- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১, ২০২৫
জাভেদ আখতারের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক, শেষ মুহূর্তে স্থগিত পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অ্যাকাডেমির অনুষ্ঠান
রাজ্য সরকারের উদ্যোগে, পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অ্যাকডেমি আয়োজিত ৪ দিনের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উৎসব ‘উর্দু ইন হিন্দি সিনেমা’ শুরু হওয়ার কথা ছিল গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে। কলকাতার এক নামী অডিটোরিয়ামে আয়োজন ছিল সম্পূর্ণ, মঞ্চ প্রস্তুত, আমন্ত্রিত অতিথিরাও শহরে এসে পৌঁছেছেন কেউ কেউ। কিন্তু ঠিক তার আগের দিন, শনিবার দুপুরে পশ্চিমবঙ্গ উর্দু অ্যাকাডেমির তরফে ঘোষণা করা হয়— ‘অনিবার্য কারণে’ উৎসব অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। আর এ সিদ্ধান্ত ঘিরেই আপাতত প্রাক্-পুজোর কলকাতার সংস্কৃতিমুখী নাগরিক মহলে প্রবল চাঞ্চল্য।
সূত্রের খবর, উৎসবের প্রধান আকর্ষণ জাতীয় মুশায়রায় কবি-গীতিকার জাভেদ আখতারকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়েই বিতর্কের সূত্রপাত। একাধিক ইসলামি সংগঠন— বিশেষত জমিয়তে উলামা-ই হিন্দ ও ওয়াহিয়াইন ফাউন্ডেশন— তাঁর অংশগ্রহণে আপত্তি তোলে। অভিযোগ, জাভেদ আখতার একাধিক বার ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে ‘অশালীন মন্তব্য’ করেছেন। তিনি নিজে নাস্তিক, এবং ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতে ভালোবাসেন, তাই এমন একজন ‘ঈমানবিরোধী’কে মঞ্চে জায়গা দেওয়া যাবে না।
জানা গিয়েছে, শুক্রবার বিকেলে একাধিক মসজিদের ইমাম, মুফতি ও আলেমদের একটি প্রতিনিধি দল উর্দু অ্যাকাডেমির কর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। আলোচনায় ছিলেন কলকাতা জেলা জমিয়তে উলামা-ই হিন্দ-এর সম্পাদক জিল্লুর রহমান আরিফ, মুফতি খ. রশিদ, মাওলানা জিয়াউদ্দিন, মুফতি আবদুল মুহিত প্রমুখ। উর্দু অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বৈঠকে ছিলেন ভাইস চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল সাংসদ নাদিমুল হক, সদস্য এস এম হায়দার, অধ্যাপক দবির আহমেদ-সহ একাধিক কর্তা। বৈঠকে সুরাহা মেলেনি। তীব্র চাপের মুখে পড়ে রাজ্য সরকারের অধীনস্ত উর্দু অ্যাকাডেমি শেষ পর্যন্ত উৎসব স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। অ্যাকাডেমির সচিব নুজহাত জয়নাব এক বিবৃতিতে জানান, ‘অপরিহার্য কারণে ৩১ অগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠান স্থগিত করা হচ্ছে।’ যদিও, স্থগিত করার নির্দিষ্ট কারণ তিনি বলেননি, কিন্তু রাজনৈতিক মহলে জল্পনা, ধর্মীয় আপত্তির কারণেই এমন সিদ্ধান্ত।
স্থগিত হওয়া উৎসবের মূল ভাবনা ছিল— হিন্দি সিনেমায় উর্দু ভাষার অবদান তুলে ধরা। জাভেদ আখতার তো বটেই, অংশ নেওয়ার কথা ছিল পরিচালক মুজাফফর আলিরও। অনেকে ইতিমধ্যেই কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। শহরজুড়ে লাগানো হয়েছে ব্যানার, পোস্টার। দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে আমন্ত্রণপত্র বিলিও হয়ে গিয়েছে। সে আয়োজন কার্যত ভেঙে চুরমার। বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন উর্দু অ্যাকাডেমির পরিচালন পর্ষদের সদস্য এবং আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক গজালা ইয়াসমিন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বাংলার মানুষের সামনে হিন্দি সিনেমায় উর্দুর ভূমিকাকে সামনে আনতে চেয়েছিলাম। খুব দুঃখ হচ্ছে। উর্দু তো কোনো ধর্মীয় ভাষা নয়, ভারতীয় সংস্কৃতিরই অঙ্গ। ভাষাকে ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আটকে দেওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।’
কিন্তু আলেম সমাজের বক্তব্য, জাভেদ আখতারের বহু বক্তব্যে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা, ‘কেউ নাস্তিক হতেই পারেন। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের অপমান করলে, তা আর নিছক ব্যক্তিগত মত নয়।’ সংবাদমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জিল্লুর রহমান আরিফ বলেন, ‘জাভেদ আখতার ঈশ্বরবিশ্বাসী নন, তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করেন। তাঁর উপস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না।’ ওয়াহিয়াইন ফাউন্ডেশনের তরফে জাভেদ আখতারকে এক খোলা বিতর্ক সভায় অংশগ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে। বিতর্কের শিরোনাম— ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই?’ মুফতি শামাঈল নাদভীর বক্তব্য, ‘আপনি যদি যুক্তির মাধ্যমে সব ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেন, আমরা যুক্তিতেই জবাব দেব। আসুন, আলোচনা হোক।’
উল্লেখ্য, জাভেদ আখতার নিজেকে বহুবার ‘নাস্তিক’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। বিভিন্ন টিভি সাক্ষাৎকারে, ভাষণে তিনি সব ধর্ম নিয়েই সমালোচনা করেছেন। ২০২০ সালে রিচার্ড ডকিন্স অ্যাওয়ার্ড পান যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে কথা বলার জন্য। তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত। কলকাতা শহরে তার অনুষ্ঠান বাতিল ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে— শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে একজন শিল্পীর ওপর এই ‘নিষেধাজ্ঞা’ কি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পক্ষে হুমকি নয়? একাংশের মতে, রাজ্য সরকার ভোটের মুখে ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ২০২৬-এর ভোটকে সামনে রেখে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক রক্ষা করতে চাইছে তৃণমূল। বিজেপি ইতিমধ্যেই এ ঘটনার রাজনৈতিক ফায়দা নিতে শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘তৃণমূল সরকার মৌলবাদীদের চাপের কাছে মাথা নত করেছে। এ ভাবেই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে।’ যদিও সরকারি মহল বিষয়টিতে মুখ খুলতে নারাজ। উৎসব স্থগিত হলেও ভবিষ্যতে তা অন্য দিন করা হবে কিনা, সে নিয়েও কোনো স্পষ্ট বার্তা মেলেনি। কেবল উর্দু একাডেমির এক সদস্য অধ্যাপক দবীর আহমেদ জানিয়েছেন, ‘ অনুষ্ঠানের পরবর্তী দিনক্ষণ পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।’
❤ Support Us








