- কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ৯, ২০২৩
ধারাবাহিক আত্মকথা : আমাদের বিদ্যানিকেতন
আমিত্বহীনতার বৃত্তান্ত
দু’হাতে দাঁড় বাইছেন, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ এবার লিখেছেন, এনইএফ-এর লড়াকু স্থপতি আর মানুষ গড়ার কারিগর জাকির হোছেন্। বয়স অল্প, বড়জোর মাঝ তিরিশের ঘরে, হাওয়া প্রতিকূল, অসমে উগ্রবাদের হুমকি, রাজনীতি কম্পমান, জেদ আত্মশীলতাই প্রধান ভরসা, দিনভর খাটুনি, রাত জেগে বিদেশের নানামুখী শিক্ষা নিকেতনের পাঠক্রম নিয়ে পড়াশুনো, স্বচ্ছ এজেণ্ডা, অভিন্ন অখণ্ড প্রতিষ্ঠান গড়তেই হবে। স্থির লক্ষ্য, পথ দুর্গম, চড়াই উতরাই। দুঃসাধ্য লড়াই আর দুঃসাহস তাঁর শিক্ষাদাতা, জেনে গেছেন শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া স্বপ্নপূরণ সম্ভব নয়। স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, আপন শক্তি বলেই লড়তে হবে। ইতিমধ্যে , বিয়ে করছেন মনের মানুষ ফিরদৌসি বেগমকে, মেধাবী চিকিৎসক। খানদানি পরিবারের সন্তান । বিয়ের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন শুরু। রবীন্দ্রনাথের অবিস্মরণীয় গানের পংক্তির মতো টের পান ফিরদৌসির নিত্য উপস্থিতি, আমার কাজের মাঝে মাঝে, কান্না ধারার দোলা তুমি থামতে দিলে না যে— তৃতীয় পর্বে এ পর্যন্ত, এইসব না-বলা কথা বলতে বলতে প্রশ্ন তুলেছেন জাকির, এরকম অনুভূতির নাম কী? প্রেম, না দাম্পত্যের অধরা মাধুরী?সম্পাদক
৯.০৭.২০২৩
• তৃতীয় পর্ব •
বিনয়ের সঙ্গে বলতে ভালো লাগছে , আমার ভাবনা-চিন্তা মূলত সমাজ কেন্দ্রিক। সমাজ ছাড়া ব্যক্তির বিকাশ অসম্ভব। ব্যক্তি প্রতিভা বলতে আমরা যা বুঝি, তা আবহমান ঐতিহ্য, পারিপার্শ্বিক ও পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। আমার আব্বার শিক্ষা দীক্ষার দিকে বিশেষ নজর ছিল,নিজে একা শিক্ষাগ্রহণ করে, শিক্ষকের চাকরি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না, চাইতেন প্রতিবেশ, বিভিন্ন জাতি-উপজাতিদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটুক। ধনী-গরিব কৃষকরা সন্তান-সন্ততিরা আলোকিত হোক। পূর্ববঙ্গের জামালপুর ও অন্যান্য অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর, ১৯০১ সালের দিকে রংপুর পেরিয়ে, কোকরাঝাড় অঞ্চলে তাঁর পিতৃপুরুষের বসতি স্থাপন নিশ্চয় স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নয়। তাঁরা পূর্ববঙ্গের আদি ভিটে-বাড়ি ছেড়ে নিজের দেশেরই পূর্ব প্রান্তে, সম্পূর্ণ অচেনা জঙ্গল আর নদী ঘেঁষা এলাকার কঠিন বসবাসকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। স্থানীয় উপভাষা, ভাষা জনজাতির সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ছিল না,পারিবারিক পরিসরে অপেক্ষাকৃত উন্নত সংস্কৃতি ছিল, খাদ্যাভ্যাস আলাদা ছিল, ধর্মবোধও স্বতন্ত্র, তবু