- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২৫, ২০২৬
বহুবিবাহে নিষেধাজ্ঞা, একত্রবাসের নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক! অসম বিধানসভায় পেশ ইউসিসি বিল, তীব্র বিরোধিতায় কংগ্রেস-রাইজর-তৃণমূল
উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের পর এবার অসমও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পথে? সোমবার অসম বিধানসভায় পেশ হল ‘দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড, অসম, ২০২৬’ বিল। বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করা থেকে শুরু করে একত্রবাস বা লিভ-ইন সম্পর্ক বাধ্যতামূলক ভাবে নথিভুক্ত করার প্রস্তাব— একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়কে সামনে রেখে আনা হয়েছে এ আইন। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি সরকারের এ পদক্ষেপ শুধু অসমেই নয়, গোটা দেশেই ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি নিয়ে বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
সোমবার সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা-র হয়ে ১২৬ সদস্যের অসম বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন রাজ্যের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী অতুল বোরা। আগামী ২৭ মে বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নতুন মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ হিসেবেই এ বিলকে দেখা হচ্ছে। বিলের ‘স্টেটমেন্ট অব অবজেক্টস অ্যান্ড রিজ়নস’-এ স্পষ্ট ভাবে জানানো হয়েছে, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও একত্রবাস সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনকে ‘আরও সুসংহত এবং সরল’ করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য। প্রস্তাবিত আইনে পুরুষদের জন্য বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং মহিলাদের জন্য ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল একত্রবাস বা লিভ-ইন সম্পর্ককে প্রথম বার আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, একত্রবাসে থাকা যুগলদের বাধ্যতামূলক ভাবে সম্পর্ক নথিভুক্ত করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য, ‘এই বিল একত্রবাসের সম্পর্ককে প্রথম বারের জন্য আইনি স্বীকৃতির আওতায় আনছে। বাধ্যতামূলক নথিভুক্তিকরণের মাধ্যমে সঙ্গীদের অধিকার যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনই সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানের অধিকারও আইনত স্বীকৃতি পাবে।’
অসম সরকারের দাবি, সমাজে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতেই এ আইন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, বহুবিবাহের মতো প্রথা নারীদের অধিকার খর্ব করে, পারিবারিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। সে কারণেই একাধিক বিয়েকে বেআইনি ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে সমাজে ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতের আইনি জটিলতা এড়াতে এবং নারী সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশনের প্রস্তাব আনা হয়েছে বলে সরকারের দাবি। তবে বিলটি পেশ হতেই তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে বিধানসভায়। কংগ্রেজ, রাইজর দল, তৃণমূল-সহ বিরোধী দলগুলি বিলটির তীব্র বিরোধিতা করে। বিরোধীদের অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি আইন আনার আগে সাধারণ মানুষ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, সামাজিক সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি। তাদের বক্তব্য, এই বিল মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাই তাড়াহুড়ো করে আইন পাশ না করিয়ে আগে সর্বস্তরের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।
বিরোধীদের আরও দাবি, এই বিলের ফলে অসমের সামাজিক ও ধর্মীয় ভারসাম্যে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মুসলিম সংগঠনগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই আইন ব্যক্তিগত ধর্মীয় রীতিনীতির উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। যদিও অসম সরকার বার বার স্পষ্ট করেছে, এই আইন কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আনা হয়নি। বরং সমস্ত নাগরিকের জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ। এদিন, বিরোধীদের প্রবল বিক্ষোভের মধ্যেই অসম বিধানসভার অধ্যক্ষ রঞ্জিত কুমার দাস বিল পেশের অনুমতি দেন। বিরোধীরা বিল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিতর্কের দাবি তুললেও শেষ পর্যন্ত তা খারিজ হয়ে যায়।
অসম সরকার অবশ্য শুরু থেকেই জানিয়ে এসেছে, রাজ্যের সামাজিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রেখেই এই আইন তৈরি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আগেই ঘোষণা করেছিলেন, অসমের তফসিলি জনজাতিদের ক্ষেত্রে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ কার্যকর হবে না। একই সঙ্গে রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব আচার, প্রথা আর ঐতিহ্যও এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে বলে দাবি সরকারের। রবিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-ও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ কোনো ভাবেই মূলনিবাসী সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, ইউসিসি নিয়ে ‘ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে’। শাহের বক্তব্য, ‘অনেকে বলছেন ইউসিসি মূলনিবাসীদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজস্ব রীতিনীতি কেড়ে নেবে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইউসিসির কোনো বিধান মূলনিবাসীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’
উল্লেখ্য, গত বছরের জানুয়ারিতে বিজেপি-শাসিত উত্তরাখণ্ডে স্বাধীনতার পরে প্রথম রাজ্য হিসেবে ইউসিসি কার্যকর করে। তার পরে চলতি বছরের মার্চে গুজরাট বিধানসভাতেও একই ধরনের বিল পাশ হয়। এ বার সে তালিকায় যুক্ত হওয়ার পথে অসম। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির দীর্ঘদিনের অন্যতম রাজনৈতিক এজেন্ডা ছিল এই ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’। ফের ক্ষমতায় এসে সে লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছে দলটি। অসমের ১২৬ আসনের বিধানসভায় বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ৮২। ফলে সংখ্যার নিরিখে বিলটি পাশ করাতে সরকারের বিশেষ সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সেখানে কংগ্রেসের রয়েছে ১৯ জন বিধায়ক। তৃণমূল কংগ্রেসের একজন এবং রাইজোর দলের ২ জন বিধায়ক রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত নভেম্বরেই অসম বিধানসভায় ‘অসম প্রহিবিশন অব পলিগ্যামি বিল, ২০২৫’ পাশ হয়েছিল। ওই আইনে বহুবিবাহকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি পূর্ববর্তী বিবাহ গোপন করার অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের প্রস্তাব ছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, আদতে ওই আইনই ছিল অসমে ইউসিসি কার্যকর করার প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ দিকে, অসমে ইউসিসি বিল পেশের পর, এ নিয়ে নতুন করে জাতীয় স্তরে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক দিকে বিজেপি দাবি করছে, এই আইন নারী সুরক্ষা এবং সমান নাগরিক অধিকারের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অন্য দিকে বিরোধীদের অভিযোগ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দেশে এমন আইন চাপিয়ে দিলে সামাজিক বিভাজন আরও বাড়তে পারে।
❤ Support Us








