Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • জুলাই ১২, ২০২৫

৪-কে রূপে ‘দো বিঘা জমিন’-এর বিশ্ব-প্রিমিয়ার এবার ভেনিস উৎসবে

৪-কে রূপে ‘দো বিঘা জমিন’-এর বিশ্ব-প্রিমিয়ার এবার ভেনিস উৎসবে

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ, চিরস্মরণীয় বিমল রায়। তাঁর পরিচালিত ১৯৫৩ সালের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘দো বিঘা জমিন’ আজো ভারতীয় সমান্তরাল সিনেমার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর। এক দরিদ্র কৃষকের বাস্তব লড়াই, যাঁর হাতে নেই কিছুই, শুধু আছে নিজের জমি ফেরানোর এক অসহায় অথচ দৃঢ় সংকল্প। সে ভাষ্যই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে আসছে একেবারে নতুন চেহারায় — ঝকঝকে ৪কে রিস্টোর সংস্করণে, নতুন রূপে বিশ্ব প্রিমিয়ার হতে চলেছে চলতি বছরের ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে – ‘ভেনিস ক্লাসিক’ বিভাগে। যেখানে বিশ্ব জুড়ে বাছাই করা পুরনো চলচ্চিত্রের রেস্টোর সংস্করণগুলি প্রদর্শিত হয়। ‘দো বিঘা জমিন’ ছাড়াও এ বছরের তালিকায় থাকছে পেদ্রো আলমোদোভার ‘ম্যাটাডর’, জিউসেপ দে সান্তিসের ‘রোমা অরে ১১’, ক্রিজিসটফ কিয়েস্লোস্কির ‘ব্লাইন্ড চান্স’ এবং স্ট্যানলি কুব্রিকের ‘ললিতা’ -র মতো আন্তর্জাতিক সিনেমার ধ্রুপদী কীর্তি। আনন্দঘন ঘোষণাটি এসেছে একেবারে যথার্থ সময়ে, পরিচালক বিমল রায়ের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী যাপনের আবহে।

‘দো বিঘা জমিন’-এর এই পুনরুদ্ধার প্রকল্পে অগ্রণী ভূমিকা বিশ্ববন্দিত প্রতিষ্ঠান ‘ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’। তাদের সহযোগী হিসাবে পাশে ছিল আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন’ ও ‘জ্যানাস ফিল্মস’। দীর্ঘ ৩ বছরের বেশি সময় ধরে, উদয়াস্ত পরিশ্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ছবির সাবেক ঔজ্জ্বল্য। ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ ও ব্রিটেনের ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট -এ সংরক্ষিত আসল নেগেটিভ থেকে কাজটি করা হয়েছে। একাধিক অনুপস্থিত অংশের জোগাড়ে সম্পূর্ণ ছবিটিকে রঙে ও ছন্দে ফিরিয়ে আনা হয়েছে তার সেরা রূপে। ভেনিস উৎসবের বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন বিমল রায়ের সন্তানরা — রিঙ্কি রায় ভট্টাচার্য, অপরাজিতা রায় সিনহা এবং জয় বিমল রায়। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর, যিনি নিজেও চলচ্চিত্র সংরক্ষণ এবং ভারতীয় ক্লাসিক ছবির পুনরুজ্জীবনে এক অগ্রণী নাম।

