Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • মার্চ ২০, ২০২২

অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

পর্ব ৮

অংশুমান কর
অন্য ভাষা ভিন্ন স্বর

annya-bhasa-bhinnya-swr


 গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে, বিদেশি ভাষার বহু স্বর, বহু সুর, নানা রকম ভাষাভঙ্গি আর বহুমাত্রিক বিষয়ের সংযোজনে ঋদ্ধ হয়েছে আমাদের কবিতা পাঠের মগ্ন চেতনা। কিন্তু এই উপমহাদেশের উত্তর আর দক্ষিণ, পূর্ব আর পশ্চিমের কবিতা, কবিতা ভাবনা দূরে পড়ে রইল এখনও । কেন ? ভারতীয় ভাষাচর্চায় অনীহা, না এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আরেক প্রতিবেশীর, আরোপিত প্রকান্তরে অনুশাসিত দূরত্বই তৈরি করেছে অপরিচিতির চৌহদ্দি ? যুক্তিপ্রসূত জিজ্ঞাসা নিয়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষার কবিতার ধারাবাহিক তরজমায় প্রতিস্পর্ধী, সমান্তরাল চিন্তার বিশিষ্ট সহযোগী অংশুমান কর


নী ল ম ণি  ফু ক ন

আধুনিক অসমিয়া কবিতার অন্যতম প্রধান কবি নীলমণি ফুকন (১৯৩৩-)। অনেকে বলেন যে, তাঁর কবিতা প্রতীক আর কুয়াশাময় এক রহস্যে মোড়া। এও শোনা যায় তাঁর কবিতায় ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের প্রভাব পড়েছিল। কবিতা রচনার জন্য নীলমণি ফুকন পেয়েছেন জ্ঞানপীঠ, সাহিত্য অকাদেমি সহ একাধিক পুরস্কার। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপ। পেয়েছেন পদ্মশ্রী সম্মানও।

 

কবিতা তাদের জন্য যারা কবিতা পড়বে না

একজন কবি বলেছিলেন
কবিতা তাদের জন্য যারা কবিতা পড়বে না
তাদের হৃদয়ের ক্ষতগুলোর জন্য
তাদের আঙুলগুলোর জন্য যে-আঙুলগুলোয় কাঁটা বিঁধে আছে
জীবিত ও মৃতের
যন্ত্রণা আর আনন্দের জন্য
সেই চিৎকারের জন্য যা
রাতদিন রাস্তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায়
মৃত্যুর অর্থ আর জীবনের
শূন্যতার জন্য
ধ্বংসাবশেষ যাদের অভিশাপ দিয়েছে সেই কালো পাথরগুলোর জন্য
তরুণীদের কামুক দুই ঠোঁটের মধ্যিকার লাল তাপ্পিটার জন্য
কাঁটাতারের ওপর ডানা ছড়িয়ে বসে থাকা
হলুদ প্রজাপতিগুলোর জন্য
শামুক, পতঙ্গ আর শ্যাওলার জন্য
বিকেলের আকাশ ধরে একাকী উড়তে থাকা পাখিটার জন্য
জল ও আগুনের দুশ্চিন্তার জন্য
পাঁচ কোটি অসুস্থ আর অভুক্ত বাচ্চাদের মায়েদের জন্য
রক্তের মতো লাল হয়ে যাচ্ছে যে-চাঁদ তার আতঙ্কের জন্য
প্রতিটি স্থির হয়ে-যাওয়া মুহূর্তের জন্য
যে-পৃথিবী ঘুরেই চলেছে তার জন্য
তোমার থেকে পাওয়া একটি চুম্বনের জন্য
মাটির দেহ মাটি হবে
এই পুরোনো প্রবাদটির জন্য।

 

তুমি আমাকে উপহার দিয়েছিলে
(ভাস্কো পোপাকে)

