Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৩, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ১৫

গীতার বিয়ের ঠিক হয়েছে । মেয়ের বিয়ে দেওয়ার তো চাট্টিখানি কথা নয় । বিয়ের এখনও তিন মাস বাকি কিন্তু এর মধ্যে নিমন্ত্রিতদের তালিকাও বানিয়ে ফেলেছে । কার্ডটা লিখতে গিয়ে দিদির কথা মনে পড়ল ওর । ঢাকায় দিদি জানতেও পারবে না গীতার বিয়ে হচ্ছে । এইসব ভাবতে ভাবতেই অনেকদিন পরে হঠাৎ হিরণের মনে হল দেশ শুধু ভাগ হয়নি, জমি শুধু ভাগ হয়নি, পরিবারগুলোও টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, যা আর কোনোদিনই একসঙ্গে করে জুড়ে দেওয়া যাবে না । কাচের গ্লাস ভেঙে ফেলার মতো করেই দেশটাকে ভেঙে দিয়েছে নেতারা...তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ১৫

 
২৫

 
কুপার্স ক্যাম্পের ঠিকানায় লাবণ্যর নামে পাঠানো চিঠি ফিরে এল। বেশ চিন্তায় পড়ল হিরণ। হল কি লাবণ্যদের ? ক্যাম্প থেকে নানা জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে উদ্বাস্তুদের। হিরণ শুনেছে উড়িষ্যা-অন্ধপ্রদেশ সংলগ্ন দণ্ডকারণ্য বলে একটা জায়গায় উদ্বাস্তু পরিবারগুলির অনেকগুলিকেই  পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নাকি না খেতে পেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। এক ফোঁটা জল নেই গোটা অঞ্চলে। চাষাবাদের তো প্রশ্নই ওঠে না। ওপারের মানুষেরা সব চাষ করে আর নদী-নালায় মাছ ধরে বড়ো হয়। পাণ্ডববর্জিত দণ্ডকারণ্যে তারা বেঁচে থাকবে কী করে! চিঠি ফিরে আসায় হিরণের ভয় হতে থাকে লাবণ্যদেরও দণ্ডকারণ্যে পাঠিয়ে দেয়নি তো? 
 
কলকাতায় দাদাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করতে এসে অবশ্য সঠিক খবরটা পেল হিরণ। লাবণ্যরা চলে গেছে অশোকনগরে। আসলে ওখানে বর্ডার পেরিয়ে বনগাঁ লাগোয়া সমস্ত জায়গায় ঘরবাড়ি বানাচ্ছে উদ্বাস্তুরা। কলকাতার কলোনিগুলোতে আর জায়গা নেই। সেজন্য এবার বর্ডারের ধারেপাশের অঞ্চলগুলোতেই একের পর এক গড়ে উঠছে উদ্বাস্তু কলোনি। বনগাঁর কাছাকাছি অশোকনগরের জমি পেয়ে তাই চলে গেছে লাবণ্যরা। যাওয়ার আগে দাদাদের বাড়িতে এসে দেখা করে গেছে। হিরণ ঠিক করল অশোকনগরে গিয়ে লাবণ্যর সঙ্গে দেখা করবে। গীতার বিয়ে হবে আর লাবণ্যরা থাকবে না তা কি হয় ! 
 
অশোকনগর ছোটো জায়গা কিন্তু রেল যোগাযোগ ভালো। সবচেয়ে বড়ো কথা এখানকার জল হওয়া অনেকটা ওদের দেশের মতো। বাঁকুড়া বা মেদিনীপুরের থেকে একদম আলাদা। কাঁথির থেকেও আলাদা। এই জায়গা অনেক সবুজ, শ্যামল। ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমেই হিরণের মন ভালো হয়ে গেল। দাদাকে যে বর্ণনা দিয়েছিল লাবণ্য সেই বর্ণনা মিলিয়ে মিলিয়ে ওদের বাড়ি খুঁজে পেতে একটু দেরি হল। সঙ্গে অবশ্য সত্য আছে। কলকাতায় থেকে থেকে ও অনেক চটপটে হয়ে গেছে। একে ওকে জিজ্ঞেস করে ওই খুঁজে পেল মাসির বাড়ির ঠিকানা।
 

প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন একটু এগোতেই হিরণ দেখতে পেল দু-পাশে মিশমিশে কালো অন্ধকার। ওর ভয় হল এটাই লাবণ্যর জীবন হয়ে উঠবে না তো ? ওর বোনের জীবন কি হয়ে যাবে ঘন, কালো অন্ধকারে ঢাকা এক জীবন !

