- খাস-কলম স | হ | জ | পা | ঠ
- এপ্রিল ১৯, ২০২৫
রঙ শুনতেন ভ্যানগঘ আর শব্দে রঙ দেখেন কার্টুনিস্ট অহসান ! সিনেস্থেসিয়া; মানব মস্তিস্কের দুরূহ রহস্য
মানব মস্তিষ্ক যেমন জটিল, তেমনই তার রহস্য । সে হঠাৎ তৈরি করে অজানা, অচেনার ভিন্ন জগত । প্রতিদিনের জীবনে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি নির্দ্বিধায়, অবচেতনের অমোঘ নির্দেশে ব্যবহার করি । আমরা কুকুরের ডাক শুনতে পাই, তেমনি আপেল খেলে তার স্বাদ পাই । কিন্তু যদি সেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে আপনার চোখে নীল রঙ ফুটে ওঠে ? কিংবা আপেলের সু-স্বাদ গ্রহণ করে আপনার কানে বেজে ওঠে ততোধিক ‘সুস্বাদু’ সূক্ষ্ম ‘জি শার্প’ নোট ? অবাক লাগছে ? এ ধরনের ঘটনাই একজন সিনেস্থেটিক ব্যক্তির কাছে সাধারণ ব্যাপার । সিনেস্থেসিয়া এমনই মস্তিষ্কের রহস্যময় জটিল অবস্থা । ইন্দ্রিয়ের সংমিশ্রণ ঘটা রহস্যময় অঞ্চল । মার্কিন শব্দ সিনেস্থেসিয়ার অর্থ–’একত্র অনুভূতি ।’ যখন একজন সিনেস্থেটের এক ইন্দ্রিয় উদ্দীপ্ত, তখন অপর ইন্দ্রিয়ে ফুটে ওঠে তার প্রতিক্রিয়া । এ অবস্থার নানারকম রকমফের রয়েছে । ক্রোমেস্থেসিয়া; শব্দ শোনার সঙ্গে রঙ দেখার সম্পর্ক, গ্রাফিম-কালার সিনেস্থেসিয়া অক্ষর, সংখ্যা, শব্দ এবং প্রতীকের সঙ্গে রঙের সম্পর্ক ইত্যাদি । প্রকারভেদে আর ভিন্নতার বৈচিত্রে এ আকাশ অসীম, অফুরন্ত ।
এক সময় মনে করা হতো সিনেস্থেসিয়া কেবলমাত্র অতিরিক্ত কল্পনাশক্তির ফসল । কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সিনেস্থেটদের মস্তিষ্কের কাজ করার ধরনের সঙ্গে ‘সাধারণ’ মস্তিষ্কের কাজ করবার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে । আমাদের প্রতিটি ইন্দ্রিয় মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে যুক্ত । চৌম্বকীয় রেজোন্যান্স ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যাঁদের ক্রোমেস্থেসিয়া রয়েছে, তাঁরা শব্দ শোনার সময় মস্তিষ্কের দৃশ্য-সংক্রান্ত অংশে প্রচুর কার্যকলাপ দেখান — যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে । পাশাপাশি, সিনেস্থেটদের মস্তিষ্কে ‘গ্রে ম্যাটার’ — মস্তিষ্কের যা বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে বেশি পরিমাণে থাকে বলেও জানা গেছে । তাহলে এই সিনেস্থেসিয়ার কারণ কী ? কেন কেউ কেউ ধ্রুপদী সঙ্গীত শুনে কলার স্বাদ পান ? কিংবা ছবিতে রঙ দেখে শুনতে পান নাগরিক কোলাহল কিংবা পাহাড়-জঙ্গলের নৈঃস্বৈর্গিক নিস্তব্ধতা !
