Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • নভেম্বর ৭, ২০২৫

ঔপনিবেশিক আইনের ভূত, স্বাধীনতার টুঁটি টিপে ধরে আজও

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ঔপনিবেশিক আইনের ভূত, স্বাধীনতার টুঁটি টিপে ধরে আজও

১০ বছর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। প্রখ্যাত অভিনেতা, পরিচালক ও নাট্যব্যক্তিত্ব অমল পালেকর দায়ের করা নাটক ও প্রহসনের স্ক্রিপ্টে প্রাক্‌-সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে মামলা অবশেষে শুনতে রাজি হয়েছে বোম্বে হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার বিচারপতি রিয়াজ ছাগলা ও বিচারপতি ফারহান দুবাশের বেঞ্চ জানিয়েছেন, আগামী ৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হবে মামলার শুনানি। পালেকরের আইনজীবী অনিল আন্তুরকার আদালতে বলেছেন, ‘এ মামলা ২০১৬ সালে দায়ের করা হয়েছিল, কিন্তু এত বছরেও চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। আমার মক্কেলের বয়স এখন ৮৫ বছর। তিনি শুধু জানতে চান, শিল্পীর স্বাধীনতা সম্পর্কে বিচারব্যবস্থার অবস্থান কী— ইতিবাচক বা নেতিবাচক?’ আন্তুরকার আদালতে যুক্তি দেন, বর্তমানে এমন এক সময় এসেছে যখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শিত ওয়েব সিরিজ বা ডিজিটাল কনটেন্টে কোনো সেন্সরশিপ নেই। অথচ নাটক, প্রহসন বা পথনাটিকার উপর পুলিশের প্রাক্‌-নিয়ন্ত্রণ আজও বহাল। এহেন বৈষম্য কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। আইনজীবীর বক্তব্য, বোম্বে পুলিশ আইনের আওতায় পুলিশের আদৌ কি ক্ষমতা আছে নাটকের স্ক্রিপ্ট বা অভিনয়ের পূর্ব-পর্যালোচনা করার? এমন সাংবিধানিক প্রশ্নের উত্তরই জানতে চেয়েছেন তাঁর বর্ষীয়ান মক্কেল।

অমল পালেকর দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প-সাহিত্য-নাটকে প্রশাসনের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘প্রশাসনের হস্তক্ষেপের ফলে বহু ঐতিহাসিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাটক মঞ্চস্থ করা যায়নি। যে স্বাধীনতা একজন শিল্পী হিসেবে আমার প্রাপ্য, সেটিই ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।’ তাঁর বক্তব্য, নাট্যশিল্পের উপর এমন নিয়ন্ত্রণ শুধু অযৌক্তিক নয়, বরং শিল্পের প্রাণশক্তিকেই স্তব্ধ করে দেয়। ২০১৬ সালে পালেকর এই প্রাক্‌-সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন। তখন তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, এ ধরনের নিয়ম সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী, কারণ এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। ২০১৭ সালে হাইকোর্ট মামলাটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করলেও এরপর আর তা চূড়ান্ত শুনানির পর্যায়ে পৌঁছয়নি। প্রায় এক দশক পর অবশেষে সেই মামলা নতুন করে জীবিত হল, যা নাট্যজগতের অনেকেই শিল্পস্বাধীনতার লড়াই হিসেবে দেখছেন।

বিতর্কের মূল কেন্দ্র বোম্বে পুলিশ অ্যাক্টের ধারা ৩৩(১)(ডব্লিউএ)। এই ধারার অধীনে পুলিশ কমিশনার বা সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ জনবিনোদনের স্থান, (সিনেমা বাদে) এবং মেলা, তামাশা বা নাটকের মতো পারফরম্যান্সের উপর নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়ন করতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, ‘জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার’ স্বার্থে নাটকের স্ক্রিপ্ট ও অভিনয়ের পূর্বপর্যালোচনা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, পুলিশের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো নাটক মঞ্চস্থ করা যায় না। পরিচালক পালেকরের দাবি, এই প্রাক্‌-নিয়ন্ত্রণ একেবারেই অসাংবিধানিক এবং শিল্পীর স্বাধীনতার পরিপন্থী। তিনি অভিযোগ তুলেছেন, এই প্রাক্‌-সেন্সরশিপ শিল্পচর্চার গলায় ফাঁস পরানোর সমান। যেখানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নির্মাতারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন, সেখানে মঞ্চশিল্পীরা কেন পুলিশের অনুমতির দয়ায় বাঁচবেন? মামলার পুনরুজ্জীবনে নাট্যজগতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বহু নাট্যকার ও শিল্পী মনে করছেন, শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে এই মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে। তাঁদের মতে, আধুনিক গণতন্ত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে শিল্পের স্বাধীনতা খর্ব করা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দশ বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলাটি অবশেষে আদালতের দরবারে ফিরেছে। এখন সকলের নজর ৫ ডিসেম্বরের দিকে—বোম্বে হাইকোর্টের রায় কি নতুন দিশা দেখাবে ভারতীয় নাট্যাঙ্গনের স্বাধীনতা-সংগ্রামে? নাটক-থিয়েটার, সাহিত্য-শিল্পের উপর স্বাধীন ভারতের সেন্সরশিপ মনে করাচ্ছে ব্রিটিশ আইনের কথা। ইতিহাস বলছে, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ভারতীয় নাট্যাঙ্গনে যে রাজনৈতিক সচেতনতার স্রোত বইতে শুরু করেছিল, তা শুধু তাত্ত্বিক বা প্রথাগত চর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে নাটক ক্রমশই উঠতে থাকে। বিশেষ করে ১৮৬০-এর দশকে কলকাতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নাট্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। সে সময়ের নাটকগুলিতে দেখা যেত চা ও নীল চাষের শ্রমিকদের প্রতি ইউরোপীয় মালিকদের নির্যাতন, দেশীয় রাজাদের শোষণ, এবং স্থানীয় অভিজাতদের ব্রিটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার তীব্র সমালোচনা। নাটককর্মীরা সাহসী ও সরল ভাষায় এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অসঙ্গতির ছবি উপস্থাপন করতেন। দীনবন্ধু মিত্রের ১৮৬০ সালের ‘নীল দর্পণ’ নাটক বাংলা নাট্যচর্চার এক মাইলফলক। ইউরোপীয় নীল চাষিদের অমানবিক শোষণ এবং নীলচাষিদের সংগ্রাম নাটকে যে সত্যরূপে ফুটে উঠেছে, তা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রেভারেন্ড জেমস লং-এর ইংরেজি অনুবাদ এই নাটককে আন্তর্জাতিক স্তরেও পরিচিতি এনে দেয়।