 
হিরণকে দেখে লাবণ্য খুবই খুশি হল। ওর মেয়ে দু-টিও খুব খুশি। যথারীতি হিরণ ওদের জন্য দামি চকোলেট কিনে এনেছিল। সেসব উপহার পেয়ে ওরা খুব খুশি। ওদের পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় এগারোটা বেজে গিয়েছিল। হিরণ দেখল এত বেলাতেও তক্তপোশের ওপর শুয়ে শুয়ে অনন্তলাল ঘুমোচ্ছে। অনন্তলাল কি এখানেও কোনো কাজ কারবার করার চেষ্টাই করছে না ! হিরণ একটু অবাকই হল। রান্নাঘরে ছিল লাবণ্য। হিরণকে দেখে ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। কী যে ভালো লাগল হিরণের লাবণ্যর স্পর্শ। হঠাৎ করে হিরণের মনে হল লাবণ্যের শরীরে ও যেন মায়ের গন্ধ পাচ্ছে। 
 
গীতার বিয়ে হওয়ার খবর পেয়ে তো লাবণ্য খুব খুশি। বলল, তোর তো একখান বড়ো কাম হইয়া গ্যালো রে। আমার তো সংসারখানই এখনও দাঁড়াইল না। 
 
হিরণ বলল, এখানে আইস্যাও কি অনন্ত কামকাজ কিছু করতাসে না ? 
 
মুখ নীচু করে লাবণ্য বলল, তুই তো ওরে চিনস। কবে থেকে বলতাসে, একখান মুদিখানার দোকান দিবে। দ্যায় আর না। 
 
হিরণ বলল, সকাল থাইক্যা করেটা কী ?
 
লাবণ্য বলল, সকালে উইঠ্যাই চায়ের দোকানে যায় চা খাইতে। দু-ঘণ্টা আড্ডা মাইর‍্যা ফেরে। তারপর ঘুমায়। উইঠ্যা খায়। তারপর আবার ঘুমায়। বিকেল থাইক্যা রাত পর্যন্ত আড্ডা মাইর‍্যা ফেরে। 
 
শুনে হিরণের প্রচণ্ড রাগ হল। ওর মানুষটাও কাজকর্ম একেবারে করতে চাইত না। দোকানে বসতে চাইত না। কিন্তু এভাবে অলস ভাবে শুয়ে শুয়ে ঘুমাত না। আর গুণও ছিল অনেক। চমৎকার গান গাইত সে। অনন্তলালের এসব কোনো গুণই নেই। ও বুঝে গেছে সংসার চালাবে লাবণ্যই। কোনো দায় তাই নেওয়ার কোনো আগ্রহই ওর আর নেই। হিরণ লাবণ্যকে জিজ্ঞেস করল, তোগো তাহলে চলতাসে কী কইর‍্যা ? কী করতাছস তুই ? 
 
লাবণ্য বলল, সেলাইয়ের কাম করি। এই কলোনিতে একখান কো-অপারেটিভ হইসে। তারা কাম দেয়। 
 
হিরণ বলল, তাতে চইল্যা যায় তোর ? 
 
লাবণ্য বলল, চলে না তো। চালাইতে হয়। 
 
তারপর হঠাৎ গলা বেশ খানিকটা নীচু করে বলল, কাউরে কইস না। আরও একখান কাম করি। 
 
হিরণ বলল, কী ?
 
লাবণ্য বলল, ট্রেনে কইর‍্যা চালের বস্তা পাচার করি। 
 
এরপর লাবণ্য যা বলল তা শোনবার জন্য হিরণ একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ছোটোবেলায় যে মাঝরাতে বাথরুমে যেতে হলে ভয়ে ওকে ডেকে বলত, দিদি আমার লগে চল, সে আজ চোরাই চালের বস্তা ট্রেনের দুই কামরার মাঝে যে-লোহার পিস্টন থাকে, তার ওপরে বসিয়ে পাচার করছে। কী ভয়ংকর ঝুঁকি আছে এই কাজে ! একটু এদিক ওদিক হলেই প্রাণ চলে যাবে। 
 
হিরণ বলল, তোর ভয় লাগে না ? 
 
