Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • মে ১৮, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ৫

দাদার কথায় হিরণের ভয় লাগে, রাজনীতির উসকানিতে শহর জুড়ে ক্রমশই নাকি হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে ।নইড়্যা ছেড়ে সে এদেশে এসেছে জীবনকে নতুন করে গড়ে নেবে বলে। তার তিনটি ছেলেমেয়ে বড়োই ছোটো। দেশে শান্তি না-থাকলে, ওরাই বা ভালোভাবে বড়ো হবে কী করে !...তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ৫

অলঙ্করণ : দেব সরকার

 

 
গীতা স্কুলে যাবে। তার দুই বিনুনি বেঁধে দিচ্ছে হিরণ। লাল ফিতে দিয়ে ফুল বানিয়ে দিচ্ছে বিনুনিতে। গীতাকে স্কুলে পাঠিয়েই হাসপাতালে বেরোবে হিরণ। সঙ্গে গোবিন্দকে নিয়ে নেবে। ওকে কার কাছে রেখে যাবে ? পাশের কোয়ার্টার্সে থাকেন রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। বয়স্ক মানুষ। হাসপাতালের কম্পাউন্ডার। ওর স্ত্রীর কাছে প্রথম কয়েকদিন গোবিন্দকে রেখে হাসপাতলে যাচ্ছিল হিরণ। কিন্তু ছেলেটা এতই দস্যি হয়েছে মাসিমাকে নাজেহাল করেছে। রামকৃষ্ণ বাবু কিংবা মাসিমা কেউই অবশ্য বলেননি গোবিন্দকে রাখতে পারবেন না, কিন্তু হিরণই ওদের ওপর চাপ দেয় না আর। সঙ্গে করে গোবিন্দকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। আরেকজন নার্স রেবাদি। শিফটিং ডিউটিতে অবশ্য রেবাদির সঙ্গে খুবই অল্প সময়ের জন্য দেখা হয় গোবিন্দর। ওইটুকু সময়ই রেবাদি গোবিন্দর সঙ্গে খেলে। ডিউটির মধ্যেই ফাঁকা সময়ে গোবিন্দকে একটু আধটু পড়ায় হিরণ । নাইট ডিউটি থাকলে অবশ্য গোবিন্দকে নিয়ে আসে না । গীতা ভাইকে নিয়ে ঘরেই থাকে। বলে যে, ভয় লাগে ওর একা একা থাকতে। কিন্তু হিরণ গীতাকে বুঝিয়েছে যে, এটাই ওদের জীবন। একা একা থাকা অভ্যেস করে নিতে হবে। সত্য থাকলে হয়তো গীতার এতখানি একলা লাগত না। সত্যকে শেষমেশ দাদা রেখে দিয়েছে। বলেছে, কলকাতায় যতই গোলমাল লাগুক ভালো পড়াশুনা করতে হলে সত্যকে কলকাতায় থাকতে হবে। মাসে নিয়ম করে একটা চিঠি লেখে সত্য। প্রতিবারই জানায় যে, ওর মামাবাড়িতে থাকতে একদম ভালো লাগছে না। মামি ভালো ব্যবহার করে না। হিরণ বুঝতে পারে কতটা কষ্ট পায় সত্য মাকে ছেড়ে দূরে থাকতে। হিরণেরও খুবই দুশ্চিন্তা হয় সত্যকে নিয়ে। ও কষ্ট পায় সত্যর মতোই। কিন্তু দাঁতের দাঁত চেপে সহ্য করে কষ্ট। পরে ছেলেটাও বুঝবে যে, এই কষ্টটুকু বিফলে যাবে না ।
 

কাঁথি শহর থেকে সমুদ্র বেশ অনেকটা দূরে। কিন্তু এই অঞ্চলটা এতখানিই নিস্তব্ধ হয়ে যায় যে, সমুদ্রের শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। অবশ্য বড়োই ক্ষীণ সেই শব্দ। কিন্তু বোঝা যায় সমুদ্র গর্জন করছে দূরে। সেই গর্জন শুনতে শুনতে ওর পদ্মার কথা মনে পড়ে। মানুষটার কথা মনে পড়ে। নদী নাকি সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। ওর শরীরটাও তো মিশে যেত মানুষটার শরীরের সঙ্গে। নদী আর সমুদ্রের মিলন হত। সেইসব মুহূর্তের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ে এখন হিরণের

