Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • এপ্রিল ২৪, ২০২২

দশইঞ্চি প্রজাপতি

প্রথম পর্ব

সাধন চট্টোপাধ্যায়
দশইঞ্চি প্রজাপতি

উ♦প♦ন্যা♦স

রবিশেখর নিখিলের মুখোমুখি পড়ে যাবে অকস্মাৎ আজ রাতে । রাতের শহরে । বলতে গেলে আচমকা ।
প্রকৃত অর্থে রাতের শহর বলতে যা বোঝায় রবিশেখরের অভিজ্ঞতা নেই । তাছাড়া, নৈশশহর বলতে সাধারণত মেট্রোপলিস বোঝায় । এটি তা নয়। মহকুমা হলেও কিছুকাল আগেও যেন মফঃস্বলের গর্ভছাপ পৌরসভার কিছু কিছু ওয়ার্ডে পরিকীর্ণ ছিল ।ফাঁকা মাঠ, পুকুর, ঝোঁপঝাড়, শীতের বিকেলে টিয়েপাখির ঝাঁক, একটু-আধটু বাঁশঝাড় আর মাটির বাড়ি । এখন টোটো-অটো আর ফ্ল্যাটের ঔদ্ধত্য। অধিকাংশই G+4, কোথাও কোথাও বিশ-একুশ তলার বিশেষ শ্রেণীর আবাসন গড়ে উঠছে ।
রবিশেখর কলকাতা ছাড়া কোনো মেট্রপলিস দেখেনি । শুরু থেকে প্রবাসী বাঙালি।জন্ম-লেখাপড়া ভাগলপুর । খুবই নির্ঝঞ্ঝাট, ছাপোশা স্বভাবের সাংসারিক মানুষ।কলকাতায় অফিস করতে যায় বটে, এবং বেসরকারি উচ্চপদের গৌরবও আছে। সংসারজীবনে তেমন দাপট নেই ।
রবিশেখরকে আটটার মধ্যে ডোরবেল বাজাতেই হয়। বিশেষ বাধাবিপত্তিতে উৎপলকে আগাম জানায় দেরি হবে, এই-এই কারণ।বড়জোর দশটা। তারপর তো আবাসনে ঢোকাতাই হাঙ্গামার। কেয়ারটেকারকে ফোনে ডাকতে হয়।
আর বাইরের কাউকে কোনো কারণে ঢুকতে হলে সিকউরিটি রীতিমতো জেরাধরণের পুছতাছকে খুশি করতে হয়।
আজ রবিশেখর নিখিলের মুখোমুখি পড়ে যাবে রাত সাড়ে বারোটায়।শহরতলীর রেলস্টেশনে ঘেঁষা অঞ্চলটা তখন সারাদিনের যন্ত্রদানবের ঝমঝমানি ছেড়ে হাঁফ ছাড়ে। আপ-ডাউনের সর্বশেষ গাড়ি চলে যায়। পাগল, দুর্বূত্ত, ভবঘুরে, আশ্রয়হীন আর অসংগঠিত শ্রমের কিছু মানুষ—রাতের শহর দু-চারটে মতলববাজ ছাড়া পঠঘাটে কেউ কারও ওপর আস্থা রাখতে চায় না।
নিখিল পাগল।একধরণের সেয়ানা, নাছোরবান্দা, খাপ্পা মেজাজের এক পাগল মধ্যবয়সী।প্রায়ই সে দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে থমকে কারও মুখে এমন সন্দেহ ভঙ্গিতে এমন ত্যারচা দৃষ্টি দেয়—যেন রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের কেউ ছদ্মবেশে পাগল সেজে কোনো টার্গেটকে খুঁজছে। আবার খুশি থাকলে, সোজা কারও সামনে এসে হুস করে হাতটা পেতে দেয় ।
দেখি মশাই দুটো টাকা ছাড়ুন তো! …চা খাব!