বিশ্বমঞ্চের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আবেগে ভেসেছেন অনেকে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট গীতিকার, কবি, পরিচালক গুলজার। বিমল রায়ের ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। গুলজার বলেন — ‘দো বিঘা জমিন’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, এ ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, যা ভারতীয় সিনেমার নির্মাণধারায় গভীর পরিবর্তন এনেছিল। গুলজার আরো বলেন, অনেকে জানেন না, এই ছবির অনুপ্রেরণা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি কবিতা — ‘দুই বিঘা জমি’। সেই কবিতার কাহিনি এবং সলিল চৌধুরীর সংলাপ ও চিত্রনাট্য মিলে তৈরি হয়েছিল এই ছবির কঙ্কাল, যা পরে বিমল রায় নিজের সৃষ্টিশীল চোখে অপরূপ অথচ কী ভীষণ ‘সাধারণ’ রূপ দিয়েছিলেন। গুলজার মনে করেন তাঁর বিমল-দা ছিলেন ‘ম্যারেড প্রিন্ট’-এর মতো পরিচালক। যেভাবে শব্দ ও ছবির নিখুঁত সংমিশ্রণে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ সৃষ্টি হয় সিনেমায়, সেভাবেই তিনি চলচ্চিত্রকে নিজের জীবনসঙ্গী করে তুলেছিলেন। দিনরাত এক করে যেভাবে তিনি শুটিং ও সম্পাদনার মধ্যে দিয়ে কাজ করতেন, তা একান্তভাবে তাঁকে এক অনন্য চলচ্চিত্রকার হিসেবে গড়ে তোলে।

বিমল রায়ের পরিচালনায় ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বালরাজ সাহনি আর নিরুপা রায়। দরিদ্র কৃষকের জীবনের করুণ কাহিনি — যাকে নিজের শেষ সম্বল দুই বিঘা জমিটুকু হারিয়ে শহরে পাড়ি দিতে হয়, ছেলেকে নিয়ে দিন আনা দিন খাওয়া জীবনে, রিকশা চালিয়ে জমি ফেরত পাওয়ার লড়াই শুরু করেন তিনি। শিল্পায়নের কড়াল গ্রাস, শহরের নিষ্ঠুর বাস্তবতা, ও গ্রাম থেকে শহরে স্থানচ্যুত হওয়া মানুষের বেদনায় নির্মিত এই ছবিটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল ইতালির পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকার ‘বাইসাইকেল থিবস’ থেকে। পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর জানিয়েছেন, গুলজারের সহকারী হিসেবে কাজ করার সময়েই তিনি বিমল রায়ের ছবিগুলির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন। সেই পরিচয়ই তাঁকে উত্সাহিত করে বিমল রায়ের কাজ পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের প্রয়াসে। তাঁর কথায়, বিমল রায়ের ছবিতে যে নিঃশব্দতা, কাব্যিক দৃশ্যায়ন ও মানবিক বার্তা, তা আজকের সময়েও প্রাসঙ্গিক। ‘দো বিঘা জমিন’ ভারতীয় সিনেমাকে স্টুডিওর চার দেওয়ালের বাইরে এনে বাস্তবের রাস্তায় সটান দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সামাজিক বাস্তবতা আর মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব নির্মাণ করেছিল নতুন এক ঘরানার। যার প্রভাবে বহু নতুন পরিচালক পরবর্তীকালে অন্যরকম ভাবনায় কাজ করার সাহস পেয়েছিলেন।

এতগুলো বছর পেরিয়ে ভেনিস উৎসবে প্রিয়জনের ছবি প্রদর্শিত হবে, আবেগঘন মহলে বিমল রায়ের পরিবার জানিয়েছে, ‘দো বিঘা জমিন’-এর ভেনিস উৎসবে প্রদর্শন তাঁদের কাছে এক স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। তাঁদের মতে, ছবিটি পরিচালকের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল। দেশভাগের কবলে শিকড়চ্যুত হওয়ার ক্ষত স্বয়ং পরিচালকের, সে অভিজ্ঞতারই প্রতীক হয়ে ধরা দেয় ছবির প্রধান চরিত্র ‘শম্ভু মাহাতো’। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং ক্ষতই অসামান্য সামাজিক ছবির জন্ম দেয়। ছবিটির পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক উৎসবে তার প্রদর্শন কেবল সিনেমার সৌন্দর্যের উদ্‌যাপন নয়, বরং এক কালজয়ী শিল্পীর জীবনবোধ ও বিশ্বমানবতাবাদের স্বীকৃতি হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আগামী ২৭ আগস্ট থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ৮২তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। সেই উৎসবে যখন নতুন করে আলো পাবে ‘দো বিঘা জমিন’।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!