 
বর্ধমান মেডিকেল কলেজে যতদিন ট্রেনিং নিচ্ছিল হিরণ, তিন ভাইবোনই ছিল মামাবাড়িতে। সেজন্য ও খুব মনোযোগ দিয়ে ট্রেনিংটা করেছিল। ওই সময় হিরণ যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল। মানুষটা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে আশ্রিতার মতো থাকতে থাকতে ওর আত্মবিশ্বাস একেবারে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। ছিদাম ওকে সারাক্ষণ ভরসা দিত ঠিক, কিন্তু ওর মনে হত ওর পক্ষে জীবনে বোধহয় আর কিছুই করা সম্ভব নয়। বর্ধমানের ট্রেনিংটা ওকে বোঝায় যে, কিছু কিছু ব্যাপারে ও অসম্ভব দক্ষ। এখন পেশেন্টরাও মেনে নেয় সে কথা। ইনজেকশন দেওয়ার হাত ভীষণ ভালো হয়েছে হিরণের। পেশেন্টরা বলে, ও ইনজেকশন দিলে নাকি পিঁপড়ে কামড়ানোর চেয়েও কম ব্যথা লাগে। ট্রেনিংয়ের সময় রাত্রিবেলাগুলো অবশ্য ওর খুব মনখারাপ করত। গীতা, সত্য, গোবিন্দর কথা মনে পড়ত। ছোট্ট গোবিন্দকে ওই সময়টায় ভালোই সামলেছিল বউদি। প্রতি সপ্তাহে ও দাদার বাড়িতে যেতেও পারত না। যখন যেত তিন ছেলেমেয়ের মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত। সবচেয়ে খুশি হত গোবিন্দ।
 
 ট্রেনিংয়ের সময়টায় কিন্তু একবারও মানুষটার কথা হিরণের মনে পড়ত না। কেন কে জানে ! কিন্তু এখন মনে পড়ে। প্রতি রাতে মনে পড়ে। কাঁথির হাসপাতালের কোয়াটার্সগুলো রাত্রিবেলা একেবারে নিঝুম হয়ে যায়। তখন মনে হয় যেন পাড়াগাঁর কোনো এক ছোট্ট পাড়ায় ওরা বাস করে। কাঁথি শহর থেকে সমুদ্র বেশ অনেকটা দূরে। কিন্তু এই অঞ্চলটা এতখানিই নিস্তব্ধ হয়ে যায় যে, সমুদ্রের শব্দও শুনতে পাওয়া যায়। অবশ্য বড়োই ক্ষীণ সেই শব্দ। কিন্তু বোঝা যায় সমুদ্র গর্জন করছে দূরে। সেই গর্জন শুনতে শুনতে ওর পদ্মার কথা মনে পড়ে। মানুষটার কথা মনে পড়ে। নদী নাকি সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। ওর শরীরটাও তো মিশে যেত মানুষটার শরীরের সঙ্গে। নদী আর সমুদ্রের মিলন হত। সেইসব মুহূর্তের কথা বড্ড বেশি মনে পড়ে এখন হিরণের। ওর বয়স মাত্র পঁচিশ। শরীর যে এখনও বড্ড বেশি জেগে আছে, সে কথা হিরণ বুঝতে পারে। ও ভাবে, আর কিচ্ছু যদি মনে নাও পড়ে, মানুষটার কি ওর শরীরের কথাও মনে পড়ে না ? ও ভাবে, কোথায় আছে মানুষটা ? ঘুরে বেড়াচ্ছে পদ্মার পাড়ে পাড়ে ? আগে একবার নাকি ফকিরদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল কোথায় ! এবারও কি তেমনই হয়েছে ? বাউল ফকিরদের দলে ভিড়ে গেছে মানুষটা? তাদের নাকি সাধনসঙ্গিনী থাকে। সেইরকম কোনো সাধনসঙ্গিনী কি পেয়ে গেছে মানুষটা ? তাই কি আর ওর কথা মনেই পড়ে না ?
 
