Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ৬, ২০২৬

‘অন্নপূর্ণা’য় নাম বাদ, ক্ষোভের মুখে নবান্নের ইউ-টার্ন ! ফের যাচাই ২৮ লক্ষ আবেদন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার নির্দেশ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘অন্নপূর্ণা’য় নাম বাদ, ক্ষোভের মুখে নবান্নের ইউ-টার্ন ! ফের যাচাই ২৮ লক্ষ আবেদন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমীক্ষার নির্দেশ

‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র প্রথম কিস্তির টাকা পৌঁছতেই রাজ্যের একাংশের মুখে হাসি। কিন্তু সে হাসির অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ, হতাশা আর অনিশ্চয়তা। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর উপভোক্তা হওয়া সত্ত্বেও বহু মহিলার অ্যাকাউন্টে নতুন প্রকল্পের তিন হাজার টাকা না পৌঁছনোয় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। কোথাও ব্লক অফিস ঘেরাও, কোথাও পুরসভা চত্বরে বিক্ষোভ, কোথাও আবার জনপ্রতিনিধিদের সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন আবেদনকারীরা। চাপের মুখেই শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৮ লক্ষ ‘অস্থায়ীভাবে বাতিল’ আবেদন নতুন করে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিল নবান্ন।

প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় মোট ২৭ লক্ষ ৮৩ হাজার আবেদন আপাতত স্থগিত বা বাতিল তালিকায় রয়েছে। সে সমস্ত আবেদনই নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেলাশাসকদের। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের কাছে নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছে। ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বিশেষ যাচাই অভিযানে সরকারি কর্মীরা প্রত্যেক আবেদনকারীর বাড়িতে গিয়ে নথি, পারিবারিক তথ্য এবং প্রকৃত আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি যাচাই করবেন। গোটা প্রক্রিয়া সাত দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যও বেঁধে দিয়েছে নবান্ন। যাচাইয়ে যোগ্য বলে বিবেচিত আবেদনকারীদের আধার-সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দ্রুত প্রকল্পের অর্থ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালের নেতৃত্বে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে একটি ভার্চুয়াল পর্যালোচনা বৈঠক হয়। বৈঠকে জেলার জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক, মহকুমাশাসক-সহ বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকেই স্পষ্ট করে জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে ‘রিজেক্টেড’ দেখানো কোনো আবেদনকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করা যাবে না। প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে সরেজমিনে যাচাই করতে হবে। সে রিপোর্ট নির্দিষ্ট পোর্টালে আপলোড করে সুপারিশ পাঠাতে হবে। প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, ‘সরকারের লক্ষ্য, একজনও প্রকৃত উপভোক্তা যেন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে প্রকল্পের বাইরে না থেকে যান।’

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য মোট প্রায় ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। তার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২২ লক্ষ আবেদনকারীকে যোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যেই তিন হাজার টাকা করে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাকি প্রায় ২৮ লক্ষ আবেদন আপাতত আটকে আছে। কারণ হিসেবে উঠে আসে একাধিক বিষয়—পরিবারের কোনো সদস্য আয়কর দেন, জিএসটি নম্বর রয়েছে, তিনটির বেশি পাকা ঘর রয়েছে, আধার ও ব্যাঙ্কের তথ্যের অমিল, অথবা আবেদনপত্রে তথ্যগত অসঙ্গতি। প্রশাসন জানাচ্ছে, এ সমস্ত কারণই ছিল প্রাথমিক যাচাইয়ের ভিত্তি। এখন সেসব তথ্য বাস্তবে মিলিয়ে দেখা হবে।