স্থানীয় ভাবাবেগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। অসমিয়া তাঁদের শিক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে। বাড়িতে বাংলা বলতেন। বাইরে অসমিয়াই তাদের যোগাযোগের ভাষা, হিন্দিভাষী চা-শ্রমিক, বরো, কোচ ও জনজাতিদের অভিমুখও ছিল ওই দিকে, বৃহত্তর জাতি-গঠন প্রক্রিয়া তাঁদের নিজস্ব পরিচয়কে অসমিয়া জাতিসত্তার সঙ্গে জুড়ে দেয়। বাঙালি হিন্দু, যাঁরা প্রান্তিক এবং গ্রামাঞ্চলে বাস করতেন, তাঁরাও পূর্বজ স্মৃতিকে প্রশ্রয় দেননি। শহরবাসীদের কথা আলাদা। সাংস্কৃতিক অহমিকাবোধ তাঁদের আটকে দেয়। এতে চিন্তার সংঘাত তৈরি হয়, অন্যরকম পরিস্থিতিও তৈরি হয়। আমার বাবারা যেহেতু গ্রাম থেকে এসে গোয়ালপাড়া জেলার কৃষিজীবনকে ছুঁয়ে থাকতেন, সে কারণে প্রকৃতি আর স্থানীয় জনপদের সঙ্গে মিশে যাওয়াকে জীবন-যাপনের স্বতঃস্ফূর্ত, স্বাভাবিক ধর্ম ভাবতেন। এটাই তাঁদের সামাজিকতার, সামাজিক দায়বদ্ধতার অন্যতম লক্ষণ ছিল। আমি নগরবাসী হয়েও ওই বৈশিষ্ট্যকে আগলে রেখেছি। বাংলা বলতে পারি, গ্রামাঞ্চলে গেলে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে তাঁদের জবানেই আলাপ করি, ধাত্রীভাষা আর মাতৃভাষা ভেবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অসমিয়া বলি, ভাষিক আর সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে বিলকুল আমল দিই না। কখনো দেব বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, জন্মগত অধিকারকে কেউ যদি ছিনিয়ে নিতে চায়, চাপিয়ে দিতে চায় পছন্দ, সেখানে আমি অবশ্যই রুখে দাঁড়াব, সংযত আর সংহত কৌশলে।
এন.ই.এফ গড়তে গিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গাটাকে উড়িয়ে দিইনি। আবার সামাজিক পছন্দকে অগ্রাহ্য করিনি। মিলে থাকব, মিশে থাকব, নিজেকে অতিক্রম করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেব, সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেব, এরকম উপলব্ধি আমার মনন ও কর্মের দোসর। বন্ধু নির্বাচনে আমি সতর্ক, কিন্তু বিলকুল অনুদার নই। নিঃস্বার্থ ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিই। এরকম ভাবনা, আমি বিশ্বাস করি সাংগঠনিক উদ্যোগের সহায়ক হয়ে ওঠে। লড়াই কখনো একক নয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে লড়তে হয়। সামান্য একটি কাঠি তৈরিতেও অনেক হাতের দরকার পড়ে। একজন এগিয়ে আসেন, প্রয়োজনীয় আয়োজন শুরু করেন। তাকে দেখে অনেকাকানেক আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং সমবেত চেষ্টায় যে কোনো বিষয় অথবা বস্তু মূর্তি ধারণ করে। ব্যক্তিক উদ্যোগ এখানে অবশ্যই জরুরি। ব্যক্তির প্রয়াস আর সাংগঠনিক দৃষ্টিপাতকে সমাজের ইচ্ছা এগিয়ে দেয়। এজন্যই সামাজিকতা ও সামাজিক মঙ্গলবোধকে এড়িয়ে থাকা অসম্ভব।
