- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জানুয়ারি ২১, ২০২৬
কেন্দ্রের হস্তক্ষেপেই অনিশ্চিত সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, অভিযোগ স্ট্যালিনের । বাংলা-সহ সাত ভাষায় ‘সেম্মোজি’ পুরস্কারের ঘোষণা
সাহিত্য অকাদেমির কাজে কেন্দ্রীয় ‘হস্তক্ষেপ’ ঘিরে দেশজুড়ে যখন ক্ষোভ দানা বাঁধছে, ঠিক সেই আবহেই নজিরবিহীন পথে হাঁটল তামিলনাড়ু সরকার। সাহিত্য জগতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ঘোষণার অনিশ্চয়তার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ঘোষণা করলেন, বাংলা-সহ ৭টি ভারতীয় ভাষার জন্য চালু হচ্ছে নতুন জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার— ‘সেম্মোঝি ইলাকিয়া ভিরুধু’। রবিবার চেন্নাই আন্তর্জাতিক বইমেলা (সিআইবিএফ) ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা করেন স্ট্যালিন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এ পদক্ষেপ শুধু সাহিত্যিক সম্মান নয়, বরং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ভাষা ও সৃজনশীল স্বাধীনতার পক্ষে এক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তা।
কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের নির্দেশে ২০২৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ঘোষণার অনুষ্ঠান আচমকা বাতিল হওয়ার ঘটনাকে ‘সাহিত্য ও শিল্পের পক্ষে বিপজ্জনক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’ বলে তীব্র আক্রমণ করলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালাম, ওড়িয়া, বাংলা এবং মারাঠি— এই ৭টি ভাষায় প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মকে ‘সেম্মোজি জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার’ দেওয়া হবে। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫ লক্ষ টাকা। স্বচ্ছতা ও সাহিত্যমান বজায় রাখতে প্রতিটি ভাষার জন্য আলাদা স্বাধীন জুরি গঠন করা হবে, যেখানে থাকবেন খ্যাতনামা লেখক ও সাহিত্যিকরা। স্ট্যালিনের দাবি, দেশজুড়ে বহু লেখক ও সাহিত্য সংগঠন কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে তামিলনাড়ু সরকারকে ‘গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া’ জানাতে অনুরোধ করেছিলেন। সেই আহ্বানের জবাব হিসেবেই এই নতুন পুরস্কার।
প্রসঙ্গত, সাহিত্য আকাদেমি প্রতি বছর ২৪টি ভাষায় পুরস্কার ঘোষণা করে। ২০২৫ সালের জন্য সব ভাষার জুরি ইতিমধ্যেই পুরস্কার প্রাপকদের তালিকা চূড়ান্ত করেছিল। ১৮ ডিসেম্বর সেই তালিকা সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু ঘোষণার ঠিক আগে কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের একটি সার্কুলারের জেরে অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে যায়। সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের একটি নির্দেশের জেরেই এই সিদ্ধান্ত। যদিও সাহিত্য অকাদেমি একটি স্বশাসিত সংস্থা, তবু পুরস্কার ঘোষণা আটকে দেওয়ার ঘটনায় সাহিত্যিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
কেন্দ্রের সার্কুলারে বলা হয়েছে, সাহিত্য অকাদেমিসহ ৪টি স্বায়ত্তশাসিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে এবং পুরস্কার কাঠামো ‘পুনর্গঠন’-এর প্রক্রিয়া মন্ত্রকের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত কোনো পুরস্কার ঘোষণা করা যাবে না।
স্ট্যালিনের নতুন পুরস্কার ঘোষণা ও তাঁর বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। তামিলনাড়ু বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র নারায়ণন তিরুপতি বলেছেন, ‘সাহিত্য অকাদেমিকে রাজনীতিকরণ করা অন্যায়। পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে এবং পুরস্কার ঘোষণাও হবে। মুখ্যমন্ত্রী হয় বিষয়টি জানেন না, নয়তো অহেতুক উত্তেজনা তৈরি করছেন।’তবে নিজের অবস্থানে অনড় বিজেপি বিরোধী স্ট্যালিন। সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ভাষা মানুষকে আলাদা করে না, ভাষাই মানুষকে যুক্ত করে। সাহিত্য কোনও সীমান্ত মানে না।’ অনুবাদ ও কপিরাইট বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, কন্নড় লেখক বানু মুশতাকের ‘হার্ট ল্যাম্প’ ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই বিশ্বজোড়া পরিচিতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারজয়ী সেই লেখকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং তামিলনাড়ুর ‘দ্রাবিড় মডেল’-এর প্রশংসা করেন। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে ‘দ্রাবিড় মডেল ২.০’ সরকার গঠিত হলে এই সাহিত্য উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারিত করে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজ্য জুড়ে গ্রন্থাগার গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, ‘গ্রন্থাগার হবে জ্ঞানের মন্দির।’ সাহিত্য মহলের একাংশ মনে করছে, দেশজুড়ে ভাষা রাজনীতির যে টানাপড়েন, বিশেষ করে ‘হিন্দি আগ্রাসন’ নিয়ে যে বিতর্ক, তার প্রেক্ষিতেও স্টালিনের এ ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকের মতে, এই নতুন পুরস্কার আঞ্চলিক ভাষার সাহিত্যিকদের শুধু উৎসাহই দেবে না, বরং কেন্দ্রীয় ভাষানীতির বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের শক্তিও জোগাবে।
❤ Support Us








