- বৈষয়িক
- জুন ১০, ২০২৬
ফলের রাজার শরীরে বিষ ! জাপানের পর নেপালেও নিষেধাজ্ঞা, চাপে রফতানি বাজার
ভারতীয় আমে মাত্রারিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার, অভিযোগ তুলে জাপানের পর এ বার প্রতিবেশী নেপালও ভারতীয় আম আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যার ফলে, দেশের ফল রফতানি শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী ‘কোয়ারান্টিন পরীক্ষা’য় ভারত থেকে আমদানি হওয়া আমের চালানে অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় বেশি রাসায়নিক কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি কাঠমান্ডুর। নেপালের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নির্দেশে কার্যকর হয়েছে এই নিষেধাজ্ঞা।
নেপালি প্রশাসন অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখছে না। তাদের দাবি, ভারতীয় আমের প্রবেশ বন্ধ হওয়ায় দেশীয় আমচাষিরা সুবিধা পেয়েছেন। স্থানীয় বাজারে নেপালে উৎপাদিত ফলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।নেপালের ভূমি ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও সমবায় মন্ত্রকের মুখপাত্র মনীশ কুমার পাল নেপালের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য রাইজিং নেপাল’-কে জানিয়েছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে ক্রেতারা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ফল খাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে বলেন্দ্র সরকারের এ অবস্থানের সঙ্গে একমত নন দেশের ফল ব্যবসায়ীদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, ভারতীয় আমের আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তার ফলে বাড়তে পারে ফলের দামও। যদিও নেপাল নিজেও আম উৎপাদনকারী দেশ, কিছু ক্ষেত্রে তারা রফতানিও করে, তবু দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এখনো মোট চাহিদা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। উপরন্তু নেপালি আমের মৌসুম মাত্র দু–মাস স্থায়ী হওয়ায় বছরের বাকি সময়ে বাজারে আমের জোগান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফল ব্যবসায়ীরা তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে আরও কঠোর ও আধুনিক ‘কোয়ারান্টিন ব্যবস্থা’ চালুর দাবি তুলেছেন। তাঁদের মতে, আমদানিকৃত ফলের গুণগত মান পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হলে একদিকে যেমন ভোক্তারা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে বাজারেও স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে।
নেপালের এহেন সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতীয় আম রফতানিকারকেরা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। গত মাসে জাপানও প্রায় দু–দশকের মধ্যে প্রথম বার ভারতের কেসর, আলফোনসো, ল্যাংড়া ও বাঙ্গানাপল্লি প্রজাতির আম আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জাপানের অভিযোগ, ভারতীয় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলিতে ‘ফিউমিগেশন’ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত একাধিক নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি। মার্চ মাসে জাপানের ‘কোয়ারান্টিন’ আধিকারিকদের একটি প্রতিনিধি দল উত্তরপ্রদেশের রেহমানপুরে পরিদর্শনে গিয়ে জীবাণুনাশক প্রয়োগ ও ‘ফিউমিগেশন’ প্রক্রিয়ায় একাধিক ত্রুটি শনাক্ত করে। তার পরই ‘ইয়োকোহামা প্ল্যান্ট প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন’ ঘোষণা করে, ২৫ মার্চ বা তার পরে ইস্যু হওয়া ভারতীয় পরিদর্শন শংসাপত্র বহনকারী আমের চালান আর গ্রহণ করা হবে না। প্রয়োজনীয় সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় আমের প্রবেশাধিকার বন্ধই থাকবে বলে জানানো হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৮৬ সালে ফলমাছির সংক্রমণের অভিযোগে জাপান ভারতীয় আম নিষিদ্ধ করেছিল। প্রায় ২০ বছর পরে ভারত প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করলে সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। নেপালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের উদ্বেগ সামনে এসেছে। অতিরিক্ত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় পর্যাপ্ত ‘কোয়ারান্টিন’ অবকাঠামোর অভাবের অভিযোগ তুলে ভারতীয় আমের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে কাঠমান্ডু। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ভারত থেকে রফতানি হওয়া আমকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ফাইটোস্যানিটারি’ মানদণ্ডের সমতুল্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘হট ওয়াটার ইমার্শন ট্রিটমেন্ট’ বা এইচডব্লিউটি। এই পদ্ধতিতে আমকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ৪৬ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম জলে ডুবিয়ে রাখা হয়, যাতে ফলমাছির লার্ভা ও বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগের জীবাণু ধ্বংস হয়। তবে এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। শিল্প সূত্রের দাবি, ১০ মেট্রিক টন আম প্রক্রিয়াকরণে অতিরিক্ত প্রায় ৪০ ঘণ্টা সময় লাগে। পশ্চিমবঙ্গের রফতানিকারক সংস্থা ডিএমআর গ্রিন ভ্যালি অ্যাগ্রোফ্রেশ-এর কর্ণধার মৃণাল সিনহা জানিয়েছেন, নেপালের নতুন বিধি কার্যকর হলে পরিবহণ ও প্রক্রিয়াকরণ খরচ অনেকটাই বেড়ে যাবে। সম্প্রতি নেপালে ১০ মেট্রিক টন আম সরবরাহের একটি অর্ডার পেলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কায় তিনি তা গ্রহণ করেননি।
যদি নেপাল ভারতীয় আমের সবচেয়ে বড়ো বাজার নয়, তবু এই নিষেধাজ্ঞার প্রতীকী গুরুত্ব যথেষ্ট। ভারত বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ মেট্রিক টন আম উৎপাদন করে। এর মধ্যে মাত্র ৩২ হাজার মেট্রিক টনের মতো বিদেশে রফতানি হয়। ভারতের প্রধান আম রফতানি বাজার হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং সৌদি আরব। প্রতিবেশী নেপালেও প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার টন ভারতীয় আম রফতানি হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩৬ লক্ষ মার্কিন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপাল ও জাপানের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, কীটনাশক ব্যবহার এবং রফতানি-সংক্রান্ত পরিকাঠামো নিয়ে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনে দিয়েছে।
কূটনৈতিক মহলের একাংশ আবার এ ঘটনাকে ভারত-নেপাল সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটেও দেখছেন। সীমান্ত ও ভূখণ্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে গত কয়েক বছরে দু–দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বেড়েছে। ফলে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক বার্তাও এ পদক্ষেপের অন্তরালে রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
❤ Support Us