ছুঁচলো নখে ময়লামাখা, অপরিচ্ছন্ন কোচকানো পাঞ্জাবি, ঢোলা ফুলপ্যান্ট, একঝাঁড় কাঁচাপাকা চুল, থুতনি ও সারা গালে অযত্নের দাঁড়ির গুলটি কিন্তু চোখজোড়া যেন প্রতিশোধপ্রিয়। হাত-পায়ের কাঠামো দেখলে মনে হয় জবরদস্ত চেহারা ও ফর্সা মুখমণ্ডল ছিল ।
রবিশেখর এর অতীত জানে না। কথাও নয় জানবার। এটা তো উৎপলার শহর ।
শুধু দোকান বাজারের জন্যে স্টেশন রোডে এলে, নিখিলকে পাওয়া যায়।এবং সে দুরুদুরু ও সচেতন কৌশলে পাগল এড়িয়ে চলে। রবিশেখর একাই বা কেন, ব্যাংক, বাজার, স্টেশন —যেখানেই নিখিল হানা মারুক, মানুষ সামলে চলে। এ-শহরে তখন নতুন, নানা কিসিমের বহু ভাষাভাষি মানুষের সংখ্যাই বেশি। যারা ষাট-কি পঞ্চাশ বছর আগে শহরে এসেছিল, যারা মফঃস্বলী দিনগুলোর সাক্ষি—তাদের সত্তর-আশিভাগই গত হয়েছে। অঠবা, রোগ জড়ায়, হাঁটুর ব্যাধিতে গৃহবন্দি। তাদের কেউ কেউ হয়তো স্মৃতিচ্ছলে স্মরণ করতে পারবে, যখন ফ্লাইওভার, ফ্ল্যাট, রেলস্টেশনে ভীগর্ভস্থ পথ বা ভেঙেচুরে মল বা প্যান্টালুন হয়ে স্টেশন পথে দৈনিক কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলত না, জবরদখল কলোনি অধ্যুষিত পুরনো মফঃস্বলটায় মিঃ অনিল সিংহ-র ছেলে নিখিল-এর মা সুন্দরী ফর্সা এক তামিল মহিলা ছিলেন এবং অতিসুন্দরী লম্বা চওড়া দুই অবিবাহিত দিদির পেছনে কোনকোন যৌবন ইলোপের পরিকল্পনা করেছিল দুর্বল হৃদয়ে । কেউ হয়তো ঠিকঠিক ঠিকানাটিও বলে দিতে পারবে। মিঃ অনিল সিংহ ছিলেন রেলকোম্পানির উচ্চঅফিসার এবং এই আবাসনের লাগোয়া কোয়াটার সদৃশ এ টাইপের কিছু উচ্চঅফিসারদের ব্যক্তিগত মালিকানার বাড়ি। ছোটখাট বাগান চর্চা চলত সেখানে।
রবিশেখর কোনো যুক্তিতেই সেই স্মৃতির মালিক পুরনো দলের নয়। পুরোনোরা এখন মাইনরিটি, রবিশেখর মেজরিটির দলে। বছর দশ বারো, স্টেশনের লাগোয়া, শহরের কেন্দ্রে, অতীত ঐতিহ্যের একটি স্পটে চারতলায় সাজানো গোছানো ফ্ল্যাট নিয়ে আছে। তবে, রবিশেখরের স্ত্রী উৎপলা এ শহরের মেয়ে। ফ্ল্যাট উৎপলারই উদ্যম ও কৃতিত্বে। তার জন্ম যে পরিবারে, তারা ওপার ছেড়ে এসে এ অঞ্চলে টিমটিমে স্টেশনটির লাগোয়া বাগান ও ইটভাটা সংলগ্ন জমিটা জবরদখল করে রাতারাতি হোগলার ছাউনিতে সার সার তাঁবু বানিয়ে পুলিস গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল । জমিমালিক আদালতে গিয়েও কিছু করতে পারেননি।