লাবণ্য বলল, প্রথম প্রথম লাগত আর লাগে না। অনেকে মিইল্যা যাই তো।
 
হিরণ বলল, পুলিশে ধইরলে কী হইব ? 
 
লাবণ্য বলল, পুলিশে ধরে না। ওরাও বুইঝ্যা গ্যাসে এই আমাগো জীবন। একটু আধটু ট্যাহা চায়, এই যা !
 
সারাটা দিন যে লাবণ্যর বাড়িতে ছিল হিরণ, অনন্তলাল ওর সঙ্গে সাকুল্যে দু-টি কথা বলেছে। লোকটাকে যেন আর সহ্য করতেই পারছে না হিরণ। ও নিজে অত্যন্ত কর্মঠ মানুষ। কাজ ছাড়া কেউ সারাদিন শুয়ে থাকতে পারে এ কথা ও ভাবতেই পারে না। শিয়ালদা ফেরার ট্রেনে উঠে যখন বসল হিরণ আর সত্য, তখন সন্ধে নেমে গেছে। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ট্রেন একটু এগোতেই হিরণ দেখতে পেল দু-পাশে মিশমিশে কালো অন্ধকার। ওর ভয় হল এটাই লাবণ্যর জীবন হয়ে উঠবে না তো ? ওর বোনের জীবন কি হয়ে যাবে ঘন, কালো অন্ধকারে ঢাকা এক জীবন !

 
২৬

 
গীতার বিয়ে যত কাছে এগিয়ে আসছে, ততই হিরণের কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। ভয়, আনন্দ, দুশ্চিন্তা মিশ্রিত এক অনুভূতি। খাতায় লিখে লিখে বিয়ের কাজগুলো একে একে করেছিল বলে সব কাজই প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও একটু ভয় লাগছে  হিরণের। মাঝে মাঝে খুব রাগও হচ্ছে মানুষটার ওপর। এই সময় একেবারে নিজের একটা কেউ পাশে থাকলে একটা ভরসা পেত হিরণ। সত্য অনেকখানি দায়িত্ব নিয়েছে। সুরেন গোঁসাই সাহায্য করেছে প্রচুর। এই লোকটার ওপরেই এক সময় কী রেগে যেত হিরণ! অথচ গীতার বিয়েটা এই লোকটার সাহায্য ছাড়া হতই না। ডাক্তার শিটও প্রায় অভিভাবকের ভূমিকাই নিয়েছেন। একদিন জিজ্ঞেসও করেছেন হিরণের টাকাপয়সা লাগবে কি না। সব ঠিকঠাকই আছে তবু হিরণের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। 
 

পানপাতার মতো মুখ নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ওর কন্যা। জন্মের পর থেকে ওর শরীরের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থেকেছে মেয়েটা। এরপর আর থাকবে না। ওরই শরীরের রক্তমাংস দিয়ে গড়া এই শরীর। ওর মেয়ের শরীর। সেই শরীরটাকে আর ও চোখের সামনে সারাক্ষণ দেখতে পাবে না। ভাবলেই বুকটা কেমন হু হু করছে হিরণের

