- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- ডিসেম্বর ৮, ২০২৫
চের্নোবিলে চরম সংকট ! রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ পরমাণু কেন্দ্রের সুরক্ষা-কবচ, ফের জেগে উঠবে ‘ঘুমন্ত দানব’?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন উদ্বেগ। ১৯৮৬ সালের পারমাণবিক বিপর্যয়ের স্মৃতি বহন করে থাকা, বর্তমানে ইউক্রেনের ভূ-খণ্ডে থাকা চের্নোবিল পরমাণু কেন্দ্রের সুরক্ষা আবরণ আর তার মূল কাজটি করতে পারছে না, ড্রোন আঘাতের ফলে এটি কার্যক্ষমতা হারিয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা। খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বজুড়ে তেজস্ক্রিয় আতঙ্কের স্রোত। প্রশ্ন উঠছে, সোভিয়েত আমলের ভয়াবহতার স্মৃতি কি আবার ফিরে আসছে ? যুদ্ধের দামামার মধ্যে কি জেগে উঠতে পারে চের্নোবিলের সেই ‘ঘুমন্ত দানব’?
সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, এ বছরের শুরুতে যে ড্রোন হামলা হয়েছিল, তার অভিঘাত এতটাই তীব্র যে, ২০১৯ সালে সম্পূর্ণ হওয়া ইস্পাত-কংক্রিটের বিশাল কাঠামোর ‘কনফাইনমেন্ট’ বা তেজস্ক্রিয়তা ধারণ ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যদিও ভর-বহনকারী স্তম্ভ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার স্থায়ী ক্ষতি হয়নি, তা-ও জানানো হয়েছে। আইএইএ-র মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানান, ‘সাম্প্রতিক রিপোর্ট নিশ্চিত করেছে যে, সুরক্ষা কাঠামোটি তার প্রাথমিক নিরাপত্তা কার্যকারিতা হারিয়েছে। কিছু মেরামত ইতিমধ্যেই হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার স্বার্থে পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন এখন অপরিহার্য।’ এর আগে, ইউক্রেন জানিয়েছিল, একটি উচ্চ-বিস্ফোরক ওয়ারহেড-বহুল ড্রোন ফেব্রুয়ারিতে সরাসরি চের্নোবিল কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে আঘাত হানে। তাতে আগুন লাগে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৪ নম্বর রিয়্যাক্টরের উপরের সুরক্ষামূলক ক্ল্যাডিং, যে রিয়্যাক্টরই ১৯৮৬ সালে বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গোটা ইউরোপে তেজস্ক্রিয়তার তাণ্ডব ছড়িয়ে দিয়েছিল। কিয়েভের দাবি, হামলার পেছনে রাশিয়া। তবে মস্কো শুরু থেকেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ অবশ্য জানিয়েছে, ঘটনার পর ওই অঞ্চলে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো ধরনের রেডিয়েশন এখনো ছড়িয়ে পড়েনি।
ব্রিটেনের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী জিম স্মিথ বলেছেন, ‘এই ঘটনায় আতঙ্কের কিছু নেই। সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি হলো তেজস্ক্রিয় ধুলো উড়ে যাওয়া। কিন্তু তা এখনই হওয়ার আশঙ্কা কম।’ কারণ, পুরনো ‘সারকোফাগাস’-এর ভিতরে এখনো মোটা কংক্রিটের স্তরে তেজস্ক্রিয় ধুলো আটকে রয়েছে, যার উপরেই বসানো নতুন সুরক্ষা কাঠামোটি। ২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬। রাতারাতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল চের্নোবিল। সরকারি হিসাবে ৩১ জনের মৃত্যু, আর অগণিত মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তা—অসংখ্য অদৃশ্য ক্ষতচিহ্ন। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষকে এলাকা খালি করতে হয়েছিল। ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর তৎকালীন সোভিয়েত সরকার তড়িঘড়ি করে রিয়্যাক্টরটিকে ঘিরে ফেলে কংক্রিটের বিশাল সারকোফাগাসে। সেটির আয়ু ছিল মাত্র তিন দশক। তাই আরো শতবর্ষের জন্য বিপর্যয় রুখতে তৈরি হয় নতুন ইস্পাতের আবরণ। কিন্তু গত তিন বছর ধরে চলা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ সেই কাঠামোতেও নয়া চাপ তৈরি করেছে। ২০২২ সালের আগ্রাসনের প্রথম মাসেই চের্নোবিল এলাকা রুশ বাহিনীর দখলে ছিল দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি, যা নিয়ে তখনও উদ্বেগ বাড়ে বিশ্বজুড়ে।
ডিসেম্বরে শুরু হওয়া দেশব্যাপী পরিদর্শনে আইএইএ একই সঙ্গে ইউক্রেনের নানা বিদ্যুৎ সাবস্টেশনও খতিয়ে দেখছে, নিউক্লিয়ার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সেগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রোসি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এগুলি না থাকলে পারমাণবিক রিয়্যাক্টরের কুলিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়।’ এমন সময়েই শুক্রবার রাতে আবারও রুশ বিমান হামলা ইউক্রেনের শিল্পনগরী ক্রেমেনচুকে। চরম চাপের মধ্যেই চলছে দেশের জ্বালানি অবকাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন। চের্নোবিল কেন্দ্রের সুরক্ষা আবরণে এ ক্ষতি আপাতত বিপদের দরজা খুলে দেয়নি ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়িয়েছে, এ কথা জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থা।
❤ Support Us








