান্দির ‘সাহিত্য’।
 
বিজিৎদাকে আমি বলতাম দুর্বাশা সম্পাদক, একবার আমার একটি গল্প নাকচ করে দেন, তাঁর মনে হয়েছে গল্পের প্রধান চরিত্র তাঁকে নিয়ে। এরকম তিক্ত মধুর সম্পর্ক থাকলেও বিজিৎদার মত স্নেহময় দাদা দুজন হয় না। দুপুরে গেছি না খাইয়ে ছাড়বেন না, বাড়িতেও কিছু নেই, তাঁর পুকুর থেকে মাছ ধরে খাওয়াবেন। তাঁকে নিয়ে সংখ্যা করে কলকাতার একটি বিশিষ্ট পত্রিকা। কোনো কারনে সংখ্যাটি তার মনঃপূত হয়নি। তিনি আমাকে টেলিফোন করে বললেন, একমাত্র আমার লেখাটিই নাকি ভালো হয়েছে। আবার কখনো বলেছেন রণবীর কিছুই জানে না।এমন সরলমনা ছিলেন বিজিৎদা।  তার একমাত্র উপন্যাস ’রূপসী বাংলার কাহিনি’ নিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলাম, সেটির জন্যই অকুন্ঠ প্রশংসা। যখনই শিলচর গেছি হাইলাকান্দি গিয়ে বিজিৎদাকে প্রণাম না করে আসিনি, কলকাতা এলেও সস্ত্রীক গেছি, তাঁকে দেখতে। এবার নিজের অসুস্থতার জন্য যেতে পারলাম না।আফশোস থেকে গেল।
 

♦—♦♦—♦♦—♦

 
লেখক পরিচিতি: কথা সাহিত্যিক। কলকাতার বাসিন্দা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!