Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ২০, ২০২৬

‘সিজিপি’-র সংসদ অভিযানে দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা বলয়, যন্তর মন্তরে লাঠিচার্জের অভিযোগ। শর্ত মানলে অনশন প্রত্যাহার, বার্তা সোনম ওয়াংচুকের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘সিজিপি’-র সংসদ অভিযানে দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা বলয়, যন্তর মন্তরে লাঠিচার্জের অভিযোগ। শর্ত মানলে অনশন প্রত্যাহার, বার্তা সোনম ওয়াংচুকের

সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাজধানী দিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ। এক দিকে সংসদ চত্বরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা,  অন্যদিকে হাজার হাজার ছাত্র-যুবের বিক্ষোভে উত্তাল যন্তর মন্তর। সোমবার, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ডাকে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি ঘিরে সকাল থেকেই উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও রাজধানীতে ভিড় জমান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ‘সিজিপি’ সমর্থক ও আমজনতা।

প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সকাল থেকে যন্তর মন্তরে জমায়েত শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সংসদমুখী একাধিক রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলে দিল্লি পুলিশ। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করে বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। জনপথ, পটেল চক, রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট এবং সেবা তীর্থ— রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মেট্রো স্টেশনও নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। মধ্য দিল্লির কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যেই মান্ডি হাউস মেট্রো স্টেশন থেকে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে মিছিল শুরু করেন শতাধিক ছাত্র-যুব। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা ছিলেন। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে তাঁরা এগোতে শুরু করলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, মিছিল থামাতে পুলিশ লাঠি ও ব্যাটন ব্যবহার করে। যদিও কত জন আহত বা আটক হয়েছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

তবে লাঠিচার্জের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। পুলিশের দাবি, কিছু সংবাদমাধ্যমে ‘বিক্ষিপ্ত হিংসা’ বা আটক করার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা সঠিক নয়। পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভ সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে সামাল দেওয়া হচ্ছে। গুজবে কান না দিয়ে শান্তি ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নাগরিকদের সহযোগিতার আবেদনও জানানো হয়েছে। বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন আম আদমি পার্টির প্রথম সারির নেতা আতিশি, সঞ্জয় সিং এবং মনীশ সিসোদিয়া। রবিবারই সিসোদিয়া দেশবাসীকে আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে দেশের যুবসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনে যোগ দেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। তিনি আন্দোলনকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য যেন শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার সংস্কারের দাবি থেকেই বিচ্যুত না হয়। তাঁর কথায়, দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে শিক্ষা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তাই আন্দোলনের কেন্দ্রে সেই বিষয়টিকেই রাখতে হবে।

এ দিনই ২৩ দিনের অনির্দিষ্টকালের অনশন প্রত্যাহার করেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তিন কর্মী— নেহা, মনীশ এবং আমিন। বিরোধী সাংসদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদলের অনুরোধে তাঁরা অনশন ভাঙেন। প্রতিনিধিদলের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে তাঁদের দাবিগুলি জোরালো ভাবে উত্থাপন করা হবে এবং সংসদের ভিতরে ও বাইরে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এদিকে, ‘সিজিপি’-র মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, সরকার যদি আলোচনায় আগ্রহী হয়, তা হলে সংগঠনও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ অনেক দেরিতে এসেছে এবং এখনও কোনও স্পষ্ট বার্তা মেলেনি। তাঁর দাবি, ‘এখন সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে।’

এ দিনের বিক্ষোভের আবহ সংসদের ভিতরেও প্রতিফলিত হয়। বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুতেই বিরোধী সদস্যদের স্লোগান ও হইচইয়ের জেরে লোকসভা ও রাজ্যসভার কার্যক্রম দুপুর ১২টা পর্যন্ত মুলতবি রাখতে হয়। বিরোধীরা এ দিনের অধিবেশনে ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁস, অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদান তছরুপের অভিযোগ এবং ইথানল মিশ্রণ সংক্রান্ত বিতর্ক-সহ একাধিক ইস্যুতে কেন্দ্রকে কোণঠাসা করার প্রস্তুতি নেয়। পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেস ও শিবসেনা (উদ্ধব গোষ্ঠী) থেকে একাধিক সাংসদের দলবদলের পর সংসদের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণও এ অধিবেশনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিশেষ নজর থাকবে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের একীভূত হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তার উপরও।

অন্যদিকে, ‘সংসদ চলো’ অভিযানের আগে পরিবেশকর্মী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক দীর্ঘ অনশন প্রত্যাহারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর নির্ধারিত তিনটি শর্তের মধ্যে যে কোনও একটি পূরণ করা হলেই তিনি অনশন ভাঙবেন। সোমবার সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর দিনই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।  এর আগে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলী আঙ্গমো জানিয়েছিলেন, যদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও সাম্প্রতিক ব্যর্থতা নিয়ে সংসদে আলোচনা এবং সরকারের দায়বদ্ধতার আশ্বাস দেন, তাহলে সোনম অনশন প্রত্যাহারের বিষয়ে বিবেচনা করতে পারেন।

এবার সোনম ওয়াংচুক নিজেই হাতে লেখা একটি খোলা চিঠি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। সেখানে বন্ধু ও সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, অনেকেই জানতে চাইছেন তিনি কবে অনশন ভাঙবেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ২০ জুলাই অনশন প্রত্যাহার করতে পারেন, যদি সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতার দায় স্বীকার করা হয়।

চিঠিতে তিনি অনশন প্রত্যাহারের জন্য তিনটি শর্ত তুলে ধরেছেন। সেগুলি হলো—

  • সরকার শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতার দায় স্বীকার করবে।
  • তিনি এবং ‘সিজেপি’ নেতৃত্ব সংসদে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সাংসদদের কাছ থেকে বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনার আশ্বাস পাবেন।
  • যদি শারীরিক বা অন্য কোনো কারণে তিনি সংসদে যেতে না পারেন, তাহলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদরা হাসপাতালে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে সংসদে বিষয়টি তোলার আশ্বাস দেবেন।

ওয়াংচুক জানিয়েছেন, এই তিনটি শর্তের মধ্যে যে কোনো একটি পূরণ হলেই তিনি অনশন ভাঙতে প্রস্তুত।

শনিবার দিল্লি পুলিশ যন্তরমন্তর থেকে তাঁকে সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে। যদিও হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাঁকে খাদ্য গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছেন, তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলী আঙ্গমোর দাবি, সোনম এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের তরল খাবারও গ্রহণ করেননি এবং অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই সোনমকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতাল থেকে তাঁর পছন্দের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবিতে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমো। রবিবার দিল্লি হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে অস্বীকার করার পর সোমবার তিনি ডিভিশন বেঞ্চে নতুন আবেদন জানিয়ে জরুরি শুনানির আর্জি করেছেন। সূত্রের খবর, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ মামলার শুনানি হতে পারে। আবেদনে গীতাঞ্জলি অ্যাংমো দাবি করেছেন, সফদরজং হাসপাতাল ওয়াংচুকের চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত নয়। তাঁর অভিযোগ, ওয়াংচুককে নিজের পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি হাসপাতালে তাঁকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে, ফলে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া, মেডিক্যাল টেস্ট করানো বা চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে সোমবারই নির্ধারিত রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি। এই অভিযানে সাধারণ মানুষকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ওয়াংচুক। তিনি বলেছেন, তাঁর শারীরিক অবস্থা যেমনই থাকুক না কেন, ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির পরেও তাঁর অনশন চলবে। কেবলমাত্র ঘোষিত শর্তগুলির যে কোনো একটি পূরণ হলেই তিনি অনশন প্রত্যাহার করবেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!