- এই মুহূর্তে মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- ডিসেম্বর ২২, ২০২৫
যুবভারতী বিশৃঙ্খলায় পুলিশকেই দায়ী করলেন শতদ্রু, পাল্টা যুক্তি পেশ রাজ্যের । রায় স্তগিত হাইকোর্টে
কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিয়োনেল মেসির সফর ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক জনস্বার্থ মামলার শুনানি সোমবার শেষ হল কলকাতা হাই কোর্টে । ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ মামলার রায় আপাতত স্থগিত রেখেছে ।
ঘটনায় মূল অভিযুক্ত হিসেবে ধৃত আয়োজক সংস্থার কর্তা শতদ্রু দত্তকে পক্ষ করা হয়েছে একটি মামলায়। তাঁর আইনজীবী বিশ্বজিৎ মান্না আদালতে জানান, পুলিশের অনুমতি না মেলায় এখনও শতদ্রুর ওকালতনামায় সই করানো সম্ভব হয়নি। তবে তদন্ত যে সংস্থাই করুক, তাতে তাঁদের কোনও আপত্তি নেই বলেও জানান তিনি।
শতদ্রুর তরফে সওয়াল করে জানানো হয়, আয়োজক হিসেবে লিয়োনেল মেসিকে কলকাতায় আনা, যুবভারতীতে মাঠে নামানো—এই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন। অতিরিক্ত দর্শক কী ভাবে মাঠে ঢুকল বা নিরাপত্তা ভাঙল, তার দায় তাঁর নয়। তাঁর বক্তব্য, মেসির সফর কলকাতা ছাড়াও হায়দরাবাদ, মুম্বই ও দিল্লিতে হয়েছে, কিন্তু কোথাও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠেনি।
আইনজীবীর মাধ্যমে শতদ্রু বলেন, “আমি অভিযুক্ত, তাই তদন্ত নিয়ে মন্তব্য করব না । হায়াত রিজেন্সিতে কী হয়েছে, তা আলাদা বিষয় ।” তিনি আরও জানান, যুবভারতীতে মাঠে থাকার জন্য তাঁদের তরফে মোট ৪০০টি পাস দেওয়া হয়েছিল— যার মধ্যে পারফর্মার, খেলোয়াড়, নিরাপত্তারক্ষী ও নৃত্যশিল্পীরা ছিলেন । পাস ছাড়া কাউকে মাঠে ঢুকতে না দেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের । কারা মাঠে ঢুকবেন, তা পুলিশই ঠিক করেছে ।
মেসির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল এনএসজি কমান্ডো এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক—এই যুক্তিও তুলে ধরা হয় । মেসিকে জোর করে স্পর্শ করার অভিযোগ প্রসঙ্গে বলা হয়, কে মেসির কাছে যাবেন বা স্পর্শ করবেন, তা তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরাই নির্ধারণ করবেন। এমনকি বহু পুলিশকর্মীকেও মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা গিয়েছে বলেও দাবি করা হয় ।
টিকিটের দাম নিয়ে দর্শকদের ক্ষোভ প্রসঙ্গে শতদ্রুর আইনজীবীর যুক্তি, বড়ো শিল্পীদের অনুষ্ঠানে ১০-১৫ হাজার টাকার টিকিটও বিক্রি হয়, টিকিটের দাম অনুষ্ঠানের মানের উপর নির্ভর করে ।
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য দাবি করেন, অগস্ট মাস থেকেই ১৩ ডিসেম্বর মেসির সফরের প্রচার চলছিল । বলা হয়েছিল, মেসি বল নিয়ে খেলবেন । রাজ্যের মন্ত্রী সুজিত বসু মেসিকে দিয়ে ৭০ ফুটের মূর্তি উন্মোচন করান । সল্টলেকের এক হোটেলে টাকা নিয়ে মেসির সঙ্গে ছবি তোলার ব্যবস্থাও করা হয় । এই কারণেই মেসি ৪০ মিনিট দেরিতে যুবভারতীতে পৌঁছন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁকে বের করে নেওয়া হয়, যা দর্শকদের ক্ষোভের কারণ হয় ।
শুভেন্দুর অভিযোগ, আট জন দর্শককে গ্রেফতার করা হলেও প্রভাবশালীদের আড়াল করা হচ্ছে । আগাম ৬৫ কোটি টাকা মেসিকে দেওয়া হয়েছে, এই অর্থের উৎস কী, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় । তিনি হাই কোর্টের বিচারপতির নজরদারিতে সিবিআই বা অন্য নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের দাবি জানান ।
ময়ূখ বিশ্বাসের আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় যুবভারতীকাণ্ডের ক্যাগ অডিটের পাশাপাশি ইডি ও সিবিআই তদন্তের দাবি করেন । তাঁর বক্তব্য, এর নেপথ্যে রয়েছে রাজ্য সরকার । আয়ুষ মজুমদারের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, সাধারণ মানুষের টাকা নয়ছয় করা হয়েছে । রাজ্যের তৈরি সিট নিরপেক্ষ নয়, কারণ মন্ত্রীরা ঘটনায় যুক্ত। তাই কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত প্রয়োজন ।
রাজ্যের পক্ষে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মুখ্যমন্ত্রী সংবেদনশীলতার জায়গা থেকে আগেই ক্ষমা চেয়েছেন । মেসিকে জেড ক্যাটেগরির নিরাপত্তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক । কতজন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন, তা রাজ্যকে জানানো হয়নি । তিনি জানান, শতদ্রু মোট ৫০০টি পাস দেন, যার মধ্যে ৮২টি ছিল ‘ক্লোজ প্রক্সিমিটি’ পাস । আইবি ওয়েস্টবেঙ্গল ১২টি পাস দেয়, পুলিশকে দেওয়া হয় ২৫টি পাস । ইতিমধ্যে বিধাননগর পুলিশের ডিসি অনীশ সরকারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে এবং একাধিক পুলিশকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে ।
রাজ্যের দাবি, শতদ্রুর পাঁচটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে । তবে রাজ্য টিকিটের টাকা ফেরত দেবে না বলেও জানানো হয় ।
গত ১৩ ডিসেম্বর লিয়োনেল মেসি যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আসেন। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দর্শকরা স্টেডিয়ামে যান। কিন্তু মাত্র ১৬ মিনিট মাঠে থাকার পর বিশৃঙ্খলার কারণে মেসিকে সরিয়ে নেওয়া হয় । গ্যালারি থেকে অনেকেই তাঁকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাননি বলে অভিযোগ ওঠে । এর পর উত্তেজিত জনতা স্টেডিয়ামে ভাঙচুর চালায় । পরিস্থিতি এমন হয় যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যেতে হয় ।
পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী মেসি ও দর্শকদের কাছে ক্ষমা চান এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় । সেই কমিটির সুপারিশে সিট তদন্ত শুরু হয়েছে । তবে সেই কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে একের পর এক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে হাই কোর্টে ।
এখন সব নজর কলকাতা হাই কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের দিকে, তদন্ত কার হাতে যাবে এবং দায় শেষ পর্যন্ত কার ঘাড়ে পড়ে, সেটাই দেখার ।
❤ Support Us







