- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৫
সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক ভিটে ভাঙছে বাংলাদেশের শিশু একাডেমি। প্রশ্ন তুলল প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ইতিহাস রক্ষায় সরব জনমত
বাংলা চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরাট অধ্যায়ের সঙ্গে জুড়ে আছে রায় পরিবারের নাম। উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার তারপর সত্যজিৎ, তাঁদের কাজ আর মেধায় এখনো বুঁদ হয়ে থাকেন আপামর বাঙালি। আন্তর্জাতিক চর্চায় বারবার তাঁদের নাম উঠে আসে, গর্বে বুক ভরে ওঠে আমাদের। এই রায় পরিবারের স্মৃতিবাহী শতাব্দী প্রাচীন বাড়ি এখন অতীতের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরের হরিকিশোর রায় রোডে অবস্থিত ওই ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙা শুরু করেছে ময়মনসিংহ শিশু একাডেমি। উদ্দেশ্য—সেখানে একটি আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ। ঐতিহ্যবাহী ওই বাড়ি ভাঙার খবর ছড়াতেই ক্ষোভ ছড়িয়েছে দেশ-বিদেশের সাধারণ বাঙালি নাগরিক থেকে ইতিহাসবিদ, স্থাপত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিবান সমাজের মধ্যে। ইতিহাস রক্ষার দাবিতে সরব হয়েছেন সকলে। কেউ ফেসবুকে পোস্ট করছেন, কেউ আবার সরাসরি সরকারি দফতরে চিঠি পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরে সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা, স্বয়ং স্বনামধন্য সাহিত্যিক-সম্পাদক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর স্মৃতিজড়িত তাঁদের পৈতৃক বাড়িটি নাকি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত। এই সংবাদ অত্যন্ত দুঃখের। রায় পরিবার বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক। উপেন্দ্রকিশোর বাংলার নবজাগরণের একজন স্তম্ভ। তাই আমি মনে করি, এই বাড়ি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। আমি বাংলাদেশ সরকার ও ওই দেশের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে আবেদন করব, এই ঐতিহ্যশালী বাড়িটিকে রক্ষা করার জন্য।’ দিল্লির কাছেও বিষয়টিতে দ্রুত নজর দেবার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
খবরে প্রকাশ যে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরে সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদা, স্বয়ং স্বনামধন্য সাহিত্যিক-সম্পাদক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর স্মৃতিজড়িত তাঁদের পৈতৃক বাড়িটি নাকি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত।
এই সংবাদ অত্যন্ত দুঃখের। রায় পরিবার বাংলার…
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) July 15, 2025
সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরিকিশোর রায় ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া জমিদারবাড়ির জমিদার। বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী তাঁরই পালকপুত্র। উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম কিশোরগঞ্জে হলেও মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি হরিকিশোরের আশ্রয়ে এসে শিক্ষাজীবন শুরু করেন ময়মনসিংহে। এখান থেকেই শুরু হয় এক ঐতিহাসিক পরিবারের যাত্রা। প্রাচীন এই বাড়িটি ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জেলা অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে ২০০৭ সালের পর ভবনটি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ছাদে ফাটল, দেয়ালে ভাঙন—সব মিলিয়ে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারপর থেকেই অ্যাকাডেমির কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয় অন্য একটি ভাড়া বাড়িতে। সেই জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে এখন আধুনিক স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনায় নেমেছে শিশু একাডেমি। ইতিমধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে ভবনের সামনের অংশ। ইটবালি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে চতুর্দিকে। কিন্তু ঠিক এই জায়গায় এসে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই—ভবনটি সংরক্ষণ করে কি আধুনিক ভবন গড়ে তোলা যেত না?
বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার ফিল্ড অফিসার সাবিনা ইয়াসমিন এই ভাঙার ঘটনার খবরে তৎপর হন। জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন পাঠিয়ে তিনি জানান, ‘এই বাড়িটি এখনও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তালিকাভুক্ত না হলেও, জরিপ অনুযায়ী এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। রায় পরিবারের স্মৃতিবাহী স্থাপনা হিসেবে এটি রক্ষা করা উচিত।’ তিনি আরও জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও কথা বলেছেন। আশ্বাস মিলেছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে শিশু একাডেমির পক্ষ থেকে ভিন্ন যুক্তি। জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মো. মেহেদী জামান বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকেই ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ছাদে ফাটল, দেওয়ালে ভাঙন—সব মিলিয়ে বাচ্চাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই দীর্ঘদিন কার্যক্রম চলেছে ভাড়াবাড়িতে। সরকারের অনুমোদন নিয়েই বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আপাতত নির্মিত হবে একটি আধা-পাকা স্থাপনা, পরে হবে পাঁচতলা ভবন।’ তাঁর সাফ কথা—‘ভবনটি না ভেঙে কিছু করা যেত না। ঐতিহাসিক বলে জানলে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু ভবনটি যে সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক ভিটে, তা আমার জানা ছিল না। এখন যদি বাচ্চাদের কিছু ঘটে, তার দায় তো আমারই হবে!’
বাংলাদেশের ইতিহাসবিদ, লেখক ও গবেষকদের বক্তব্য, ক্ষতি হয়ে গেছে বটে, কিন্তু কিছুটা রক্ষা করা এখনও সম্ভব। ইতিহাস গবেষক স্বপন ধর দাবি করেছেন, ‘ভবনটির স্থাপত্যশৈলী দেখলেই বোঝা যায়, এটি ১৭৮৭ সালের পর নির্মিত। হয়তো প্রাচীনতম অংশটি ভেঙে গেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের আদলে পুনর্নির্মাণ সম্ভব। অন্তত তার স্মৃতি সংরক্ষণ করা হোক।’ কবি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘২০০ বছরের পুরনো এই স্থাপনাটি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। রায় পরিবারের নাম শুধু বাংলার নয়, বিশ্বের কাছে গর্বের। ভবনটি ভাঙার আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা ইতিহাসবিদদের সঙ্গে আলোচনা করলেই চলত। এরকমভাবে যদি হেরিটেজ নষ্ট হতে থাকে, আগামী প্রজন্ম কী শিখবে?’ শেষ পাওয়া খবর পর্যন্ত, বাড়ি ভাঙার কাজ আপাতত বন্ধ আছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রেজা মো. গোলাম মাসুম জানিয়েছেন, শিশু একাডেমিকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। কাগজপত্র খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রত্নতত্ত বিভাগের কাছে পরীক্ষার জন্যও পাঠানো হবে সেগুলি।
❤ Support Us