উৎপলার সবকিছুই এই শহরে। জন্ম, বাল্যকাল, লেখাপড়া, মেয়ে হয়ে ওঠা, সংসারের ভাগ্য লক্ষ্মী ফেরা, যৌবনের ছলাকলা—সবই এ শহরে—নানা ঘাটের জল খেয়ে। সংসারে স্বাচ্ছল্য আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে যা হয়। উপরন্তু মেয়েটির মধ্যে জীবনস্রোতের ফেনিল উচ্ছ্বাসকে দুঅঞ্জলিতে সানন্দে তুলে নেয়ায় বেপরোয়াভাব ছিল । আজও আছে সে সবের ঢেউ।
এইসব কারনেই নির্ঝঞ্ঝাটে প্রবাসে বিয়ে। কিছুদিন কেটে গেলেই শ্বশুড়বাড়ির সংসার ছিঁড়ে রবিশেখরকে এনে, অবাসনের হাজার বারোশ স্কোয়ার ফুটের জলবাতাসে দিব্যি সংসারটি গড়ে নিয়েছে।
আজ রাতে রবিশেখর দেখতে পাবে নৈশআলোয় ফ্লাইওভারের ফুট ধরে কুচওয়াজের ভঙ্গিতে নিখিলের চলাফেরা। লেফট-রাইট, লেফট-রাইট, অ্যাবাউট টার্ন—এর ভঙ্গিতে স্টেপ ফেলে ফেলে একবার এগিয়ে যাচ্ছে, ফের আসছে ফিরে। রণক্ষেত্রে হাজির হবার আগে, ক্যানটনমেন্টের জওয়ানরা সকাল-সন্ধ্যায় যেমন মহরায় যোগ দেয় ।
নিখিল তেমনি ফ্লাইওভারটার এ-মুড়ো থেকে ও মুড়ো বার কয়েক কুচকাওয়াজের ভঙ্গিতে পদক্ষেপ সেরে, ছোট্ট একটা সিঁড়ির নীচে একটা ভারি যন্ত্রের শরীরে হাত বুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে। পা দুটো কাঁচি মারার স্টাইলে, বাঁহাতে যন্ত্রটা ছুঁয়ে, ডান হাতে স্যালুট ঠুকবে।
যেন সে কল্পিত কোনো বিজ্ঞাপন সংস্থার হয়ে যন্ত্রটার উৎকর্ষ বোঝাচ্ছে। ক্যামেরা ম্যান যেন অদৃশ্য কোথাও প্রস্তুত । আর নিখিল প্রস্তুতকারী কল্পনাটির সেবায় রেডি ।
দিনের প্রহরে ফ্লাইওভারের একপ্রান্তে রোদে ভাজাভাজা অবস্থায় যন্ত্রটাকে যতই আলিসান দেখাক, রাতের কর্মকাণ্ডে চাঞ্চল্য ও গতি পেয়ে গেলে, যেন মানুষ সত্তার অংশ বনে যায়। ওটা একটা গুঁড়ানি যন্ত্র—অনায়াসে, প্রবল লৌহত্বে যার সাহায্যে সব কিছু বাঁধা কংক্রিটের বাঁধা সুস্থ সুষমায় দুরমুশ করা যায়। ইংরিজি নাম বুলডোজার । বহুকাল আগে, ইমার্জেন্সি পর্যায়, রাজধানী দিল্লিতে, সেবার ‘বুলডোজার’ শব্দটি সারা ভারতে রাজনৈতিক প্রতীকী হয়ে উঠেছিল । অনেকেই সে-সব স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে মৃত ।
