- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২৭, ২০২৬
তারাতলা বিপর্যয়ে উদ্ধার ৩১, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৭ । চতুর্থ দিনেও ধ্বংসস্তূপে চলছে জীবনের খোঁজ, তদন্তে এসআইটি
চার দিন কেটে গিয়েছে। থামেনি ধ্বংসস্তূপের নীচে জীবনের খোঁজ। ভারী কংক্রিটের চাঁই, লোহার বিম আর পাক খাওয়া ইস্পাতের কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে চলছে নিখুঁত তল্লাশি। কোথাও কোনও শব্দ, কোনো নড়াচড়া বা জীবনের সামান্যতম চিহ্ন মিলছে কি না, তারই খোঁজে শনিবারও টানা চতুর্থ দিনের মতো অভিযান চালাচ্ছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), সেনাবাহিনী, স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ, দমকল ও কলকাতা পুলিশ। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ৩১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি আহতরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শনিবার, তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামে চাপা পড়া আরও এক আহত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর বাসিন্দা খালেক সর্দার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর এ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭। রাজ্য প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, উদ্ধারকাজ এখনো শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কোনো ব্যক্তি জীবিত বা মৃত অবস্থায় আটকে রয়েছেন কি না, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বৃহৎ আকারে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করা হবে না। তাঁর বক্তব্য, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ করা। ভেঙে পড়া কাঠামোর প্রতিটি অংশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ভারী যন্ত্র নামিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানো হবে না।’
উদ্ধার অভিযানে প্রযুক্তিকেও কাজে লাগানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে কোনো নড়াচড়া বা জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা জানতে বিশেষ ক্যামেরা প্রবেশ করানো হয়েছে কংক্রিটের স্তূপের ভিতরে। পাশাপাশি যাঁদের মোবাইল ফোন এখনো সক্রিয় রয়েছে, তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে মোবাইল ফোন টাওয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোনো সক্রিয় মোবাইল সিগন্যাল ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে পাওয়া যাচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধারকারীদের দাবি, সম্ভাব্য কোনো প্রাণ বাঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ প্রশাসন।
গত বুধবার দুপুরে, আচমকাই ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ ওই বিশাল শেড। মুহূর্তের মধ্যে কংক্রিট, লোহা এবং নির্মাণসামগ্রীর নীচে চাপা পড়ে যান বহু শ্রমিক। দুর্ঘটনার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। উদ্ধার হওয়া প্রত্যেক আহত শ্রমিককে দ্রুত এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালেও ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে আরও পাঁচ জনকে উদ্ধার করা হয়। তবে উদ্ধারকারী দলের আশঙ্কা, ভেঙে পড়া কাঠামোর নীচে এখনো কয়েক জন আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের খুঁজে বের করতে সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক অনুসন্ধান প্রযুক্তি ও বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
শুক্রবার উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে ভারতীয় রেলও। এনডিআরএফ-এর অনুরোধে রেলের বিশেষজ্ঞ কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিশাল আকারের বেঁকে যাওয়া ইস্পাতের বিম ও লোহার কাঠামো কেটে সরানোর কাজে হাত লাগিয়েছেন। উদ্ধারকারীদের মতে, এই পাক খাওয়া স্টিলের কাঠামোই ধ্বংসস্তূপের ভিতরে পৌঁছনোর পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এদিকে দুর্ঘটনার তদন্তেও গতি এসেছে। গুদাম নির্মাণের বরাত পাওয়া প্রধান ঠিকাদার আসগর হুসেন বুধবারের দুর্ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকেই তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশের দাবি, পোর্ট ট্রাস্টের কাছ থেকে গুদাম তৈরির জন্য জমিটি লিজ নিয়েছিলেন শম্ভুনাথ বেহেরা। দুর্ঘটনার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুধু তিনিই নন, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গুদামটি কী কারণে ভেঙে পড়ল, নির্মাণে কোনও গাফিলতি বা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারীরা নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, অনুমোদন, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর গুণমান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর একের পর এক উঠে আসছে হৃদয়বিদারক তথ্য। মৃতদের তালিকায় রয়েছে সাহিল সর্দার নামে ১৭ বছরের এক কিশোরের নাম। সে ওই নির্মীয়মাণ শেডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত না। সেখানে কর্মরত ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতেই বুধবার প্রথমবার কাকদ্বীপ থেকে কলকাতায় এসেছিল সাহিল। পরিবারের আশা ছিল, শহর ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরবে ছেলেটি। কিন্তু তাঁর প্রথম কলকাতা সফরই শেষ হয়ে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। আর ফেরা হল না তার। একই রকম বেদনার ছাপ কাটোয়ার গাজীপুরেও। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দা রোহিত চৌধুরী (২০)। নির্মীয়মাণ শেডের ধ্বংসস্তূপ থেকেই উদ্ধার হয়েছে তাঁর দেহ। মাত্র দেড় মাস আগে ওই নির্মাণ সংস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন রোহিত। সংসারের হাল ধরতে রোজগারের আশায় বাড়ি ছেড়েছিলেন। কিন্তু জীবিকার সন্ধানে কলকাতায় এসে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হল নিথর দেহ হয়ে। গাজীপুরের চৌধুরীপাড়ায় তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা এলাকায়। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা।
❤ Support Us








