Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • ডিসেম্বর ২১, ২০২৫

ভাষা সৈনিক বনওয়াং লসু

সোমনাথ শর্মা
ভাষা সৈনিক বনওয়াং লসু

 
মানুষকে মানুষ বলা হতো না, যদি না ভাষা আর সাহিত্য বিকশিত হতো। পৃথিবীর যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময়ে, যে কোনো সভ্যতার সমৃদ্ধি পরিমাপ করা যায় তার লিপির বিকাশযাত্রার স্রোতের দিকে তাকালেই। আমরা আজ যে ভাষা, ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর উদ্ভাবন নিয়ে গর্ব বোধ করি, নিত্যজীবনে ব্যবহার করি, তা আসলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাওয়া সুসংরক্ষিত লিখিত নথির মাধ্যমেই পাওয়া। ‘লিপি ছাড়া ভাষা, অনেকটা বীজহীন গাছের মতো’—এমন চিন্তারই সূচনা করেছিলেন বনওয়াং লসু, ওয়াংচো লিপির স্থপতি।

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন,

 
বিভিন্ন উপজাতির যে মৌখিক ভাষাগুলো পৃথিবীতে বিদ্যমান, অন্যান্য ভাষার মতোই তা সমান গুরুত্বপূর্ণ, সংরক্ষণের দাবীদার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় স্থানীয় ভাষাগুলো ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে সেই ভাষা-সমুদ্রে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ একইভাষায় কথা বলেন।

 
যেমন অরুণাচল প্রদেশ, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, উপভাষাগত ভিন্নতা এবং বহুজাতীয়তার ভূখণ্ড, অথচ সেখানে উত্তর ভারতীয় ভাষা যেমন হিন্দি বা ঔপনিবেশিকতার ধারা রাখা ইংরেজি সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাতৃভাষার সাথে নিজেদের সংযোগ হারাতে শুরু করে।
 
বিস্তীর্ণ সে অঞ্চলের, বিবিধ সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে, মাতৃভাষা ওয়ানচো লিপির সম্পূর্ণ সংরক্ষণের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন বনওয়াং লসু। নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ধ্বনিতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে, এমনকি সুরের সামান্যতম পার্থক্যও হারিয়ে না দিয়ে, স্বাধীন লিপি নির্মাণের তিনিই কারিগর। আজ সেই নির্মাতার জীবনের অজানা গল্প, ওয়াংচো লিপি আর সাহিত্যের অবিচল, অকুতোভয় নির্মাণ আর সংগ্রামের কথা শোনাতে বসেছি।
 
হাতেখড়ি
 
অরুণাচল প্রদেশের লংডিং জেলার প্রত্যন্ত কেমহুয়া নোকনু গ্রাম। পাহাড়, বন আর নদীঘেরা ওই গ্রামে ১৯৮২ সালের ২০ মে জন্মান বানওয়াং লোসু। বাবা নিয়ামওয়াং লোসু ও মাতা লেফটেন্যান্ট চুংগাম লোসুর চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশবেই নেমে আসে বিপর্যয়, প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পিতৃহারা হন বনওয়াং লসু। ছোটবেলা থেকেই তিনি শান্ত ও পরিশ্রমী প্রকৃতির। গ্রামের সরকারি ইন্টার ভিলেজ স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক। উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন, ফিডার স্কুলের কারণে মিস্টার বানওয়াং লোসু হোস্টেলে থাকার সুযোগ পান। পড়াশোনার পাশাপাশি ছিল কঠোর জীবনসংগ্রাম। ইউনিফর্মের বদলে একজোড়া সাধারণ শার্ট আর হাফ-প্যান্ট পরে খালি পায়ে স্কুলে যাতায়াত।
 
সেসময় ছাত্রদের শহর থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার শিক্ষক এবং নিজেদের হোস্টেলের ব্যবহারের জন্য খাবারের সামগ্রী মাথায় করে নিয়ে যেতে হতো। রাস্তা নেই, পাহাড়ি উঁচুনিচু পথ, বন ও নদী পেরিয়ে মাথায় করে চাল-ডাল বহন— এই ছিল তাঁর ছাত্রজীবনের নিত্যদিনের ছবি।
 