অসমের ‘বিদেশি সমস্যা’, উগ্রবাদের সংক্রামক হুমকি, প্রতিবছর বন্যার উপদ্রব, নদী ভাঙন সমাজকে নিয়মিত ধাওয়া করে। কর্মসংস্থান সীমিত, সবার মুখ্য জীবিকা চাষবাস এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে আরোপিত অনিচ্ছা—এরকম সমাজের তরুণ সদস্যকে অর্থ জোগাবে কে? নিজেই হাল ধরছি, দুই হাতে দাঁড় বাইছি, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, যা কেউ শুনতে পায় না, ঘর্মাক্ত দেহ দেখতে পায় না
এন.ই এফের বহুমুখী প্রতিষ্ঠান গড়তে গিয়ে আমরা একক চিন্তা আর একক প্রয়াসকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছি, ততটাই ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারকে নাকচ করার সাহস অর্জন করেছি। আমার শ্রম , একাগ্রতা, পারিবারিক ত্যাগের পরিমাণ হয়তো একটু বেশি, যা হওয়া স্বাভাবিক, পাশাপাশি বৃহত্তর দৃষ্টিনিক্ষেপের পরিসর সৃষ্টির সংহত প্রয়াসকে উপেক্ষা করিনি। সমাজ আমার দিকে তাকিয়েছে, হাসিমুখে হাত বাড়িয়েছে, সে হাত স্পর্শ করে ধন্যবোধ করেছি, আর এভাবেই আমার আমিত্বকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে ঝাপ দিয়েছি মহা প্রতাপশালী খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ জনপদের আকাঙ্ক্ষার নির্মাণ আর পুনর্নিমাণে। বিশাল এক শূন্যতা বোধ ছিল। সে শূন্যতা পূরণের দায় প্রকৃতি আমাকে দান করেছে। এখানে আমি কোনো মহীরূহ নই। নিছক একজন কর্মী অথবা স্বপ্নময় কারিগর। প্রজাপতি নিজের ইচ্ছায় ডানা মেলে, সে ক্ষুদ্র হলেও ক্ষুদ্রতাবোধের শিকার নয়, সে জানে কোনদিকে, কীভাবে ছুটতে হবে। কোন গাছে বসে খাবার আহরণ করতে হবে। প্রজাপতির বেচে বর্তে থাকার বৃত্তান্ত আমাদের জানা নেই, হ্যাঁ বুঝতে পারি তার লড়াই মৌমাছির মতো রসদ সংগ্রহের মুহুর্তে একক, আবার ভাণ্ডার গড়ার ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ। প্রজাপতি সুন্দর আর সতসাহসের প্রতীক, মৌমাছির সমবেত প্রয়াসের জোটবদ্ধ সৈনিক। প্রজাপতি আমাকে সুন্দরকে খুঁজে বের করবা রসশিক্ষা দিয়েছে। তেমনি প্রাণিত করে মৌমাছির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ঐক্যবোধ।
১৯৯৩ সাল পর্যন্ত আমাদের দুঃসাধ্য পরিশ্রম করতে হয়েছে। দিনভর খাটতে হয়, রাতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যারিকুলাম নিয়ে পড়াশুনো করি। সাংগঠনিক পুঁজি নেই। অর্থের পিছনে ছুটতে ছুটতে নাজেহাল। বেকার নই, তবু নির্দিষ্ট আয় নেই। অর্থ জোগানোর প্রশ্নে প্রায় সবাই পিছিয়ে যায়। এমনই একটি অনগ্রসর, অবিকশিত সমাজে আমার জন্ম, বেঁচে বর্তে থাকা যাঁদের প্রধান সমস্যা। অন্যান্য চাপেও তাঁরা দিশাহীন। অসমের ‘বিদেশি সমস্যা’, উগ্রবাদের সংক্রামক হুমকি, প্রতিবছর বন্যার উপদ্রব, নদী ভাঙন সমাজকে নিয়মিত ধাওয়া করে। কর্মসংস্থান সীমিত, সবার মুখ্য জীবিকা চাষবাস এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে আরোপিত অনিচ্ছা—এরকম সমাজের তরুণ সদস্যকে অর্থ জোগাবে কে? নিজেই হাল ধরছি, দুই হাতে দাঁড় বাইছি, পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, যা কেউ শুনতে পায় না, ঘর্মাক্ত দেহ দেখতে পায় না।

