- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- আগস্ট ৬, ২০২৫
কোণঠাসা বাংলা ছবি ! প্রতিকার চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে একজোট টালিগঞ্জ, জরুরি বৈঠক ৭ আগস্ট
বাংলা ছবি সংকটে। প্রাইম টাইমে, হল্ নেই, শো নেই বাংলা চলচিত্রের। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিপর্যস্ত হলেও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল টলিউড। দর্শক ফিরছিলেন প্রেক্ষাগৃহে। ‘বেলাশুরু’, ‘প্রজাপতি’, ‘অপরাজিত’— এর মতো একাধিক ছবির বক্স অফিস সাফল্য প্রমাণ করেছিল। গত বছরে ‘রক্তবীজ’ বা ‘খাদান’-এর মতো সুপারহিট ছবি, বাংলা সিনেমার বাজারে মৃতপ্রায় দেহে প্রাণশক্তি ফুঁকে দিয়েছিল। সমস্বরে রব উঠেছিল, ‘এখনো সে বেঁচে আছে’। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সে বাজারকে আবারও চেপে ধরেছে মুম্বইয়ের প্রভাব। অভিযোগ, বলিউডের ‘বড়ো খেলোয়াড়’রা শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন রাজ্যের হল্ মালিকদের উপর। ফলে, বাংলা ছবির মুক্তির সময় দিনের সেরা শো-তে জায়গা মিলছে না একাধিক হলে। মুম্বইয়ের প্রভাবশালী ডিস্ট্রিবিউটর সংস্থাগুলির চাপে বাংলা ছবি হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক জায়গা।
এমন পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন টলিউডের অভিনেতা-পরিচালক-প্রযোজকেরা। বাংলা সিনেমার ২ সুপারস্টার প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও দেব, পরিচালক-অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা এবং নিশপাল সিং রানে, সকলেই মিলে চিঠি পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। চিঠিতে স্পষ্ট অভিযোগ, ‘বাংলা ছবি আজ গভীর সংকটে। নিজেদের রাজ্যেই বাংলা ছবির সঙ্গে এমন অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। মুম্বাই, পাঞ্জাব বা দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক ছবিকে যেমন সম্মান ও প্রাধান্য দেওয়া হয়, বাংলায় তেমনটা হচ্ছে না।’ আগস্টে বলিউডের বড়ো বাজেটের ছবি ‘ওয়ার টু’ আসছে দেশজুড়ে। একই সময়ে মুক্তির অপেক্ষায় বহু প্রতীক্ষিত বাংলা ছবি ‘ধূমকেতু’। কিন্তু তার আগেই বাংলা ছবিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আশঙ্কা। কারণ, বেশ কয়েকটি হল্ থেকে প্রযোজকদের কাছে খবর এসেছে যে, ‘ধূমকেতু’ পাবে না প্রাইম টাইম অর্থাৎ বিকেল ও সন্ধ্যার শো। বদলে ওই শো দখল করে নেবে আসন্ন হিন্দি ছবি। আর এই জায়গা দখলের পিছনে রয়েছে মুম্বইয়ের বিশাল বিশাল ডিস্ট্রিবিউশন সংস্থার অদৃশ্য হাত।
বিগত কয়েক বছরে বাংলা ছবির চিত্রনাট্য, নির্মাণ ও দর্শক টানার ক্ষমতায় ব্যাপক উন্নতি হলেও, তার ফল মেলেনি হলমুখী দর্শকসংখ্যায়। তার প্রধান কারণ, ছবি মুক্তির সময় হলের সংখ্যা ও শোয়ের সময় নিয়ে চলা বৈষম্য। বদ্ধ এ পরিস্থিতি আর চুপচাপ মেনে নিতে নারাজ বাংলা ছবির শিল্পী ও নির্মাতারা। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো সম্মিলিত চিঠিতে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন—এটি কেবল একটি ইন্ডাস্ট্রির সমস্যা নয়, এই লড়াই ভাষা, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়ের। বাংলা ছবিকে সিনেমাহলে তার প্রাপ্য জায়গা থেকে বঞ্চিত করা মানে গোটা এক সাংস্কৃতিক পরিসরকে কোণঠাসা করে দেওয়া। বাংলা সিনেমার অন্যতম নাম প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি বলেছেন, ‘বাংলা ছবি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এটি এক শিল্প। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লক্ষ মানুষের জীবিকা। যদি ছবিই না চলে, তবে এই শিল্পকে কীভাবে বাঁচানো যাবে? আজ আমরা মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছি কারণ, লড়াইটা প্রশাসনিক স্তরে না গেলে পরিবর্তন আসবে না।’ অভিনেতা-প্রযোজক, তৃণমূল সাংসদ দেব বলেছেন, ‘বাংলা ছবি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে না পারে, তা হলে সেটা গোটা রাজ্যের সংস্কৃতির পক্ষে লজ্জার।’
মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হয়েছে, রাজ্যের প্রতিটি সিনেমা হলে বাংলা ছবির জন্য প্রাইম টাইম শো সংরক্ষিত রাখা হোক। যাতে বাংলা ছবি মুক্তির সময় নিশ্চিতভাবে দর্শকের সামনে পৌঁছতে পারে। টলিউডের যৌথ আবেদনের পরেই রাজ্য সরকারের তরফে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে আগামী ৭ অগস্ট, বুধবার দুপুরে নন্দনে ডাকা হয়েছে একটি জরুরি বৈঠক। সে বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের হল মালিকরা, প্রযোজক-পরিচালকরা এবং টলিউডের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি দল। এই বৈঠকে আলোচনা হবে, কী ভাবে বাংলা ছবির জন্য শো সংরক্ষণের নিয়ম তৈরি করা যায়, যাতে ভবিষ্যতে বলিউডের কোনও প্রযোজনা সংস্থা বা ডিস্ট্রিবিউটর বাংলার প্রেক্ষাগৃহে শর্ত চাপিয়ে দিতে না পারে। পাশাপাশি খতিয়ে দেখা হবে, সরকারিভাবে এই সংরক্ষণ নীতিকে আইনত রূপ দেওয়া সম্ভব কি না। প্রযোজক শ্রীকান্ত মেহতা বলেছেন, ‘ছবি তৈরি করতে আমরা প্রচুর সময়, অর্থ ও পরিশ্রম দিই। কিন্তু মুক্তির সময় যদি হলে শো না পাই, দর্শক ছবিটি দেখবেই বা কীভাবে?’ পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যা ইয়ের আশঙ্কা, ‘বাংলা সিনেমা যদি তার নিজের মাটিতে জায়গা না পায়, তা হলে এ মাটিরই মুখ ঝলসে যাবে।’ পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এখন বাংলা ছবি মানে শুধু একটা ইন্ডাস্ট্রি নয়, এটা আমাদের পরিচয়ের প্রতীক। এ শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু সিনেমা হারাবে না, হারিয়ে যাবে একটা আস্ত জাতির কণ্ঠস্বর।’ তবে শুধু টালিগঞ্জ নয়, চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই আন্দোলন আসলে এক নতুন রূপের ‘ভাষা আন্দোলন’-এর পর্যায়। কারণ এখানেও প্রশ্ন একই, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি ও মর্যাদা। সিনেমা যেখানে কেবল বাণিজ্য নয়, একটি জাতির সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ঐতিহ্য আর অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি।
❤ Support Us