পিতৃহীন সংসার আর শূন্য পকেট তাঁকে শিখিয়েছিল সংযম, সহনশীলতা আর পরিশ্রমের মূল্য। ছুটির দিনে অন্য গ্রাম বা শহরে গিয়ে মজুরির কাজ করতেন, শুধুমাত্র পরের ক্লাসে ভর্তি আর পড়াশোনার খরচ জোগাড় করার জন্য। জীবনের রুক্ষতাই তাঁকে হীরের মতো কঠিন, দ্যুতিময় হতে শেখায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর অবিচল লড়াই, তার বীজ পোঁতা হয়েছিল সে সময়েই। মনে গেঁথে যায় একটি বিশ্বাস—‘কাজ শুধু পূজা নয়, কাজই সফলতার একমাত্র পথ। কাজই একমাত্র মানূষের হৃদয় ও আত্মকে সব খারাপ প্রভাব থেকে দূরে রাখে।’
 
স্বাধীন চিন্তার বীজ
 
মধ্যশিক্ষা সম্পন্ন করেন পংচাউয়ের সরকারি মধ্য বিদ্যালয়ে। এলাকার নয়টি গ্রামের জন্য একটিই স্কুল। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সময় তিনি কখনো মুখস্থবিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন না। পরীক্ষার খাতায় নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে উত্তর লেখার চেষ্টা করতেন। উজ্জ্বল নম্বরের প্রতিযোগিতায় নাম না লিখিয়ে খুঁজতেন ভাবনার স্বাধীনতা। সে তাগিদেই ১৯৯৯ সালে চাংলাং জেলার মিও-র সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পাশ করে, লংডিং ফিরে এসে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনা। এই সময়েই জীবনের মোড় ঘোরানো এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি।
 
ওইয়াংচো লিপির জন্মক্ষণ
 
লংডিং গভর্নমেন্ট হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে পড়ার সময় বনওয়াং লসুর প্রায়শই ডাক পড়ত সামাজিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করার এবং লিখিত প্রতিবেদন তৈরির জন্য। একবার, অর্থনীতির শিক্ষক এস.ভি.কে. চন্দ্রন তাঁকে ‘ওয়াংচো উপজাতির সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা’ নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখতে দেন। লেখার মাঝপথেই সমস্যায় পড়েন বানওয়াং। বুঝতে পারেন, নিজের মাতৃভাষার বহু শব্দই ঠিকভাবে লেখার মতো কোনো লিপিই নেই। সে শূন্যতাই জন্ম দেয় এক ঐতিহাসিক ভাবনার।
 
যে কিশোর একদিন পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে, নিজের ভাষা হারালে হারিয়ে যায় একটি জাতির অস্তিত্ব। শুরু হয় নিঃশব্দ সাধনা। ভাষাতত্ত্বের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকলেও, রাতের পর রাত জেগে খসড়া আঁকতেন, অক্ষরের কাঠামো গড়ে তুলতেন।
 
প্রায়ই তিনি একা হোস্টেলের ঘরে নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন, খসড়া কাগজের পাহাড় ফেলে দিয়ে লিপির প্রাথমিক ফ্রেম বারবার অনুশীলন করতেন। ছোট্ট ঘর পরিণত হয় এক নিঃসঙ্গ ভাষা-গবেষণাগারে।
 
