Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • জুলাই ৩১, ২০২৩

শাসকের আইন ভেঙে মানবতার আইন জারির বার্তা দিল “সম্বিত”-এর নাটক “তাসের (স্ব) দেশ”

শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
শাসকের আইন ভেঙে মানবতার আইন জারির বার্তা দিল “সম্বিত”-এর নাটক “তাসের (স্ব) দেশ”

রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ অবলম্বনে সম্বিত তাসের (স্ব) দেশ সম্প্রতি উপস্থাপন করল কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাসের দেশের সৌরভে সিক্ত সম্বিত-এর নাটক তাসের (স্ব) দেশ এই সময়ের সমাজ, দেশ, রাজনীতির একটা স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে এবং তার থেকে বেরিয়ে আসার ছবিটাও তাঁরা আঁকতে পেরেছেন তাঁদের নাটকে।

রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশে শেষ পর্যন্ত নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে যেমন মানবতার জয় ধ্বনিত হয়েছিল, তাসের (স্ব) দেশ নাটকেও সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে।

শাসকের আইন না আইনের শাসন? বিশ্ব, দেশ, রাজ্য পরিচালনায় আজ শাসক তার আইনেই মানুষকে বেঁধে ফেলতে চায়। ঠিক করে দিতে চায় মানুষ কি খাবে, কি পরবে,কি বলবে। আসলে আমরা কেউ নিরপেক্ষ নই। আমি নিরপেক্ষ,এই কথাটা বলা মানেই আমি পক্ষপাতদুষ্ট। তাই শাসকও নিরপেক্ষ হয় না, হতে পারে না, এটাই ছিল রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশের প্রতিপাদ্য। তাই সেই জায়গা থেকে শাসক বা ক্ষমতাশালী সব সময় চাইবেই, তাঁকে সন্তুষ্ট করে সমাজের মানুষ চলবে “নিয়ম মতে”, এটাই রাজতন্ত্রের, একনায়কতন্ত্রের মূল কথা। এই ধারণাকে ভাঙা হয়েছে তাসের দেশে মানবতার জয়গান, “ভাঙনের জয়গান”, -এর মাধ্যমে।

তাসের (স্ব) দেশও তেমনই এই শাসকের আইন নির্ভর, শাসকের নিয়মের বিরুদ্ধে মানবতার, যা কিছু স্বাভাবিক, সঠিক, তার জয়গান গেয়েছে তাদের নাটকে। কোথাও স্পষ্ট করে কোরও রাজনৈতিক বার্তা এখানে দেওয়া হয়নি, অথচ রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশের মতো রূপক ধর্মী বক্তব্যে তাসের (স্ব) দেশ এখনকার সমাজের, শাসন ব্যবস্থার ভিতে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে তাদের নাটকে। পরাজিত হয়েছে শাসকের আইন, উড্ডীন হয়েছে মানবতার ধ্বজা।

রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশে রাজার গোলাম বলছেন, “টেক্কাকুমারী,বিবিসুন্দরী, মনে রেখ, আমার হাতে সম্পাদকীয় স্তম্ভ।” তখন সকলে সমস্বরে বলে উঠছেন, “কৃষ্টি,কৃষ্টি, তাসদ্বীপের কৃষ্টি। বাঁচাও সেই কৃষ্টি।” তখন গোলাম বলছে, “জারি করো বাধ্যতামূলক আইন।” রাজা বলছেন, “অর্থাৎ?” গোলাম বলছেন, “কানমলা, মোচড়ের আইন।” রাজা তখন বলছেন, “বুঝেছি রানীবিবি, তোমার কী মত? বাধ্যতামূলক আইন এবার তবে চালাই?তখন রানীবিবি বলছেন, ” বাধ্যতামূলক আইন অন্দরমহলে আমরাও চালিয়ে থাকি- দেখব, কে দেয় কাকে নির্বাসন।” রানীবিবি একসময় রাজাকে বললেন, “আমাদের তাসের দেশের ভাষায় শিকলকে বলে অলঙ্কার, এভাষা ভোলার সময় এসেছে।” তখন রুইতন বলছে, “হ্যাঁ বিবিরানী, এদের ভাষায় জেল খানাকে বলে শ্বশুরবাড়ি।” রাজা তখন ধমকে বলছেন, “চুপ।”
রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশের সঙ্গে অনেক মিল এখনজার “রাজা” অর্থাৎ সরকারের, এটাই তাসের (স্ব) দেশ নাটকের প্রতিপাদ্য। তবে তাসের দেশের রাজার মতো আমাদের সমাজের অত্যাচারী রাজাও এক দিন হার মানবেই। তখন রানীবিবির মতো, রাজার বিদূষকরাও বলে উঠবে, “মানুষ হতে পারব আমরা।” তখনই শাসকের আইন ভেঙে আজকের গোটা বিশ্বের, আমার দেশের, সমাজের অবহেলিত, অত্যাচারিত, নিপিড়ীত মানুষকে পাশে নিয়ে তাসের দেশের রানীবিবির মতো একদিন রাজাকে একা করে হয়তো আবার গোটা সমাজটাই গেয়ে উঠবে, “বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, ভাঙো।” সত্যিই সেই দিন কী আসছে? এই বার্তাই পাওয়া গেল সম্বিত-এর নাটক “তাসের (স্ব) দেশ” নাটকে।
তাসের দেশ হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত একটি বাংলা নাটক। এটি ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজেরই লেখা “একটা আষাঢ়ে গল্প” নামক ছোটোগল্পের কাহিনী অবলম্বনে এই নাটকটি রচনা করেন। এই নাটকটিতে বৃটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের মুুক্তির জন্যে রবীন্দ্রনাথ একজন মুক্তিদূতের আহ্বান করেছেন।
সেই মুক্তিদূত হিসাবে নেতাজিকে এই নাটকটি উৎসর্গ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

“উৎসর্গ
কল্যাণীয় শ্রীমান সুভাষচন্দ্র,
স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার
পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে
তোমার নামে ‘তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম।
শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাঘ ১৩৪৫।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!