শাঁখা-পলা-নোয়া এখনও খোলেনি হিরণ। বন্ধ করেনি সিঁদুর পরাও। এইসব চিহ্নগুলো একলা মেয়েমানুষের রক্ষাকবচ। বাংলায় এখনও এয়ো স্ত্রীদের দিকে বজ্জাতদের চোখ পড়ে না। পুরুষমানুষের ছোঁকছোঁককে এড়িয়ে থাকা যায় অনেকটা। তবে শাখা-সিঁদুর পরে থাকার ঝক্কিও পোয়াতে হয় বৈকি হিরণকে। ভট্‌চাজ মাসিমা প্রায়ই মানুষটার কথা জিজ্ঞেস করেন। সেদিনই বলছিলেন, তোমার বর কেমন লোক বাপু ? এতদিন হয়ে গেল, একটিবারও এল না ! কী এমন কাজ ও দেশে ! এইসব প্রশ্নের সামনে নিজেকে খুব অসহায় লাগে হিরণের। একের পর এক মিথ্যে কথা বলতে হয়।
 
জায়গাটার সঙ্গে মানিয়ে নিতেও খানিকটা মুশকিলই হচ্ছে হিরণের। কাঁথি মেদিনীপুর জেলায়। এই অঞ্চলটার জলহাওয়া গোয়ালন্দ বা নইড়্যার মতো নয়। ওদিকটা ছিল গাছপালা আর জলের দেশ। এদিকটা তেমন নয়। বেশ একটু রুক্ষ রুক্ষ ভাব। জেলাটার পশ্চিম দিক নাকি আরও রুখাসুখা। যদিও সেদিকটায় এখনও যাওয়া হয়নি হিরণের। এখানকার মানুষের ভাষা বুঝতেও মাঝে মাঝে তার বেশ অসুবিধে হয়। ভট্‌চাজ মাসিমা যে-ভাষায় কথা বলেন, তা তবু বোঝা যায়। কিন্তু কারও কারও কথা ও বুঝতেই পারে না প্রায়। পেশেন্টদের কাউকে কাউকে নিয়ে ও বড়োই সমস্যায় পড়ে। রামকৃষ্ণবাবু মাঝে মাঝে ওর বিপদতারণ হয়ে ওঠেন। উনি ওকে বলেছেন যে, এখানকার মানুষজনের বাংলার মধ্যে ওড়িয়া ভাষা খানিকটা ঢুকে আছে। এখানকার বাঙালিদের অনেকেরই আত্মীয়স্বজন আছে উড়িষ্যায়। কাঁথি থেকে উড়িষ্যা তো সত্যিই খুব দূরে নয়।
 

দেশভাগের কথা মাঝে মাঝে এখন হিরণ ভাবে। দেশ যদি ভাগ হয়ে যায় তাহলে বাবা-মায়ের কী হবে, বোনেদের সঙ্গে কী আর কখনও দেখা হবে ওর ? মানুষটাকে ফিরে পাওয়ার যে ক্ষীণ আশা এখনও ওর বুকের মধ্যে বেঁচে আছে, চিরকালের জন্য কি মুছে যাবে সেই আশাটুকু ? পদ্মা পেরিয়ে অতদূর থেকে এপারে কি এসেছে মানুষটা আদৌ ? এই অঞ্চলে তো হিন্দুদের বসতিই বেশি। দেশ ভাগ হলে মেদিনীপুর নিশ্চয়ই ভারতবর্ষেই থাকবে

