- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৬
বঙ্গোপসাগরে মজবুত নিরাপত্তা বলয়ে জোর, বিমস্টেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ধারাবাহিক বৈঠক অজিত ডোভালের
একদিকে বহুপাক্ষিক মঞ্চে আঞ্চলিক সহযোগিতার ডাক, অন্যদিকে বন্ধ দরজার আড়ালে একের পর এক কৌশলগত বৈঠক। পঞ্চম ‘বিমস্টেক’ জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান ও উপদেষ্টাদের বৈঠকে বৃহস্পতিবার দুটি সমান্তরাল বার্তাই তুলে ধরল দিল্লি। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে আঞ্চলিক ঐক্য, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, তেমনই তার আগের দিন শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ ও মায়ানমারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ভারতের নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কূটনীতির নতুন রূপরেখাও স্পষ্ট করে দেন তিনি।
এদিন, ‘বিমস্টেক নিরাপত্তা শীর্ষ সম্মেলন’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডোভাল বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে অত্যন্ত সমস্যার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ফলে ‘বিমস্টেক’-ভুক্ত দেশগুলিও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, ‘বিমস্টেক শুধু ভৌগোলিক জোট নয়, এটি হাজার বছরের সভ্যতাগত ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতিফলন। আমাদের লক্ষ্য, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।’
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দেন, বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ ‘বিমস্টেক’-ভুক্ত সাতটি দেশে বসবাস করেন। সম্মিলিত অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে এ অঞ্চল শুধু জনসংখ্যার বিচারে নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সন্ত্রাসবাদ দমন, আন্তঃসীমান্ত সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সুরক্ষা এবং উদীয়মান নিরাপত্তা-ঝুঁকির বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের প্রসঙ্গও।
তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, সম্মেলনের প্রকাশ্য আলোচনার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল অজিত ডোভালের ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলি। বহুপাক্ষিক মঞ্চকে ব্যবহার করে ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে কৌশল নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করছে, এ বৈঠকগুলি তারই প্রতিফলন। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব এয়ার ভাইস মার্শাল সম্পথ থুয়াকোন্ঠা (অব.)-র সঙ্গে বৈঠকে মূল গুরুত্ব পায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা। শ্রীলঙ্কার ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরের যে নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সূত্রের খবর, সামুদ্রিক নজরদারি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দু–পক্ষই বিস্তারিত মতবিনিময় করেছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে বহিরাগত শক্তির ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এরপর থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব চাচাই ব্যাংচুয়াদের সঙ্গে বৈঠকে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেন অজিত ডোভাল। গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি ভারত-মায়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপাক্ষিক মহাসড়ক প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। কূটনৈতিক মহলের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগ প্রকল্পগুলি যত এগোবে, ততই আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং সাইবার হুমকির ঝুঁকি বাড়বে। ফলে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে অবকাঠামোগত সংযোগের সমান্তরালে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে দিল্লি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠকেও সীমান্ত নিরাপত্তা ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। দীর্ঘ ও বহু ক্ষেত্রে অরক্ষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর জঙ্গি কার্যকলাপ, মানব পাচার, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ঢাকার সহযোগিতাকে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। সে কারণেই দু–দেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই দিনে মায়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা উ টিন আউং সানের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ভারত-মায়ানমার সীমান্তে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির সক্রিয়তা বিবেচনায় এ বৈঠককেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘সার্ক’ কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ রক্ষার অন্যতম প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছে ‘বিমস্টেক’। ১৯৯৭ সালে ‘ব্যাংকক ঘোষণাপত্র’-এর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনে বর্তমানে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড। ২০১৬ সালের ‘গোয়া বৈঠক’-এ পর থেকেই নিরাপত্তা সহযোগিতা ‘বিমস্টেক’-এর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, অর্থপাচার রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ, মাদক চোরাচালান দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সাইবার সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলিতে একাধিক যৌথ কাঠামো গড়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত ‘মাইলেক্স’ সামরিক মহড়া, চলতি বছরের নভেম্বর মাসে প্রস্তাবিত যৌথ নৌ-মহড়া সেই সহযোগিতারই অংশ।
ভারতের কাছে ‘বিমস্টেক’-এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রেক্ষাপটে। ডোভালও তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করে দেন, ‘বিমস্টেক’ কেবল একটি আঞ্চলিক সংগঠন নয়, এটি ভারতের বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। তাঁর দাবি, ‘অতীত ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ গড়তে চাই, যেখানে সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা সকলের জন্য নিশ্চিত হবে।’ অজিত ডোভালের ধারাবাহিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের ব্যাখ্যা, বহুপাক্ষিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, বাস্তব নিরাপত্তা সমীকরণ আসলে নির্ধারিত হয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলেই। আর সে কারণেই ‘বিমস্টেক’-এর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আঞ্চলিক ঐক্যের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করতেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি।
❤ Support Us