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, অনেক আবেদনকারীর নাম পোর্টালে এতদিন ‘রিজেক্টেড’ লেখা দেখা গেলেও, নতুন নির্দেশ জারির পর ধাপে ধাপে সে স্ট্যাটাস বদলে ‘ভেরিফিকেশন ইন প্রসেস’ দেখানো হচ্ছে। অর্থাৎ আবেদনগুলি পুনরায় যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে বহু আবেদনকারীর মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। শুধু অনলাইন আবেদন নয়, অফলাইনে জমা পড়া হাজার হাজার আবেদনপত্র নিয়েও প্রশাসন তৎপর হয়েছে। বিভিন্ন ‘জনকল্যাণ শিবির’-এ জমা হওয়া আবেদনগুলির অনেকগুলিই এখনো ‘ডিজিটাইজ’ হয়নি। নবান্ন নির্দেশ দিয়েছে, প্রথমে সব আবেদন ডিজিটাল রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তারপর প্রতিটি আবেদন পৃথকভাবে পরীক্ষা করে অনুমোদন অথবা বাতিলের কারণ-সহ পোর্টালে আপলোড করতে হবে। এই গোটা কাজ ১০ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত সমস্যাও প্রশাসনের নজরে এসেছে। বহু আবেদনকারীর আধার-সংযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তথ্যের অসঙ্গতি, কেওয়াইসি অসম্পূর্ণ থাকা কিংবা অ্যাকাউন্ট সক্রিয় না থাকার কারণে অর্থ স্থানান্তর করা যায়নি। এ ধরনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনকে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে দ্রুত সমস্যার সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দপ্তরকেও প্রকল্পের নোডাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিষয়টি নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা না পাওয়া নিয়ে যখন জেলায় জেলায় ক্ষোভ বাড়ছে, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে সামনে এসেছেন নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মালতি রাভা রায়। তাঁর দাবি, ‘এত বড়ো প্রকল্প অল্প সময়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কোথাও কোথাও ত্রুটি থেকে যেতে পারে। সে কারণেই এসডিও, বিডিও এবং গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত যোগ্য কাউকে বঞ্চিত হতে দেব না।’ তবে মন্ত্রীদের আশ্বাসে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। কোচবিহারের মেখলিগঞ্জে অন্নপূর্ণার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে পুরসভা চত্বরে বিক্ষোভে সামিল হন শতাধিক মহিলা। ক্ষোভ এতটাই চরমে পৌঁছয় যে পুরপ্রধানকে লক্ষ্য করে ডিমও ছোড়া হয়। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পরও কোনও কারণ না জানিয়েই তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাঁকুড়াতেও উঠেছে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ। শালতোড়ার বিজেপি বিধায়ক চন্দনা বাউড়ির দাবি, তাঁর বিধানসভা এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় দেখে উপভোক্তা নির্বাচন করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিডিও অফিসের ডেটা এন্ট্রি স্তরেই অনিয়ম হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি রাজ্য নেতৃত্বের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে নদিয়া জেলাকে ঘিরে। সরকারি তথ্য বলছে, পূর্বতন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পে জেলায় প্রায় ১৩ লক্ষ ৩৫ হাজার মহিলা উপভোক্তা ছিলেন। কিন্তু অন্নপূর্ণা যোজনার চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন মাত্র ৬ লক্ষ ৮০ হাজার ১৭২ জন। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ মহিলার নাম বাদ গিয়েছে। ফলে, কৃষ্ণনগর-সহ জেলার বিভিন্ন ব্লক অফিসের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, তাঁরা সমস্ত সরকারি শর্ত পূরণ করেও টাকা পাননি।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। প্রশাসনের দাবি, নতুন প্রকল্পে নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড অনুযায়ীই তালিকা তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকায় নাম না থাকা, সিএএ বা সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে আবেদন না করা, কিংবা অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করার মতো কারণেই বহু আবেদন বাতিল হয়েছে। তবে নতুন করে যাচাইয়ের নির্দেশের পরে প্রকৃত যোগ্যদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলেই প্রশাসনিক মহলের একাংশের ধারণা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া এ অসন্তোষ নতুন সরকারের জন্য ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। সে কারণেই দ্রুত পুনরায় যাচাইয়ের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে নবান্ন। এখন নজর, বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার পর বাদ পড়া লক্ষাধিক আবেদনকারীর মধ্যে কত জন শেষ পর্যন্ত ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় ফিরে আসেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!