যা বলছিলাম! দিনের ওই ঘড়ঘড় দানবীর কৃতকর্মের পর, বোধ হয়, আলো অন্ধকার ঠায় বিশ্রামে দাঁড়িয়ে থাকলে, যন্ত্র অভ্যন্তরীণ কলকব্জার কার্যকরণ ঝেরে ফেলে । যেন ভুতুরে দানব । উড়ালপুলটায় উঠবার মুখে ঠায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় তাকে। চারপাশে ঘিরে বাতিদন্ডের টুকরো টুকরো আলো, অংশবিশেষে পরিমাণে কম-বেশির ছক কিংবা স্থানবিশেষে পুরোটাই অন্ধকার। আলোহীনতায় ভুগছে।
নিখিল আজ আলো অন্ধকারের সীমানায় যন্ত্রটার কাছে দাঁড়াবে, দাঁতাল মস্ত যন্ত্র খাঁচাটিকে তার অনুমানে ঠেকবে যেন মোটা কোনো ছায়ার খাম্বা। প্রথম অবস্থায় এমনই মনে হবে ।কাছে এসে নিবিড় পরীক্ষায় বোঝা যাবে খাম্বাটার শরীরের একটা অংশে প্রবল আলোর টুকরো। যে কোনো পড়ুয়া—পাগল কিংবা সুস্থ মস্তিষ্কের —বুঝে নিতে পারবে, মেড ইন ইউ এম এ খোকাই । তাহলে যন্ত্রটির জন্মস্থান স্পষ্ট।এখন সে এ মুহূর্তে সাগর পাড়ি দিয়ে আমদানি বাণিজ্যের নিয়ম ডিঙিয়ে কলকাতা মেট্রোপলিটন উন্নয়ণ কর্তৃপক্ষের —কে. এম. ডি. এর—পোষা অঙ্গ ।
নিখিল খুঁটিয়ে আর কী দেখতে পাবে জানি না, রবিশেখর টের পাবে খাঁচাটার একটা লম্বা হাতের ওপরবিশাল একটা প্রজাপতি । নিশ্চিন্তে সেঁটে আছে। তার চারপাশে হরেক ধরণের দিশি প্রজাপতি—লাল, নীল, হলুদ—ফড়ফড় উড়ছে–শুঁড় ঠেকিয়ে মধু, রেণুর সন্ধান করছে। কিন্তু যে প্রজাতির পতঙ্গগুলো পবিত্র নান্দনিকতা উস্কে দেয় —- সে প্রজাতির নয়। প্রথমটা লম্বায় দশ ইঞ্চি, ঘন সবুজ, কিন্তু বিশালাকার দুটি চোখ নিয়ে চুপচাপ, আর খুচরো মেটে রঙেরগুলো চারপাশে স্থূলভঙ্গিতে উড়ছে।
যাঁরা প্রজাপতি গবেষক নিজেরাই ভেবে নিচ্ছেন, এর পরই লেখকের কলমে একপ্রস্থ পতঙ্গ বিষয়ক কোনো প্রস্তাবনা থাকবে। জন্ম বৃত্তান্ত, উদ্ভব, দুনিয়ার কত প্রজাতির প্রজাপতি আছে তাদের বৈজ্ঞানিক নাম ধাম ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনুরোধ, প্রয়োজনে ব্রিটানিকা ও গুগুল খুঁজে দেখতে পারেন তাঁরা।
প্রতিপক্ষে, জরুরি মনে হচ্ছে রবিশেখর, উৎপলা, নিখিলপাগল বা কিছুপরে আফ্রিকার নানা দেশের কিছু মেডিকেল ছাত্রদের যাঁরা স্পটে হাজির হয়ে সময়ের ব্যবধানে —তাঁদের নিয়ে কিছু ফিরিস্তি জানিয়ে রাখা। শহরটা নিয়েও দু-চার কথা বলে রাখা জরুরি ।
এলাকার বৃষ্টিপাত, বায়ুচাপ ও মরশুম বদলের সময় যে সব অদ্ভুত, অনারোগ্য ব্যাধির প্রাদুর্ভাব ঘটে, তাতে পুরনো দিনের পরিবারগুলোয় যে জন্ম-মৃত্যুর তালিকা জমা থাকত—অস্বাভাবিক বদলে যায়। অথচ, হিসেবটি সাধারণের চেতনায় ঘা দেয় না।