হুমায়ূন আহমেদ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লীলাবতীর মৃত্যু’–তে লিখেছেন, ‘আহসান হাবীব শব্দের রং দেখতে পায় । সে বলে যখনই কোনো শব্দ হয় তখনই সে সেই শব্দের রং দেখে । কখনো নীল, কখনো লাল, সবুজ ও কমলা । মাঝেমধ্যে এমন সব রং দেখে যার অস্তিত্ব বাস্তব পৃথিবীতে নেই ।’ শিল্পী, লেখক ও সুরকারদের মাঝে এক অনন্য সৃষ্টিশীলতার উপাদান হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়েছে । নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান, কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সঙ্গীতশিল্পী লর্ডে’র মতো বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি এই অনুভূতির মাধ্যমে তাঁদের শিল্পকর্মে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন
প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে তাঁদের জেনেটিক কোড বা বংশ পরম্পরার ইতিহাসে। বহু সংখ্যক সিনেস্থেট জানিয়েছেন, তাঁদের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও একই অবস্থার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন । যার ফলে মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন এটি বংশগত বৈশিষ্ট্য হতে পারে । অপর একটি তত্ত্ব, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়, তা হলো, সিনেস্থেসিয়া ‘প্রুনিং’ নামক জিনের গোলমালের ফলে হতে পারে । শৈশবে, বেড়ে ওঠবার সময়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় সংযোগগুলো ‘ছেঁটে’ ফেলে । কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কোনো গণ্ডগোল হলে মস্তিষ্কে ‘ক্রস-ওয়্যারিং’ ঘটে। তখনই এক ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে অন্য ইন্দ্রিয়ের সংযোগ গড়ে ওঠে ।
১৮৮১ সালের নববর্ষের সন্ধ্যা । মাত্র ২৯ বছর বয়সে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তখন হেগ শহরে থাকেন । তাঁর ভাই, পৃষ্ঠপোষক চিত্রব্যবসায়ী থিওকে একটি চিঠি লিখলেন । সেই লেখায় চিত্রকর তাঁর ভাইকে লিথোগ্রাফ নিয়ে তাঁর কাজের অগ্রগতির কথা জানাচ্ছেন । তিনি লেখেন, ‘কিছুদিন আগে তুমি ঠিকই বলেছিলে, প্রত্যেক রঙ-শিল্পীরই নিজস্ব বিশেষ রঙের স্কেল থাকে । কালো ও সাদার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই, এগুলোও শেষ পর্যন্ত রঙই, তাই না ?
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪ শতাংশ মানুষ বিরল ও চিত্তাকর্ষক সিনেস্থেসিয়ার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন । বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই, প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব এই দুর্লভ অভিজ্ঞতার অধিকারী। হুমায়ূন আহমেদ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লীলাবতীর মৃত্যু’–তে লিখেছেন, ‘আহসান হাবীব শব্দের রং দেখতে পায় । সে বলে যখনই কোনো শব্দ হয় তখনই সে সেই শব্দের রং দেখে । কখনো নীল, কখনো লাল, সবুজ ও কমলা । মাঝেমধ্যে এমন সব রং দেখে যার অস্তিত্ব বাস্তব পৃথিবীতে নেই ।’ শিল্পী, লেখক ও সুরকারদের মাঝে এক অনন্য সৃষ্টিশীলতার উপাদান হিসেবে এটি চিহ্নিত হয়েছে । নোবেল বিজয়ী মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান, কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ, সঙ্গীতশিল্পী লর্ডে’র মতো বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি এই অনুভূতির মাধ্যমে তাঁদের শিল্পকর্মে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন ।
