Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র স্মৃ | তি | প | ট
  • নভেম্বর ১৫, ২০২৫

দ্বাদশ অশ্বারোহীর কবি, শঙ্খপল্লব আদিত্য প্রয়াত

আকবর আহমেদ
দ্বাদশ অশ্বারোহীর কবি, শঙ্খপল্লব আদিত্য প্রয়াত

দ্বাদশ অস্বারোহীর অন্যতম, কবি শঙ্খপল্লব আদিত্য এর জীবনাবসান হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে আগরতলা, রামনগরে চিরসজ্জায় শায়িত হলেন। ‘নীরব বিদ্রোহী’-র প্রয়াণে ত্রিপুরা-সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

‘সম্রাট কবি’, ত্রিপুরার সাহিত্য জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘকাল বিস্মরণের অন্ধকারে থেকেছেন। কিন্তু তাঁর আত্মর গভীরতা, শব্দ- সংঘাত আর দার্শনিক অনুরণন বাংলা সাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে, ভবিষ্যতেও রাখবে।

কবির মৃত্যুর খবর পেয়ে ত্রিপুরার কবি সাহিত্যিকরা তাঁকে শেষবারের মতো দেখবার আকূতিতে ভিড় জমান রামনগরের বাড়িতে। শ্রদ্ধা জানান। অনেকে শ্মশানে গিয়েও শেষ শ্রদ্ধা জানান। হয়তো তাঁর পাওনা ছিল আরো, কিন্তু পরিবার পরিজনদের আপত্তিতে রবীন্দ্র ভবনে শেষ বিদায়ের অবসর তৈরি করা গেল না কিছুতেই। অন্তরালকে সঙ্গী করেই চলে গেলেন ‘দ্বাদশ অশ্বারোহী’ অন্যতম কবি। এর আগে প্রয়াত হয়েছেন সাতজন ‘অশ্বারোহী’; সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ, রনেন দেব, বিজযনকৃষ্ণ চৌধুরী, মানস দেববর্মণ, প্রদীপ চৌধুরী, স্বপন সেনগুপ্ত, প্রদীপ বিকাশ পাল, মৃত্যু ছাপিয়ে, শব্দের ঘোড়ায় চেপে এবার তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন শঙ্খপল্লব আদিত্য।

কবি শঙ্খপল্লব আদিত্য-এর জন্ম ১৯৪৩ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহে। শৈশবেই শব্দের প্রতি দুর্মর আকর্ষণে বাঁধা পড়েন। কুমিল্লার রামমালা পাঠশালায় শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও, পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ১৯৬৪ সালে ত্রিপুরায় চলে আসেন। আসার আগে পূর্ববঙ্গের সংবাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন। ছিন্নমূল হয়ে, আগরতলার প্রগতি বিদ্যাভবন-এ প্রাথমিক বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন ১৯৬৮ সালে। যৌথ সংসারের প্রয়োজনে একসময় ছোটো একটি ছাপাখানা চালানোর চেষ্টা করেন, প্রতিষ্ঠা করেন ‘পান্ডুলিপি’ প্রকাশনা— বাজারের হাওয়া কবির স্বভাবকে মানে না, তাই সফল ব্যবসায়ী হতে পারেননি তিনি৷ পিলাক বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় বাংলা কবিতায় নতুন বাকভঙ্গির এক দুঃসাহসী যাত্র। সমমনাদের সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন কাব্য আন্দোলন, ‘দ্বাদশ অশ্বারোহী।’ পাশাপাশি তিনি ‘জঠর’ নামে একটি কবিতাপত্রও সম্পাদনা করেছেন। মিহির দেব, কল্যাণব্রত চক্রবর্তী, সলিলকৃষ্ণ দেববর্মন, স্বপন সেনগুপ্ত, পীযূষ রাউত, মানিক ধর (বিমান) মানস দেববর্মন, প্রমুখ সেই সময়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাম।

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ভালবাসার মনাক্কা ও খাসা কিসমিস’ ও পরে ‘নির্বাচিত কবিতা’। তাঁর কবিতার একটি পঙক্তি আজ শেলের মতো বুকে বাজছে — ‘এইখানে শুয়ে আছেন সম্রাট শঙ্খপল্লব আদিত্য…’। সময় স্রোতে বইতে বইতে যা আজ প্রবাদ। জীবনের প্রথম অধ্যায় থেকেই ‘উদ্বাস্তু যন্ত্রণা, অস্থিরতা’ আর ‘নগরসভ্যতার প্রতি বিবমিষা’ তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর শব্দচয়ন তীব্র, চিত্র-কল্পনায় সমৃদ্ধ এবং ব্যাকরণগতভাবে এমনভাবে গঠিত যে পাঠক শুধুমাত্র শব্দ পড়েন না, বরং বোধচিত্তে ঢুকে পড়ে যন্ত্রণা, ভালোবাসা আর অন্তহীন শূন্যতার আকাঙ্ক্ষা।

শেষ জীবনে তিনি একাই রামনগরে ভাড়া ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকছিলেন৷ আদ্যন্ত প্রগতিশীল শঙ্খপল্লব-এর মৃত্যু অসহনীয়। তিনি অমর-অক্ষয় হয়ে থাকবেন তাঁর মাটির টান, ভাষার দুঃসাহস ও কাব্যে মানবিকতার জন্য। তাঁর জীবদ্দশায় খুব বেশি জনপ্রিয়তা বা পুরস্কার আসেনি, তবে আগরতলা পুর পরিষদের সরোজিনী পুরস্কার, ভাষা সাহিত্য পুরস্কার, দিপালী খাসনবীশ পুরস্কার, রবীন্দ্র পরিষদের বিজয়কৃষ্ণ পুরস্কার ও সম্প্রতি পরিসর এর সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর চলে যাওয়ার ভার বড়োই তীব্র। শোকাতুর ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে। পরিবার, পরিজন ও গুণমুগ্ধদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞপন করেছে। শোক জানিয়েছেন কবি সাহিত্যিক সহ রাজ্যের বহু মানুষ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!