যথারিতী, এখন শহরবাসীর অধিকাংশই দাঁতের যন্ত্রনায় ভোগে, ভয়াবহ একপ্রকার যন্ত্রণা—যাতে মানুষের প্রতিবাদের ভাষা বেরুতে চায় না।
তাই দাঁততোলা, গাল ব্যাঙের মতো ফুলে থাকা, দিনরাত কাতরানো, বাঁধানো পাটি ধারণ, স্কেলিং, রুটক্যানাল—কত যে নতুন নতুন বাস্তবতা চালু এ শহরে এখন । তুলনায় এখানে দাঁতের ডাক্তার কম। চেম্বারগুলোয় ঢুকলে অত্যাধিক বেশি মজুরি গুনতে হয়। তাই সাধারণ গেরস্থদের অনেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে এ শহরের সীমানায় বহুভাষী শ্রমিক অঞ্চলে চিনাদের চেম্বারে বসে থাকে । অপেক্ষার ঘরটিতে দেখা যায়, সকলেই গালে হাত ঠেকিয়ে তেতো খাওয়া মুখে কাগজের ছোটোছোটো টিকিট হাতে অপেক্ষা করছে ।
এ শহর থেকে যারা যায়, একটু লুকিয়ে চুরিয়ে রাখে নিজেদের। প্রতিবেশীরা জেনে ফেললেই সবজান্তার হাসি দিয়ে বলবে চি—না দোকানে? ছ্যা! ছ্যা!
কেন ভাই?
স্রেফ মারা পড়বেন!
অনেকেই যায় দেখছি?
যাবে না কেন, অনেকেই তো তুলসীপাতা তুলতে গিয়ে বিছুটিপাতায় হাত রাখে!
বেচারা তবে যাবে কি, মিনমিন করে, চিনা হলে কি হবে, ডাক্তারি পাশ করা—কলকাতার আর আহমেদ থেকে…
বুঝবেন! বুঝবেন! দাঁতের ক্যান্সার ঘরে ঘরে এ জন্যই ।
বেচারির কি মনের অবস্থা! দুরুদুরু আতঙ্ক ও নিজের ওপর গ্লানির ছায়া ক্রমেই চেতনার বীজ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অবচেতনে সকলেই মৃত্যুভয় পোষণ করে কিনা।
তখন ফের ধারকর্জ করেও শহরের ডাঃ পোদ্দারের চেম্বারের ঠান্ডাঘরের চেয়ারে অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়। কয়েক শ টাকার প্যাকেজের অপেক্ষায়। প্রতি দাঁতে।
এইসব পাবলিকের সংকট নিরসনেই তো শহরে গড়ে উঠেচে প্রাইভেট একটি ডেন্টাল কলেজ। জয়েন্ট নামক পরীক্ষায় ব়্যাঙ্ক নিয়ে ছেলেমেয়েরা গ্যাঁটখরচায় পড়তে আসে, আবার সাধারণের জন্য চিকিৎসার বন্দোবস্ত আছে।
এ-শহরটা বর্তমানে শহর বনে যাওয়ার আগে, স্বদেশী যুগের প্রেরণায় কলকারখানা, বিশেষত সুতো কলের প্রাণকেন্দ্র ছিল । অবিশ্যি সবই পরবর্জিত পরিত্যক্ত ভাঙা দেউলের মতো, কারখানার কংঙ্কাল হয়ে পেটের জমি বাগান আগলে ছিল। তারপর একদিন কোথা থেকে বাতাস উঠে ঝড়ের মতো দেয়াল-খাঁচা লুপ্ত হয়ে, আবাসনের জমি হিসেবে শহরের গর্ভধারণ করে, এখন কংক্রিট আকাশমুখী।