নেতৃত্বের গুণ আর দায়িত্ববোধ
 
স্কুল জীবনের দিনগুলোতেই, বানওয়াং লোসু যে কোনো পরিস্থিতিকে অদ্ভূতপূর্ব শান্তভাবে পরিচালনা করার স্বভাব আয়ত্ত করেছিলেন। সে কারণে লংডিং-এর গভর্নমেন্ট হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অনেক শিক্ষক তাঁকে ভীষণ পছন্দ করতেন। শান্ত স্বভাব ও দায়িত্বশীল আচরণের জন্য ২০০১ সালে তিনি হোস্টেল মনিটর নির্বাচিত হন। ছাত্রনেতা হয়ে, ক্ষমতার আস্ফালন নয়, সহমর্মিতাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের মূল শক্তি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন জীববিজ্ঞানের শিক্ষক ডঃ ডি. এস. পারমারজি, যিনি প্রয়োজনে তাঁকে আর্থিক সাহায্যও করেছিলেন। সাধারণভাবে ওয়াংচো রীতিতে, পরিবারের বড়ো ছেলেই বেশি দায়িত্ব বহন করে। লোসু সে প্রথার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য তিনি জুনিয়র শিক্ষার্থীদের টিউশন ক্লাসও করাতেন। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই বড়ো হয়ে ওঠা বানওয়াং তাই আজও বিশ্বাস করেন, ‘ভালো মানুষ হওয়ার জন্য দামি স্কুল নয়, দরকার মানবিক শিক্ষা।’ আজও তিনি সব ক্ষেত্রেই, যেমন শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক ব্যবস্থা ইত্যাদিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চান।
 

যে ব্যক্তিরা সমাজে পরিবর্তন আনার এবং তা দেখার ইচ্ছা রাখে, তাঁদের কাছে হাড়ভাঙা অবিরাম পরিশ্রম অপার্থিব ধরনের উত্তেজনা বয়ে আনে। এমন ব্যক্তিরা নিয়মিত খাবার খেতে ভুলে যান, বিশ্রাম নিতে ভুলে যান। মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় মরীচিকার মতো অধরা স্বপ্নেরা

 
কলেজ-জীবন, চাকরি এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি
 
উচ্চ-মাধ্যমিক শেষে লোসু জেইই প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। তামিলনাড়ুতে যান্ত্রিক প্রকৌশল পড়াশোনার জন্য নির্বাচিত হন। বিজ্ঞানের বিষয়ে তাঁর প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয় নি। বাধ্য হয়ে বি.এ. পড়াশোনার পথে যেতে হয় তাঁকে। ২০০৩ সালে তিনি আরুণাচল প্রদেশের ইটানগরে দেরা নাটুং গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। ২০০৬ সালে স্নাতক হন। কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’-এর অধীনে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান বানওয়াং লোসু। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় পোস্টিং, একদিকে চাকরির দায়িত্ব, অন্যদিকে কলেজের পরীক্ষা— সব মিলিয়ে চলছিল তাঁর সংগ্রামী জীবন। আসলে, তাঁর তড়িঘড়ি চাকরিতে ঢোকার মূল কারণ ছিল দৈনন্দিন আর্থিক সমস্যা। কলেজ জীবনে প্রায়শই তিনি না খেয়ে ক্লাসে যেতেন। পকেটে টাকা না থাকার, দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকতে হতো। কলেজ ক্যান্টিনে বন্ধুদের কাছে পাওয়া এক কাপ চা সোনার মতোই মূল্যবান ছিল তাঁর কাছে। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর, তাঁর প্রথম পোস্টিং হয় গভর্নমেন্ট মিডল স্কুল, খাসা, পংচাও চক্র, লংডিং জেলায়, যা ভারত-মায়ানমার আন্তর্জাতিক সীমানার কাছাকাছি। চাকরি পাওয়ার পরও সমস্যা কমেনি, বরং চ্যালেঞ্জ আরো বেড়েছে। যে দূরবর্তী জায়গায় সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাতে হয়তো প্রতিদিনের খরচ চালানো যায়, কিন্তু ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য কলেজে উপস্থিত থাকতেও তো হয়। এমন কঠিন সময়ে ওয়ানচো লিপি তৈরির স্বপ্নও তিনি ত্যাগ করেননি। যদিও কাজ ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, কিন্তু তা বন্ধ করেননি কখনো। আর পাহাড় প্রমাণ ব্যস্ত সময়ে তার খাবার, ঘুম, মানসিক ও শারীরিক বিশ্রামের ঘাটতি তাঁকে নিয়ে গেল এমন এক জায়গায় তা তিনি নিজেও ভাবেননি কখনো। আজও, স্মৃতি মাঝে মাঝে তাঁকে আর তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের মনে করিয়ে দেয় সে কথা।
 