২০২৩,উত্তর পূর্বের সেরা স্বাস্থ্য বিজ্ঞান শিক্ষাঙ্গনের অন্যতম গুয়াহাটির এনইএফ কলেজ অব হেলথ সাইন্স
জেদি, আত্মনির্ভর, দুঃসাহসীকে সম্ভবত বিষণ্ণতা কাবু করতে পারে না, ছুটতে ছুটতে কাজ করে, স্বেচ্ছায় একধরনের শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলে, সময়কে ভাগ করে নেয়। আমার ক্ষেত্রেও এরকম হওয়াই স্বাভাবিক।
বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ আছে। দুই ইদে যাই, বড়ো জোর একদিন কাটিয়ে গুয়াহাটি চলে আসি, এসেই ছোটাছুটি শুরু। ধীরে ধীরে স্থিতি আসতে থাকে। সাফল্যের মুখ দেখি। পরিচয়ের বৃত্ত বাড়ছে, বাড়ছে পরবর্তী ঝুঁকি গ্রহণের বিত্ত; অর্থ উপার্জনের প্রধান উৎস অ্যাডমিশন কনসালটেন্সি, ভারত আর রাশিয়ার একাধিক সংস্থায়। কনসালটেন্সি করতে করতে মনে হল, এটি উপার্জনের স্থায়ী রাস্তা নয়, পায়ের তলার জমিকে আরো শক্তপোক্ত করতে হবে, নিজের প্রতিষ্ঠানের আয় কঠিন পথে পা দিয়েও বাড়াতে, নানা দিকে সুযোগ খুঁজছি, কোনো হাতছানিকেই অবজ্ঞা করি না, খতিয়ে দেখি, ভাবি এবং সিদ্ধান্ত নিই।

আমার মা এবং বাবা
বাড়ির লোকেরা ভাবলেন, স্বাবলম্বী হয়ে গেছি। বিয়ের বয়স হয়েছে, বিয়ে করতে হবে। চাপ দিলেন। এখানেও মা-বাবা আর নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হল।১৯৯৫ সালে, গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস উত্তীর্ণ, ফিরদৌসি বেগমকে জীবন সঙ্গী বেছে নিই। পূর্ব পরিচিত, আমার মনের মানুষ। মেধাবী মহিলা। অভিজাত পরিবারের সন্তান। ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে আব্বা-আম্মার পছন্দ মিলে গেল। ফিরদৌসির পরিবারও খুশি। দুজনই পারস্পরিক যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। কাজের মাঝে মাঝে ফিরদৌসির উপস্থিতি হামেশা টের পাই, আমার আনন্দ আর জেদকে থামতে দেয় না তাঁর ইশারা, এরকম অনুভূতির নাম কী? প্রেম? দাম্পত্যের মাধুর্য? হতে পারে। নিজেকে ভাগ্যবান ভাবি, বিয়ের পর কাজের গতি বেড়ে যায়, ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শিক্ষা নিকেতন কেবল দূরশিক্ষায় থেমে থাকতে চাইছে না, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যসূচিকে সময়োপযোগী অরে তুলতে হবে, তথ্য প্রযুক্তির সদব্যবহার দরকার।
১৯৯৫ সালে , আমার প্রথম সন্তান, ছেলের জন্ম। তার জন্মদিনে চমৎকার একটি ঘটনা ঘটল। হিমাচল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিসট্যান্স এডুকেশন সেণ্টার খোলার অনুমতি পেল এনইএফ। ছেলের জন্ম আর এই অনুমোদনে স্বামী-স্ত্রী দারুণ খুশি। এন.ই.এফের শিক্ষক, ছাত্র আর উৎসাহী অভিভাবকরাও আনন্দিত।
ক্রমশ…
আরো পড়ুন⇒ দ্বিতীয় পর্ব
❤ Support Us