১৮৭২ সালে গিরিশচন্দ্র ঘোষ কলকাতার ন্যাশনাল থিয়েটার-এ নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। ১৮৭৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার, যারা ‘নীল দর্পণ’ নিয়ে সারা দেশ ভ্রমণ করে নাটকটি মঞ্চস্থ করতে থাকেন। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এর বার্তা, সাধারণ মানুষের মনে উদ্ভীপিত হয় স্বাধীনতার খোয়াব। নাটকের ব্যাপক জনপ্রিয়তার সঙ্গে শুরু হয় শাসক মহলের প্রতিক্রিয়া। নাটকটি ‘মানহানিকর’ এবং ‘বিদ্রোহমূলক’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। লন্ডনের নীতিনির্ধারকদের চাপে রেভারেন্ড লং-কে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবু ‘নীল দর্পণ’–এর প্রভাব রোখা যায়নি। নাটকটি গণমানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয়তাবাদী ভাবনার বীজ বুনতে থাকে। ‘চাকার দর্পণ’ এবং ‘গায়েকোয়াড় দর্পণ’ নাটকগুলি প্রমাণ করে যে ভারতীয় নাট্যকাররা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কতখানি সাহসী কাজ করেছেন নিরন্তর। চাষির দুর্ভিক্ষ, রাজাদের শোষণ, বিচারব্যবস্থার পক্ষপাত এসব বিষয়ই নাটকে উঠে এসেছে বারবার। ইংরেজরা নাটকগুলিকে অবিলম্বে বন্ধ করার চেষ্টা চালায়। কলকাতা, লখনৌ, এলাহাবাদে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়ে যায়। কিন্তু নাট্যকাররা থিয়েটারের নাম পরিবর্তন, ব্যঙ্গাত্মক চরিত্র আর কৌতুক নাটকের আড়ালে নাটক মঞ্চস্থ করতে থাকেন।

এরপর, ১৮৭৬ সালে ‘নাট্য পরিবেশনা আইন’ প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা নাট্যসংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে। স্থানীয় প্রশাসনকে দেওয়া হয় ‘সরকারবিরোধী বা উত্তেজনাকর নাটক’ বন্ধ করার অনুমতি। নাট্যকাররা এই আইনের শিকড়ে বাধ্য হয় সামাজিক বা পুরাণভিত্তিক নাটক লিখতে। তারপরও রাজনৈতিক নাটকের পুনর্জাগরণ ঘটে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়। সিরাজউদ্দৌলা, মীর কাশিম, পলাশীর প্রায়শ্চিত্ত নাটকগুলি জনমানসে দেশপ্রেম জাগায়। ১৯১০ সালের ‘প্রেস অ্যাক্ট’–এর মাধ্যমে নাটকও খবরের কাগজের মতোই সরকারি নজরদারিতে চলে আসে। নাট্যকলার স্বাধীনতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজও ইংরেজদের নাট্য পরিবেশনা কালা কানুন মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে-এর থিয়েটার শিল্পীদের উপর অদৃশ্য শৃঙ্খলের মতো বিদ্যমান। ব্রিটিশ শাসনের নাট্যসংগ্রাম প্রমাণ করে যে নাটক শুধুই বিনোদন নয়, এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং সামাজিক সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নীল দর্পণের মতো সাহসী নাটকগুলোই প্রমাণ করে যে, একুশ শতকের ভারতেও শাসকের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে থিয়েটারের শক্তি অম্লান। নিরন্তর সে জনগণের মনে জাগিয়ে তোলে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সচেতনতা, পুঁতে দেয় প্রতিরোধের বীজ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!