- বি। দে । শ
- জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলে গুণতে হবে বাড়তি শুল্ক, হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের। কী অবস্থান ভারতের ?
ইরানে ক্রমশ তীব্র হচ্ছে সরকার-বিরোধী আন্দোলন । বিক্ষোভকারীদের ধরপাকড়, গুলি চালানোর অভিযোগ এবং অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই বড় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প । ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একঘরে করতে এবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন দেশগুলির উপর ২৫ শতাংশ ট্যারিফ চাপানোর ঘোষণা করেছেন তিনি। এই সিদ্ধান্তে ভারতও যে প্রভাবিত হতে পারে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরানের সঙ্গে যেসব দেশ বাণিজ্য করবে, তারা যদি আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়, তবে তাদের ২৫ শতাংশ ট্যারিফ গুনতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং এতে কোনও পরিবর্তন হবে না বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। যদিও এখনও পর্যন্ত এই ঘোষণার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি ইরান।
ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চিন । ফলে এই ট্যারিফের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বেজিংয়ের উপরই পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও তুরস্কের মতো দেশগুলিও এর প্রভাব এড়াতে পারবে না বলেই মত কূটনৈতিক মহলের একাংশের।
তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত ও ইরানের মধ্যে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা । এর মধ্যে ভারত ইরানে ১.২৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং সেখান থেকে ০.৪৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে । ভারত ইরানে যে প্রধান পণ্য রপ্তানি করে তার মধ্যে রয়েছে বাসমতি চাল, চা, চিনি, তাজা ফল, ওষুধ, কোমল পানীয় (শরবত বাদে), কাজু, চিনাবাদাম, হাড়বিহীন মাংস, ডাল এবং অন্যান্য পণ্য ।
২০২২–২৩ অর্থবছরে ভারত ও ইরানের মধ্যে মোট বাণিজ্য ছিল ২.৩৩ বিলিয়ন ডলার । আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২% বেশি । এই সময়কালে, ভারত ইরানের কাছে ১.৬৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য বিক্রি করেছে এবং ইরান থেকে ৬৭২.১২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য কিনেছে । ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের মধ্যে, দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্য ছিল ৬৬০.৭০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৫৫.৬৪ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ছিল ২০৫.১৪ মিলিয়ন ডলার। তবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায়, এই সময়ের মধ্যে মোট বাণিজ্য প্রায় ২৩% হ্রাস পেয়েছে।
ভারত মূলত ইরান থেকে রাসায়নিক দ্রব্য ও ফল আমদানি করে । পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৫১২.৯২ মিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক দ্রব্য এবং ৩১১.৬০ মিলিয়ন ডলারের ফল আমদানি করা হয়। পাশাপাশি ৮৬.৪৮ মিলিয়ন ডলারের জ্বালানি, তেল ও ডিস্টিলেশন পণ্যও আসে ইরান থেকে। অন্যদিকে ভারত ইরানে চাল, ওষুধ, কফি, চা, মশলা এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতি রপ্তানি করে।
কৌশলগত দিক থেকে ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর প্রকল্প। আগামী দশ বছরের জন্য এই বন্দর উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। পাকিস্তানকে বাইপাস করে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সরাসরি যোগাযোগের একমাত্র কার্যকর পথ এই চাবাহার বন্দর। তাই অনেকের মতে, ট্রাম্পের ট্যারিফ ঘোষণায় এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত বছরের জুনেই ভারতের উপর ২৫ শতাংশ ট্যারিফ চাপিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের উপর মোট ৫০ শতাংশ ট্যারিফ কার্যকর রয়েছে। এর উপর নতুন করে ইরান-বাণিজ্য সংক্রান্ত ট্যারিফ চাপলে ভারত-আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনাধীন দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তিও এতে ধাক্কা খেতে পারে।
এই ট্যারিফ ঘোষণার পেছনে রয়েছে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। আর্থিক সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন সরকার-বিরোধী রূপ নিয়েছে। সরকারি অফিস ও ভবনে আগুন লাগানো হয়েছে, আর পাল্টা পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে। বিক্ষোভ দমনে গুলি চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতেই ইরানে এয়ার স্ট্রাইকের হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে তিনি বলেন, “ইরান স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, যা আগে কখনও ভাবা যায়নি। আমেরিকা তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।” এর পাল্টা জবাবে আয়াতোল্লা খামেনেই কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “নিজের চরকায় তেল দিন।”
হুঁশিয়ারি ও পাল্টা হুঁশিয়ারির মধ্যেই এই ট্যারিফ ঘোষণা। যদিও একই সঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তুতিও চলছে। তাঁর দাবি, “ইরান ফোন করেছিল। তারা আলোচনা করতে চায়।” তবে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আলোচনার আগেই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে মার্কিন কৌশলের এই নতুন অধ্যায় শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ভারতের মতো দেশের কূটনীতি ও বাণিজ্যকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে ।
❤ Support Us