সে সবই একটি কারখানার একলপ্তে ২৬ বিঘা জমিতে ডেন্টাল কলেজ, পাশাপাশি ইন্জিনিয়ারিংও । জমিদালালদের রমরমার সূত্র ধরেই হরিয়ানায় জনৈক সুসন্তান জোত সিং প্রচুর মালকড়ি ঢেলে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান দুটি গনে তুলেছেন ।এখন তিনি প্রয়াত—উত্তরাধিকারদের রমরমা চলছে। বংশগত ব্যবসা ছিল খাটালের। গোরু আর ভেড়ার দুধ।
এখন দুপুর। ঝাঁ ঝাঁ টকটকে রঙের টান টান একটি দুপুর । ছুটির দিন, তার চূড়ান্ত তাপের দাপট। স্টেশন এলাকাটা —বিশেষত, সুদৃশ্য এবং আয়াসি বিলাসবহুল আবাসনটির পশ্চিমমুখো ফ্ল্যাটগুলো সূর্যের আগুনে ভাজাভাজা। ওঁ জবাকুসুম শঙ্কাসং ক্যাশ্যপেয়ং…
মানুষের নিবেদনের মন্ত্রটি আবাসনবাসীরা বেচারা নক্ষত্রটির উদ্দেশে উৎসর্গ করেনা ।
রবিশেখরের ফ্ল্যাটটা চারতলায়। অবশ্যই এসি বসানো—নইলে বিলাসবহুল কেন হবে।তবে ব্যক্তি রবিশেখর মানুষটি তো এ শহরে উৎপাটিত হয়ে এসেছে।এখনও খাপ খাওয়াতে পারেনি নিজেকে। অর্থকে আজও সে প্রয়োজনে ব্যয়যোগ্য মনে করে। বিলাসী হতে চায় না। জন্ম থেকে ভাগলপুরের চারপাশ ভারতীয় ঐতিহ্যে ত্যাগপন্থায় আস্থাবান হতে শিখিয়েছে।
কেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিতা। অর্থ এই নয়, কাঞ্জুস হও।
তবে বউয়ের দাবি উপেক্ষা করে না। এমন কি, খানিক তর্ক-বিতর্কের পরই সে হার মেনে নেয় সংসারে।
এসি বসানোর কথা উঠতেই, উৎপলকে বোঝাতে চেয়েছিল, দেখো সুবিধে এবং অসুবিধে …
যন্ত্রের দুটোই থাকে ।
যেমন ? উৎপলার সম্মুখ সময়ের আয়োজন দেখেও বলে, অলস করে দেয়…দেশটা তো গ্রীষ্মমণ্ডলের। …দ্বাপর-ত্রেতা থেকেই গরম চলছে কিনা?
জ্ঞান মারিওনা তো। …আমার লাগবে ব্যস। কালই চলে যাও, ব্লুস্টার এর এজেন্ট আছে স্টেশন রোডে…বুবাই রাতে ঘুমুতে পারছেনা, উনি দেশের ঐতিহ্য খুঁজছেন।
রবিশেখর হাসুহাসু মুখে আমতা আমতা করে। ন্যায় নীতিকে মান্যতা দিতে চাইলেও, বউয়ের প্রতি পৌরুষ দেখানো আদৌ স্বভাবে নেই । নাকি তার কোনো গোপন শারিরীক ত্রুটি।
উৎপলার মুখোমুখি কোনো বিষয়ে চাপে পড়ে গেলে , কাচুমাচু হয়ে বিষয়ান্তরে চলে যায়।
ভোল্টাস কোম্পানিটা কেমন?
কতবার বলবো বলোতো? …হাঁদারাম! ব্লুস্টার বেশি রিলায়েবল। উৎপলা বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য কাজে ফেরে।
রবিশেখর কারিগরি জগতেরই মানুষ।মুখোমুখি এখন চেপে গেল।

ক্রমশ..


❤ Support Us
error: Content is protected !!