 
এখন রাত্রি এগারোটা। গোবিন্দ ঘুমিয়ে কাদা। গীতাও ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্তত দেখে তাই মনে হচ্ছে। ওর পানপাতার মতো মুখের দিকে তাকিয়ে হিরণের কত কথা মনে পড়ে। গীতা ওর প্রথম সন্তান। শরীরে গীতার উপস্থিতি যখন ও প্রথম বুঝতে পেরেছিল কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল হিরণ। তখন ওর বয়সই বা কতটুকু। ভয় পেয়ে যাওয়ার কথাই তো। গীতা যে ওর শরীরের ভেতরে বেড়ে উঠছে, তা বুঝতে পারত হিরণ। ওর নড়াচড়া বুঝতে পারত। ওর লাত্থি দেওয়া বুঝতে পারত। তখন খালি ভয় পেত হিরণ। যতক্ষণ না আঁতুর ঘরে ও গীতার কান্না শুনতে পেয়েছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত ওর ওই ভয়টা যায়নি। গীতা যখন পেটে সে সময়ও মানুষটা ওর ঘনিষ্ঠ হতে চাইত। কিন্তু হিরণ কিছুতেই রাজি হত না। ওর মনে হত মানুষটার সঙ্গে ঘনিষ্ট হলে পাছে ওর পেটের মধ্যে যে-সন্তান আছে তার কোনো ক্ষতি হয়! মাঝে মাঝে এই নিয়ে মানুষটার সঙ্গে রাগারাগিও হয়ে যেত হিরণের। গীতার সঙ্গেও কি হিরণের রাগারাগি কম হয়েছে মানুষটাকে নিয়ে! তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে বাবাকে সবচেয়ে বেশিদিন কাছে পেয়েছিল গীতা। তাই এত সবকিছুর পরেও বাবার সম্বন্ধে একটিও বাজে কথা ও শুনতে চায়নি কখনও। গীতার সঙ্গে হিরণের যেটুকু ঝগড়া হয়েছে তা তো ওই মানুষটাকে নিয়েই। 
 
পানপাতার মতো মুখ নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ওর কন্যা। জন্মের পর থেকে ওর শরীরের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থেকেছে মেয়েটা। এরপর আর থাকবে না। ওরই শরীরের রক্তমাংস দিয়ে গড়া এই শরীর। ওর মেয়ের শরীর। সেই শরীরটাকে আর ও চোখের সামনে সারাক্ষণ দেখতে পাবে না। ভাবলেই বুকটা কেমন হু হু করছে হিরণের। সত্য তো প্রায় অনেকদিনই ঘরছাড়া। ও একটু নিজের মতোই থাকতে ভালোবাসে। গোবিন্দ হিরণের খুবই নেওটা কিন্তু ওর বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা অসংখ্য। ঘরে তার যত না মন বাইরে তার চেয়ে বেশি। দুই ছেলের সঙ্গে তাই প্রাণের কথা তেমন তো আর হত না হিরণের। সুখ-দুঃখের কথা, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা সবই তো ভাগ করত গীতার সঙ্গে। তাই গীতা আর এই বাড়িতে থাকবে না ভাবলেই কেমন একটা অদ্ভুত শূন্যতা ওকে গ্রাস করছে। একদিকে আনন্দ হচ্ছে শান্তি পাচ্ছে মনে এই ভেবে যে, একা একাই গীতাকে ও মানুষ করে ফেলল, বিয়েও ঠিক করে ফেলল। আবার ভয়ও পাচ্ছে এই ভেবে যে, গীতা চলে গেলে ওর জীবনে একটা বড়ো শূন্যস্থান তৈরি হবে। সেই শূন্যস্থান কি আর পূর্ণ হবে কখনও ? হিরণের মা বলত পুত্র সন্তানদের সঙ্গেই নাকি মায়েদের সম্পর্ক হয় সবচেয়ে ভালো। কথাটা হয়তো ভুল নয়। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে মায়ের যে-সম্পর্ক, তা এক অদ্ভুত সম্পর্ক। এর বোধহয় কোনো তুলনা হয় না। একে ব্যাখ্যা করা খুবই মুশকিল। সেজন্যই বোধহয় আর সাত দিন পরে গীতার বিয়ে হয়ে যাবে ভাবলেই হিরণের একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। মানুষটা যখন লালনের গান গাইত, তখন মাঝে মাঝে কোনো কোনো গানের কথা বুঝতে পারত না হিরণ। কিন্তু, ভালো লাগত। গীতার বিয়ে নিয়েও ওর এখন অনেকটা সেরকমই অবস্থা। কখন যে ঠিক কীরকম মনে হচ্ছে সবসময় পুরোটা বুঝে উঠতে পারছে না হিরণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওর মনে হচ্ছে ও খুশি। ওর ভালোই লাগছে।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..
 
আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১৪

হিরণবালা । পর্ব ১৪


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!