তুমি আমাকে তোমার একটা হাত উপহার দিয়েছিলে
সেই হাতটা যে-হাত দিয়ে তুমি
বসন্তের প্রথম সূর্যকে তুলে ধরতে
অশ্বারোহী সৈন্য যে-হাতকে দলিত করেছিল

চিরযৌবনের বিজয়-উল্লাসকে
তুমি চূর্ণ করতে আর তারপর পরে নিতে তোমার চোখে

আমি তোমাকে কী দিতে পারি
আমার হৃদয়ে বোনা একটি জুঁই
আমি এনেছি তোমার জন্য

তোমার সেই হাতটাকে পরে নিয়ে
ফুলটিকে তুলে নাও

সূর্যের রশ্মি হিসেবে
তুমি আমার জন্য রেখে দিয়েছ একমুঠো মাটি
মুষ্টিভরা শব্দ এক দঙ্গল মেঘ

আমি তোমাকে কী দিতে পারি
নিজের রুধিরকে নৈবেদ্য বানিয়ে
তুমি সবাইকে ঋণী করে রেখেছ

তোমাকে খুঁজে পেয়ে আমি আমার নিজের চোখেই আবিষ্কার করেছি
একটি রামধনু
আমার হৃদয়ে মানুষের একটি হ্রদ

আর বেলগ্রেদের রাস্তাগুলোতে
একটি প্রদীপ্ত অনন্তের দুপুর

তুমি আমাকে উপহার দিয়েছিলে তোমার একটা হাত
বিপ্লবীদের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা

চিত্র: নীল পবন বরুয়া

আর দু-দিন পরে

আর দু-দিন পরে
কুয়াশা এই শহরটাকে মুড়ে ফেলবে
মুড়ে ফেলবে এমনকি সেলাইয়ের ছুঁচটাকেও

পাহাড় আর নদীর মতো
মানুষেরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে নির্গত করবে কুয়াশা
অথচ তারা এটা জানতেই পারবে না

রক্তাভ সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে
পেকে-ওঠা কমলালেবুগুলো ঝরে পড়বে
মেয়েদের আঙুলগুলো ঠাণ্ডায় অসাড় হয়ে যাবে

মানুষের মনের শীতল পরিত্যক্ত পথটি দিয়ে
শুকনো পাতাদের করুণ মর্মরধ্বনি
হেঁটে যাবে কবর-জিয়ারতকারীর পদধ্বনির মতো

ঝাঁকে ঝাঁকে মুনিয়ারা উড়ে যাবে
অনন্তের দিকে
নীরবে পাড়ি দেবে একটি মহাকাশযানে চড়ে

আবারও একটা হলুদ সময় এ চত্বর দিয়ে হেঁটে যাবে
অথচ মানুষেরা তাকে একেবারেই জানতে পারবে না
তারপর তারা প্রত্যেকে বদলে যাবে
শীতকালের একটি কঙ্কালসার চেহারায়

ইতিহাস

আমরা দু-জনেই একটা জ্বলন্ত জঙ্গলকে দাঁড় টানতে টানতে অতিক্রম করছিলাম
কুয়াশার মতো একটা ধোঁয়ার সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে কষ্ট করে এগোচ্ছিল পাখিরা
আমরা সাপগুলোকে দেখেছিলাম, সংখ্যায় অনেক
জল কেটে কেটে এগোচ্ছিল

এগোতে এগোতে আমরা দেখলাম
জলের খুব কাছে একটা ছোট্ট কুটির
আমরা নোঙর বাঁধলাম ঠিক তখনই যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছিল।
কুটিরে কেউ ছিল না, এক কোণ থেকে
এখানেও ধোঁয়া উঠতে শুরু করল
আমরা শুনতে পেলাম একটু দূরে শেকল-বাঁধা আকাশ
একজন অসহায় ভিক্ষুকের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে

ধোঁয়া আর রাত্রির মধ্য দিয়ে
আমরা আবার দাঁড় বাইতে শুরু করলাম

♦–♦–♦


❤ Support Us
error: Content is protected !!