সংগ্রাম চলছে
 
লোসুকে স্থানান্তরিত করে সরকারি মিডল স্কুল, টিসা-তে দু-বছরের জন্য পোস্টিং দেওয়া হয়। এরপর আবার তাঁকে সরকারি টাউন সেকেন্ডারি স্কুল, খোন্সা, তিরাপ জেলায় পাঠানো হয়। সেখানে একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর কাজ অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিল। ছাত্রদের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্কুল ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন আনেন। পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যে কর্মসংস্কৃতি উন্নত করতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেন। স্কুলে তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষক যিনি পুরো দিন, বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত কাজ করতেন। বাড়িতে ফিরেও, মধ্যরাত পর্যন্ত প্রদীপ জ্বালিয়ে ওয়াংচো লিপির প্রতিটি অক্ষরের উন্নয়নের কাজ করতেন।
 

২০০৭ সালে, আঞ্চলিক মানববিদ্যাবিদ নক্কাই ওয়ান্সাহাম–এর উদ্যোগে লংডিং-এ অনুষ্ঠিত হয় ওই কর্মশালা। শিরোনাম ছিল ‘সংকটাপন্ন ওয়াংচো ভাষার ডকুমেন্টেশন’। সে সময় জনাব লোসু আর কোনো সাধারণ ব্যক্তি রইলেন না, তাঁর পরিচিতি তখন একজন উদীয়মান লেখক

 
যে ব্যক্তিরা সমাজে পরিবর্তন আনার এবং তা দেখার ইচ্ছা রাখে, তাঁদের কাছে হাড়ভাঙা অবিরাম পরিশ্রম অপার্থিব ধরনের উত্তেজনা বয়ে আনে। এমন ব্যক্তিরা নিয়মিত খাবার খেতে ভুলে যান, বিশ্রাম নিতে ভুলে যান। মাথায় কেবল ঘুরপাক খায় মরীচিকার মতো অধরা স্বপ্নেরা।
 
লোসুর শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম চাইছিল। কিন্তু তিনি মগ্ন তাঁর স্বপ্নের প্রকল্পে। যা বদলে দেবে ওয়াংচো উপজাতির ইতিহাস। দুর্বার এই স্রোতই তাঁকে বিশ্রাম নিতে দিচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত, মন ছাপিয়ে শরীর নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। অসহনীয় পরিস্থিতির কারণে তিনি শারীরিক দুর্বল হয়ে পড়েন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময়েই শরীর ভেঙে পড়ে। অতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আর নিদ্রাহীন রাতের ফল— যক্ষা। দুই বছর ধরে খোন্সার সেবা কেন্দ্রে কঠিন চিকিৎসা চলে। তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। অসুস্থ শরীরেও তিনি কথা বলেছেন ওয়াংচো লিপির ভবিষ্যৎ নিয়ে।
 
খবর রটে যায়
 
এদিকে, নতুন লিপি নিয়ে তার উদ্ভাবনী কাজের খবর পৌঁছে যায় ওয়াংচো সম্প্রদায়ের শিক্ষিত মানুষের কাছে। তাঁর তৈরি অক্ষর ‘প্রোটোটাইপ ওয়াংচো এলিট’ এবং ভাষা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।
 
২০০৭ সালে, আঞ্চলিক মানববিদ্যাবিদ নক্কাই ওয়ান্সাহাম-এর উদ্যোগে লংডিং-এ অনুষ্ঠিত হয় ওই কর্মশালা। শিরোনাম ছিল ‘সংকটাপন্ন ওয়াংচো ভাষার ডকুমেন্টেশন’। সে সময় জনাব লোসু আর কোনো সাধারণ ব্যক্তি রইলেন না, তাঁর পরিচিতি তখন একজন উদীয়মান লেখক।
 
তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি তখনো হয়নি। তাঁকে মিশনারিজ অব চ্যারিটি পরিচালিত একটি নার্সিং হোম ‘সেবা কেন্দ্র, খোন্সা’-তে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি দুই বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন। উদ্বেগ আর আশঙ্কা বুকে তাঁর পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা কায়মনে তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতেও তাঁর লৌহ হৃদয় এতটুকু কাঁপেনি। তিনি সর্বদা বাস্তব গুণমানসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থা উন্নয়নের কথা বলতেন। তাঁর সৃষ্টি লিপি উন্নয়ন কাজের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন। তাঁর ভাবনা আর স্বপ্নের কথা, সেসময় অনেক শ্রোতার মনে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছিল। তিন বছর অসুস্থ থাকবার পর, অবশেষে তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন কাজে।
 

নতুন সূর্যোদয়ে তৈরি হয় ইতিহাস
 
দীর্ঘ ১৩ বছরের শ্রমের ফলস্বরূপ প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘The Wancho Script’। বই প্রকাশের আগে তিনি তাঁর দল নিয়ে লংডিং জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে প্রচার চালান, যাতে তাঁর গবেষণামূলক কাজের চূড়ান্ত স্পর্শ দেওয়ার আগে তা মানুষের কাছে পৌঁছায়। শুধু রাজ্য নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি পায় তাঁর কাজ। ‘ওইয়াংচো লিপি’ বইটি আমেরিকার পেঙ্গুইন পার্ট্রিজ প্রাইভেট কোম্পানি থেকেও প্রকাশিত হয়। ২০১৭ সালে টাটা স্টিলের ‘সম্বাদ ফেলোশিপ’ পান, ওয়াংচো ভাষার বই প্রকাশের জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এরপর ‘ওয়াংচো প্রাইমার বুক’ এবং ‘ওয়ার্কবুক’ প্রকাশিত হয় । ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে লংডিং-এ ওরিয়াহ উৎসবের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় সেগুলি। ২০১৯ সালে ‘দ্য আনসাং হিরোজ অফ নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়া’, ২০২২ সালে স্যান্ট এসওয়ার্ড পুরস্কার—একটির পর একটি সম্মান আসে তাঁর ঝুলিতে। তাঁর কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে, মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র নির্মাতা, রাহুল রানাডিভেও একটি বই লেখেন, শিরোনাম দেন ‘রাইটিং ওয়াংচো’। আরো বহু পুরস্কার ও প্রশংসা ভবিষ্যতে তাঁকে ছুঁয়ে যাবে, এ প্রত্যাশা আমাদের রয়েছে। তবে সবচেয়ে অদ্ভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালে, যখন ইউনিকোডে অন্তর্ভুক্ত হয় ওয়ানচো লিপি— একটি ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
 
তবু কিছু কথা বাকি থেকে যায়…
 
বনওয়াং লোসুর জীবন প্রমাণ করে, অভাব, অসুখ বা প্রতিকূলতা কোনোটিই স্বপ্নের পথে শেষ কথা নয়। কঠোর পরিশ্রম এবং উৎসর্গ যেকোনো মানুষকে সর্বোচ্চ সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে, সে জীবন যতই কঠিনই হোক। ওয়াংচো লিপি, সাহিত্যে অসাধারণ অর্জন আর লোসুর সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস অরুণাচলপ্রদেশের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে রয়ে যাবে, এ কথা হলফ করেই বলা যায়। বারবার উঠে আসবে এক নির্ভেজাল শিক্ষকের কথা, যিনি নিজের ভাষার জন্য লড়াই করে বদলে দিয়েছেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আজ তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণের অন্যতম কণ্ঠস্বর। তাঁর জীবনের গল্প শুধু এক ব্যক্তির সাফল্যের নয়, বরং এ গল্প বিশ্বাসের, শ্রমের এবং ভাষার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার।

♦♦•♦♦♦♦•♦♦♦♦•♦♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!