Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা
  • ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬

২০ বছর পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি, তরুণতম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথপাঠ তারেক রহমানের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
২০ বছর পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি, তরুণতম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথপাঠ তারেক রহমানের

দীর্ঘ আঠারো মাসের অন্তর্বর্তী শাসনের অবসান। অশান্তি, বিক্ষোভ, টালমাটাল পরিস্থিতি পেরিয়ে নতুন সূচনা পদ্মাপাড়ে। বিকেলের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে, ঢাকার শেরে বাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাজানো মঞ্চে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। প্রচলিত রেওয়াজ ভেঙে বঙ্গভবনের বাইরে, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে শপথ নিলেন বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করালেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ‘বেগম যুগ’-এর অবসান, ৩৪ বছর পর বাংলাদেশ আবার এক জন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেল, যিনি বয়সে পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপ্রধানদের চেয়ে অনেকখানি তরুণ। প্রথমবার সাংসদ হয়েই আগামীর দায়িত্বভার তুলে নিলেন তিনি, জানান দিলেন, ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়…’।  মন্ত্রীসভাতেও তরুণ তুর্কীদের জায়গা মিলল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যত ‘ভূমিধস’ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রায় দু-দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরল মেজর জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়ার দল। ২০০১ থেকে ২০০৬, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শেষ বার সরকারে ছিল দলটি। তার পর কেটে গিয়েছে ২০ বছর। এ বার দলের চেয়ারপারসনের পুত্র নিজেই প্রধানমন্ত্রী। লক্ষণীয়, তারেক রহমান এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম ভোটেই জয়, এবং তরুণতম নেতা হিসাবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব— বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা।

মঙ্গলবার, সকাল দশটায় শুরু হয় নতুন সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক কার্যকলাপ। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। দুপুর গড়িয়ে বিকেলে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ। শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে গোটা সংসদ এলাকা ছিল কঠোর নিরাপত্তায় মোড়া। শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদল নয়, আঞ্চলিক কূটনীতিরও বার্তা মিলেছে এ দিন। উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক শীর্ষ নেতা ও প্রতিনিধি ঢাকা পৌঁছন বিশেষ বিমানে। ভারতের তরফে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে ঢাকায় নামেন। তাঁকে স্বাগত জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সচিব মহম্মদ নজরুল ইসলাম। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিসরি। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, পাকিস্তানের পরিকল্পনা ও উন্নয়নমন্ত্রী আহসান ইকবাল, সকলেই উপস্থিত। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা এবং শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমমন্ত্রী ড. নলিন্দা জয়তিসাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। নতুন পালাবদলে আঞ্চলিক আগ্রহ যে প্রবল, তা স্পষ্ট।

তারেক রহমানের শপথ পাঠের আগে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস। আর সেই ভাষণের মাধ্যমে শেষ হয়েছে এক ক্রান্তিকালীন অধ্যায়। সব ঠিক থাকলে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বসতে পারে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন। সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দপ্তর বণ্টনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি হওয়ার কথা। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা ছিল তুঙ্গে। বিশেষ করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ঘিরে বিতর্কের আবহে। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর দেশ ছাড়েন হাসিনা, বর্তমানে তিনি দিল্লিতে আছেন বলে দাবি। গত দেড় বছর ধরে তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়ে দিল্লির উপর চাপ বাড়িয়েছিল ইউনূস প্রশাসন। সে আবহে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, হাসিনার বিচার চাওয়া হবে, কিন্তু তাঁর প্রত্যর্পণ না-হলেও ভারত-বাংলাদেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। গঙ্গা জল বন্টন, ফারাক্কা বাঁধ, সীমান্ত সমস্যা—সবই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোবে। আমেরিকা-চিন সম্পর্কের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, মতভেদ থাকলেও কূটনৈতিক সহযোগিতা থেমে থাকে না।

খালেদাপুত্রের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা আকারে বেশ বড়ো। প্রধানমন্ত্রী-সহ ৫০ জন। ২৫ পূর্ণমন্ত্রী, ২৪ প্রতিমন্ত্রী এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় অন্তর্ভুক্ত সদস্য। মন্ত্রীদের মধ্যে ১৭ জন নতুন মুখ, প্রতিমন্ত্রীদের প্রায় সবাই প্রথমবার দায়িত্ব পেয়েছেন। তিন জন মহিলা স্থান পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়— এক জন পূর্ণমন্ত্রী, দু-জন প্রতিমন্ত্রী। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন এমন ব্যক্তিকেও মন্ত্রিসভায় নেওয়া যায়; সেই বিধানেই টেকনোক্র্যাট কোটায় অন্তর্ভুক্তি। গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বণ্টনও তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় পেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অর্থ ও পরিকল্পনা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হাতে। স্বরাষ্ট্রে সালাহউদ্দিন আহমদ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দায়িত্বে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পেয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, আইন, গৃহায়ন, সড়ক পরিবহন, প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন ও পুরনো মুখের মিশ্রণ।

নতুন সংসদদের বৈশিষ্ট্য আরও একটি কারণে নজরকাড়া। মোট ২৯৭ সদস্যের মধ্যে অন্তত ২০৯ জন প্রথমবার নির্বাচিত। বিএনপির ২০৯ আসনের মধ্যে ১৩২ জনই নতুন। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের ৬৮ জনের মধ্যে ৫৯ জনই নতুন মুখ। এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন; ছোটো ছোটো দলগুলির প্রতিনিধিরাও প্রায় সকলেই প্রথমবারের সাংসদ। তবে নারী সদস্য মাত্র ৭ জন, যা সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাসের তুলনায় অনেকটাই কম। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও প্রথমবার এমপি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিয়ে জোটের মধ্যে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত শপথ সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপি সাংসদরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি, এই অবস্থান ঘিরে আলোচনাও কম হয়নি।

উল্লেখ্য, তারেক রহমানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রাপথও কম নাটকীয় নয়। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার, ১৮ মাস কারাবাস, ২০০৮-এ মুক্তি পেয়ে লন্ডনে কার্যত নির্বাসন জীবন। দীর্ঘ সতেরো বছর পরে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার চরম পর্যায়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা। এ বার নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭—দুটি আসনেই জয়। আর তার পর সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর আসনে। এদিন, ঢাকার দক্ষিণ প্লাজার শপথ অনুষ্ঠানে ভিড় চোখে পড়বার মতো। করতালি, শপথের পাঠের আড়ালে ছড়িয়েছে আমজনতার প্রত্যাশার স্বপ্ন, আর বিএনপির চ্যালেঞ্জের ভার। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কূটনৈতিক ভারসাম্য, নতুন মুখে ভরা সংসদের কার্যকারিতা, সব মিলিয়ে তারেকের সামনে কঠিন পরীক্ষা। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!