 
গীতাকে স্কুলে পাঠিয়ে গোবিন্দকে নিয়ে বেরোতে যাবে হিরণ, এমন সময় বামাপদ এসে হাজির হল। বামাপদ হল কাঁথি হাসপাতালের ছিদাম। সব এলাকাতেই বোধহয় এক-একজন ছিদাম থাকে। এক-একজন নিঃস্বার্থ, পরোপকারী মানুষ। ছিদামের মতোই বামাপদ কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী। গান্ধীবুড়ি মাতঙ্গিনী হাজরার অন্ধ ভক্ত বামাপদ। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় যে-মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চালানোতে মাতঙ্গিনী হাজরা মারা গিয়েছিলেন, মহিলাদের সেই মিছিলটি আয়োজনের দায়িত্বে আরও অনেকের সঙ্গে বামাপদও ছিল। এলাকার মানুষজনের নানা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সব সময় বামাপদ হাজির। বিশেষ করে, হাসপাতালের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের যোগাযোগের সেতুটাই অনেকখানি বামাপদ। তার একটি ছোটো মুদিখানার দোকান আছে। অধিকাংশ দিন অবশ্য সে দোকান বামাপদ বন্ধ করেই রাখে। ম্যালেরিয়ার মতো নানা রকম রোগজ্বালা হলে কী কী ওষুধ খাওয়া উচিত, সেসব নিয়ে হাসপাতাল থেকে মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষদের নানা তথ্য দেওয়ার কাজ করা হয়। এইসব কাজেও মূল ভূমিকা থাকে বামাপদরই। গীতাকে স্কুলের জন্য তৈরি করতে গিয়ে আজ একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল হিরণের। এরই মধ্যে বামাপদ কলেরার পেশেন্ট নিয়ে গিয়ে হাজির হয়েছে। রেবাদি বাড়ি যাবার জন্য ছটফট করছে। কিন্তু হিরণ হাসপাতালে না পৌঁছানো পর্যন্ত রেবাদি বাড়ি যেতে পারবে না। ডাক্তারবাবুও এখনও এসে পৌঁছননি। তাই বামাপদ এসেছে হিরণকে ডাকতে যাতে ও তাড়াতাড়ি গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছয়।
 
ছিদামের মতোই বামাপদ নানা বিষয় নিয়ে গল্প করে হিরণের সঙ্গে। হাসপাতাল যেতে যেতে ও যেমন জানাল, খুব বড়ো ভোট হবে দেশে। আর বেশিদিন দেরি নেই। কংগ্রেসের সঙ্গে জোর লড়াই হবে মুসলিম লিগের। মুসলিম লিগ এই ভোটে জিতে গেলে, দেশভাগ নাকি কেউ আটকাতে পারবে না।
 
দেশভাগের কথা মাঝে মাঝে এখন হিরণ ভাবে। দেশ যদি ভাগ হয়ে যায় তাহলে বাবা-মায়ের কী হবে, বোনেদের সঙ্গে কী আর কখনও দেখা হবে ওর ? মানুষটাকে ফিরে পাওয়ার যে ক্ষীণ আশা এখনও ওর বুকের মধ্যে বেঁচে আছে, চিরকালের জন্য কি মুছে যাবে সেই আশাটুকু ? পদ্মা পেরিয়ে অতদূর থেকে এপারে কি এসেছে মানুষটা আদৌ ? এই অঞ্চলে তো হিন্দুদের বসতিই বেশি। দেশ ভাগ হলে মেদিনীপুর নিশ্চয়ই ভারতবর্ষেই থাকবে। পাকিস্তানের পড়বে না। তখন কি মানুষটা আর হিরণ তাহলে দুটো আলাদা দেশের বাসিন্দা হয়ে যাবে ? গোবিন্দর হাত ধরে বামাপদর কথা শুনতে শুনতে হাসপাতালে দিকে হাঁটতে হাঁটতে এই সবই ভাবছিল হিরণবালা। রাজনীতিতে ওর কোনোদিনই আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এখন ওর মনে হচ্ছে এই ভোটে মুসলিম লিগ যদি হারে তাহলে খুব ভালো হয়। দেশ ভাগ হোক ও একেবারেই চায় না।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ৪

হিরণবালা । পর্ব ৪


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!