Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

রাষ্ট্রসংঘে পাক-সাংবাদিকের প্রশ্নে তীক্ষ্ণ মন্তব্য জয়শংকরের,  শাহবাজের ভাষণের জবাবেও পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিল্লির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রাষ্ট্রসংঘে পাক-সাংবাদিকের প্রশ্নে তীক্ষ্ণ মন্তব্য জয়শংকরের,  শাহবাজের ভাষণের জবাবেও পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিল্লির

রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রশ্ন করতে গিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শংকরের কড়া জবাবের মুখে পড়লেন পাকিস্তানের এক সাংবাদিক। শুক্রবার রাষ্ট্রসংঘে সাংবাদিক বৈঠক চলাকালীন দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ নিয়ে জয়শংকরকে প্রশ্ন করেন ওই সাংবাদিক। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে তিনি ‘ভুল মানুষকে’ বেছে নিয়েছেন। বরং পাকিস্তানের মন্ত্রীদেরই এ বিষয়ে প্রশ্ন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ় শরিফের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ভারতীয় প্রতিনিধিও তুললেন সন্ত্রাসবাদ, মিথ্যাচার, দ্বিচারিতা এবং প্রতারণার অভিযোগ। একই সঙ্গে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, পাকিস্তানের মদতে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে গেলে তার ‘ফল’ ইসলামাবাদকেই ভুগতে হবে।

শুক্রবার রাষ্ট্রসংঘে বন্ধুদেশগুলির সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শংকর এবং লাইবেরিয়ার বিদেশমন্ত্রী সারা বেসোলো নয়ান্তি। সেই সাংবাদিক বৈঠকেই পাকিস্তানের এক সাংবাদিক জয়শংকরকে প্রশ্ন করেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া আর কতদিন দিল্লি, কাবুল এবং পাকিস্তান-সৃষ্ট সন্ত্রাসের মুখোমুখি হবে?’
প্রশ্ন শুনে জয়শংকর পাল্টা বলেন, ‘আপনি ভুল মানুষকে প্রশ্নটা করছেন। আমি এমন কোনো মন্ত্রী নই যিনি এর উত্তর জানবেন। বরং পাকিস্তানের মন্ত্রীরা আপনাকে বলতে পারবেন, তাঁরা কতদিন এই সন্ত্রাসে মদত দেওয়ার কাজটা করে যাবেন।’

এরপর আরও সরাসরি পাকিস্তানকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘আপনিই বলুন, কতদিন পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ পুষে রাখবে?’ জয়শংকরের এ মন্তব্যের পর সাংবাদিক বৈঠকের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, ‘একটা সন্ত্রাসবাদী দেশ আমাকে এই প্রশ্নটা করছে! আশ্চর্য!’ এরপর রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হরিশ পার্বতানেনিও ওই সাংবাদিককে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি আপনার প্রশ্নের জোরাল ও সুস্পষ্ট জবাব পেয়েছেন।’ তবে সেখানেই থামেনি ভারত-পাকিস্তান বাদানুবাদ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে ভারতকে নিশানা করে একাধিক অভিযোগ তোলার পর শনিবার ‘রাইট টু রিপ্লাই’-এর মাধ্যমে তার জবাব দেয় দিল্লি। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের ‘পার্মানেন্ট মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি’ পেটাল গহলৌত পাকিস্তানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। কাশ্মীর, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে শাহবাজ যে অভিযোগ তুলেছিলেন, সেগুলিও খারিজ করে দেয় ভারত।

ভারতীয় প্রতিনিধি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘ দিনের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ। তাঁর বক্তব্য, গত বছর ভারত দেখিয়ে দিয়েছে যে সন্ত্রাসবাদীদের পালিয়ে যাওয়ার বা কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকার সুযোগ আর থাকবে না। আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের কথাও স্পষ্ট করে জানান তিনি। একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, পাকিস্তানের মদতে যে সন্ত্রাসবাদ চলছে, তার ফল পাকিস্তানকেই ভোগ করতে হবে। পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের বক্তব্যকে খণ্ডন করতে গিয়ে গহলৌত আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোনো মিথ্যা কথা বলে গেলেই তা সত্যে পরিণত হয় না। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সভা পাকিস্তানের ‘প্রকৃত স্বরূপ’ চিনবে এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা মিথ্যাচারের মাধ্যমে যে ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, তার ভিত্তিতে নয়। সন্ত্রাসবাদ, প্রতারণা এবং দ্বিচারিতা পাকিস্তানের নিজেদের কোনো কাজে আসবে না, একই ভাবে তা বিশ্বেরও কোনো উপকার করবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শাহবাজ শরিফ তাঁর বক্তব্যে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তারও পাল্টা জবাব দেয় ভারত। ভারতীয় প্রতিনিধির বক্তব্য, এমন একটি দেশের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধের কথা শুনতে হচ্ছে, যে দেশের রাজধানীকে নিজেদের লোকের হাত থেকেই রক্ষা করার ব্যবস্থা করতে হয়। এর কারণ হিসাবে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থার উপর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলেন তিনি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে গহলৌতের বক্তব্য, সেখানে সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করেই শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় এবং ‘তাদের হাতের পুতুলরা ক্ষমতায় আসে আর যায়’। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা আন্তর্জাতিক মহলের অজানা নয় বলেও মন্তব্য করেন ভারতের প্রতিনিধি।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে উঠে আসে আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের নামও। গহলৌত মনে করিয়ে দেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় হামলার অন্যতম মূল ষড়যন্ত্রকারী ওসামা বিন লাদেন দীর্ঘদিন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁর গোপন আস্তানা পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমির কাছাকাছি ছিল — এ তথ্যকে সামনে রেখে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক তুলে ধরার চেষ্টা করে ভারত। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি এবং তাঁদের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ভারতীয় প্রতিনিধি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল পাকিস্তানের কথিত দ্বিচারিতা। ভারতীয় পক্ষের অভিযোগ, ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বললেও অন্য দিকে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত দেওয়ার অভিযোগ থেকে তারা মুক্ত নয়। অর্থাৎ দিনে নিরাপত্তার কথা বলা এবং রাতে সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তা করার এই দ্বৈত নীতির অভিযোগও রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে তুলে ধরে ভারত।

জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। কাশ্মীর নিয়ে শাহবাজ় শরিফের বক্তব্য খারিজ করে ভারতীয় প্রতিনিধি পুনরায় জানান, জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কাশ্মীরকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বার বার তুলে ধরার কৌশলেরও সমালোচনা করা হয়। ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়েও রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে তীব্র ফারাক দেখা গিয়েছে। শাহবাজ শরিফ ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার জবাবে ভারতীয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে জানায় এবং জঙ্গি পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রসঙ্গ সামনে আনে।

প্রসঙ্গত,  সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই পরস্পরবিরোধী অভিযোগ রয়েছে। কার্গিল যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক পহেলগাঁও হামলা পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনগুলিকে মদত দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। পাকিস্তান অবশ্য ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি পরিকাঠামো নিয়ে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ভারত দাবি করেছে, ওই অভিযানে পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের অভিযোগ ও পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!