- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জানুয়ারি ১৪, ২০২৬
রবীন্দ্র-ভুবনের আকাশে নক্ষত্র পতন ! প্রয়াত প্রবাদপ্রতিম সঙ্গীতশিল্পী অর্ঘ্য সেন, শোকপ্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর
খসে পড়ল উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয় জুড়ে গাঁথা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অতুলনীয় কণ্ঠশিল্পী অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বাংলা সাংস্কৃতিক মহলে। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন বর্ষীয়ান শিল্পী। ১৪ জানুয়ারি, বুধবার সকালেই তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। অর্ঘ্য সেন কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন রবীন্দ্রগানের ভাব ও গভীরতার এক প্রতীক। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান যেন শুধু শোনা নয়, অনুভব করা যেত। ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’, ‘আমার মাথা নত করে দাও’— এরকম অজস্র গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে নিঃশব্দ ঢেউ তোলে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্বস্তি ও আত্মিক স্পর্শের আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসংগীতের ধারায় এক বিশাল শূন্যস্থান তৈরি হলো।
১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্ম অর্ঘ্য সেনের। বাবা হেমেন্দ্রকুমার সেন ছিলেন কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক, মা বিন্দুদেবীর সংগীতচর্চা ছিল ছোট অর্ঘ্যর জীবনের প্রথম প্রেরণা। ফরিদপুরে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর কলকাতায় আসেন। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে ছাত্রজীবন থেকেই সংগীতের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ। প্রথমে রেডিওর মাধ্যমে পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীতশিক্ষা শুনে অনুপ্রাণিত হন, পরে অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু সত্যিকারের মোড় আসে দেবব্রত বিশ্বাসের সংস্পর্শে এসে। তাঁর সান্নিধ্যে অর্ঘ্য সেন রবীন্দ্রসংগীতের ভাব-বিন্যাস ও উচ্চারণে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।
অর্ঘ্য সেনের রবীন্দ্রসংগীত চর্চা কেবল কণ্ঠের সৌন্দর্য নয়, এটি ছিল ভাবগাম্ভীর্যের অন্বেষণ। তাঁর শিল্পমাধুর্য স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘সংগীত নাটক অকাদেমি’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। পরবর্তীতে ‘টেগোর ফেলো’ সম্মানও পান তিনি। তবে এসব পুরস্কারই হয়তো তাঁর প্রকৃত অবদানের তুলনায় সামান্য; শ্রোতারা এখনো তাঁর গানের মধ্য দিয়ে শান্তি ও আত্মিক স্পর্শ খুঁজে পান। সংগীতের বাইরে অর্ঘ্য সেন ছিলেন নিপুণ হস্তশিল্পী। সেলাই, ক্রাফট বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজেও তাঁর দক্ষতা ছিল অনন্য। জীবনব্যাপী শিল্পে বিচরণ, নিখুঁত ও সহজাতভাবে প্রেরণা দেয়ার ক্ষমতা— এইসব গুণ তাঁকে অনন্য, অক্ষয় করেছে। শিল্পীর প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, ‘বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও অসংখ্য অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।’ রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে অর্ঘ্য সেন শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি এক অনুভূতির নাম। তাঁর রেখে যাওয়া গান, তাঁর শিল্পমাধুর্য এবং রবীন্দ্রভাবকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি অজেয়, অমর।
❤ Support Us