একজন পদার্থবিদের কাছে ‘রং’ বা ‘সুর’-এর মতো ধারণাগুলি একেবারেই মামুলি বিষয় হতে পারে, যেগুলি হয়তো তিনি সংখ্যার মাধ্যমে সহজেই ধরতে পারেন । কিন্তু কখনো কখনো তা অসাধারণ অবাক বিস্ময়ের হয়ে ওঠে । সোমবার মানে লাল রঙের একটি পড়ন্ত মাইনর থার্ড । সি-মেজর হলো উজ্জ্বল, সদয় ও হলুদ রঙের । কিংবা বিড়ালের গায়ে আপেল সেদ্ধর গন্ধ ! অক্ষর, সংখ্যা, মানুষ… রিচার্ড ফাইনম্যানের জগতে সব কিছুরই একটা রং, গন্ধ ও শব্দ ছিল । এবার অন্য ছবি দেখা যাক । ১৮৮১ সালের নববর্ষের সন্ধ্যা । মাত্র ২৯ বছর বয়সে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তখন হেগ শহরে থাকেন । তাঁর ভাই, পৃষ্ঠপোষক চিত্রব্যবসায়ী থিওকে একটি চিঠি লিখলেন । সেই লেখায় চিত্রকর তাঁর ভাইকে লিথোগ্রাফ নিয়ে তাঁর কাজের অগ্রগতির কথা জানাচ্ছেন । তিনি লেখেন, ‘কিছুদিন আগে তুমি ঠিকই বলেছিলে, প্রত্যেক রঙ-শিল্পীরই নিজস্ব বিশেষ রঙের স্কেল থাকে । কালো ও সাদার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই, এগুলোও শেষ পর্যন্ত রঙই, তাই না ? একজন শিল্পীকে নিশ্চিতভাবেই আলো-ছায়ার রহস্যময়তা ভেদ করতেই হবে । কিছু শিল্পীর আঁকার হাতে এক ধরনের স্নায়বিকতা থাকে, যা তাঁদের সেই পদ্ধতি যেন বেহালার করুণ সুরের শব্দ শোনা দেয়, যেমন লেমুদ, দমিয়ে, লাঁসঁ । আবার অন্যরা, যেমন গাভার্নি আর বোদমার, তাঁদের কাজ যেন পিয়ানোর সুরের মতো শোনায় । তুমি কি এটাও অনুভব করো ? মিলের কাজ তো যেন এক বিশাল প্রাচীন অর্গান ।’ এই ব্যতিক্রমী চিঠির অংশের সূত্র ধরে বলা যেতে পারে, এটা এক ধরনের ‘টেকনিক-টিম্ব্র সিনেস্থেসিয়া’র লক্ষণ — যেখানে কোনো শিল্পীর আঁকার ধরণ, শ্রাব্য অভিজ্ঞতার রূপ পায় ।
অনেকদিন ধরেই অনেকে সন্দেহ করে আসছিলেন ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ-এর সিনেস্থেসিয়া ছিল । আবার অনেকে মনে করেন তাঁর অ্যাসপারগার সিনড্রোম ছিল, যেটা প্রায়শই সংবেদনশীলতার মিশ্রণের ফলে ঘটে থাকে । কিন্তু গঘের সঙ্গে সিনেস্থেসিয়ার সম্পর্কের কথা সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে, যখন পুয়ের্তো রিকোর সিনেস্থেট ব্লগার রেনে ডি. কিনোনেস অনলাইনে শিল্পীর চিঠিগুলি পড়তে পড়তে এই অংশটি আবিষ্কার করেন । রেনে জানান, তিনি ঘটনাক্রমেই এই চিঠিটি খুঁজে পান, পড়তে পড়তে তাঁর মনে হয় ভ্যান গঘ তাঁর মতো সিনেস্থেট হতে পারেন । যদিও এই সন্দেহ তাঁর আগে থেকেই ছিল। তিনি বলেন ‘গঘ তাঁর ভাই থিওকে লেখাটা চিঠিতে কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন, আমার আগ্রহের বিষয় সেটাই ছিল । কারণ তিনি তাঁর ভাইকে একশোরও বেশি চিঠি লিখেছিলেন । আমার পড়া তৃতীয় চিঠিতেই ওই অনুচ্ছেদটি ছিল, যেটা পড়ে হঠাৎ যেন ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠল আমার মনে ।’
সিনেস্থেসিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার দেখা গেছে, সিনেস্থেটদের স্মৃতিশক্তি প্রবল । রঙ-সম্পর্কিত সিনেস্থেসিয়া যাঁদের আছে, তাঁরা খুব কাছাকাছি রঙগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন বেশি দক্ষভাবে । আবার যাঁদের স্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত সিনেস্থেসিয়া রয়েছে, তাঁদের স্পর্শের অনুভূতি তুলনায় বেশি তীক্ষ্ণ । আরো বিস্ময়করভাবে, শিল্পী ও কবিদের মধ্যে এই অবস্থাটি বেশি দেখা যায় । অর্থাৎ সংবেদনশীলতা যে সব ব্যক্তিদের বেশি অথবা সৃজনশীল কাজকর্মের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত তাঁরা সিনেস্থেট হয়ে উঠতে পারেন । ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সিনেস্থেসিয়া মস্তিষ্কের স্নায়ুবিক জটিল রোগ নিরাময়ে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যেসব রোগে মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ইতিমধ্যে দেখা গেছে, বিভিন্ন ওষুধ খেয়ে, ইন্দ্রিয় কন্ট্রোল করে বা হিপনোসিসের মাধ্যমে সিনেস্থেসিয়া সৃষ্টি করা সম্ভব । এ বিষয়ে আরো গবেষণা আমাদের মস্তিষ্কের দুর্বল সংযোগগুলো শক্তিশালী করতে, ক্ষীণ স্মৃতিশক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে । খুলে যাবে আবিষ্কারের আনকোরা দরজা !
❤ Support Us








