Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • মে ২৯, ২০২২

দশ ইঞ্চি প্রজাপতি

পর্ব ৫

সাধন চট্টোপাধ্যায়
দশ ইঞ্চি প্রজাপতি

অলঙ্করণ: দেব সরকার

উ প ন্যা স

ডাইনিং টেবিলটায় বসে যদুনাথ চা-এ চুমুক দেয়। চা খেতে তার দীর্ঘসময় লাগে । গরম চা তে প্রায়ই তার ঠোঁটে ছ্যাকা লাগে।
বসে ভাবছিল, কী মতলব বাতলাবে এদের কাছে? …লোকগুলো সত্যিই গাড়োল! শালা আগে যে টুকটাক উচ্ছেদ পাবলিকের মধ্যে বদলের উত্তেজনা হুজুগ হয়ে উঠেছিল, নানা ছোটখাট লোকাল নেতারা নানা ঝান্ডার নীচে দোকান সমিতিগুলোকে ফেডারেশন বানিয়ে একঘাটের জল খাইয়ে বার কয়েক সামলে দিয়েছিল, ভবিষ্যত এর চিন্তা করিস নি তখন? ভাবলি, সব সমাধান পাকাপাকি হয়ে গেল?
হাজার হাজার দোকান, গাদাগাদি ফুটব্যবসায়ী, তোলাবাজি, হাতসাফাই, সমিতিগুলোর আন্তঃ ছোটখাট নানা স্বার্থ–রমরমার যুগে ছোট্ট এলাকায় রোজ লক্ষ লক্ষ টাকার মাল কেনাবেচা চলতে থাকলে, নানা খুটিনাটি সমস্যা –জাল ট্রেডলাইসেন্স, দমকলের আইনকে কলা দেখানো, অথচ এ. সি.মার্কেট এর চিহ্নিত অংশকে উপেক্ষা করে গুন্ডামি-মস্তানি, থানা পুলিশ, পৌরপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা অধিকার করিয়ে মাসোহারা টাকা খাওয়া, মোবাইল চুরির ঠেক, রাস্তা অধিকার, হুক করে বিদ্যুতের ব্যবহার, শৌচালয়টিকে ‘পে এন্ড ইউজ ‘-যে কলঙ্কায়িত করা নিয়ে পালিটিকাল টানাপোড়েন– স্টেশন রাস্তাটার পাঁচশ-সাতশ মিটার এলাকা যেন নিত্য উন্নত ও আধুনিকতার একটি মানদন্ড হয়ে আছে। সমিতিগুলোর যৌথ সংঘটন এখন শহরের জীবন যাপনের–বিশেষত শহরের–অনুকরণ পরাকাষ্টা হয়ে উঠেছে।
এরাই মিউনিসিপ্যালিটিকে চাপ দিয়ে বিশাল খাঁচার একটি টাউনহল ধরণের প্রতিষ্ঠান আদায় করেছে। যেখানে এই শহরের সংস্কৃতি ও বিনোদনের ভিয়েন। ছোটখাট নাট্যদলের করিৎকর্মে যেমন ন্যাটোৎসব হয়, আবার একদলের উৎসাহে শীতকালে ফ্যাশন প্রতিযোগিতা ঘটতে দেখা যায়। অনেক টিভি সিরিয়ালের মুখকে এলাকাবাসী  রাম্পে হাঁটতেও দেখেছে এখানে। আবার ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে এ-চত্তরে অনেক নাগরিককে বাষ্পাচ্ছন্ন কণ্ঠে মাইকে ফাটিয়ে দিতে শোনা যায় যেমন, ‘নোয়াখালি সম্মিলনী’ বা অষ্টপ্রহর কীর্ত্তন থেকে ট্রেডইউনিয়নের সম্মেলন ও দলীয় কর্মি সম্মেলনে সারা চত্বর সিকলি আর ছোটোখাটো পতাকায় মুড়ে ফেলা হয়।
ইদানীং বিটি রোড ভেঙে ছ’লেন হয়ে উন্নয়নের শৃঙ্খলা আনতে ওপাশটা করপোরেটের নজরে পড়ে যেতে, স্টেশন রোডের ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর কপালে ভাঁজ পড়েছে। তাই, আগের মতো স্টেশন এলাকা কর্তৃত্ব করতে পারে না–কয়েকটা সিজন শারদ মার্কেটিংয়ে ঝাড় খেয়েছে যদিও–সংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণটি টাউন হলের সুবাদে ঝান্ডার জোরেই নিয়ন্ত্রণ করে ।
তাছাড়া, স্টেশনের কাছেই, ভাঙাগড়ার মাঝেও দেড়শ বছরের পুরনো স্কুলটার কোনো অংশই ভাঙা পড়েনি যদিও, স্টেশন এলাকার বসতিগুলো অঞ্চলটিকে আমাদের মনে করে। এককালে, এখানের বহু ছাত্র আজ সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত । এই যে ফুটের ব্যবসায়ীদের আজ মাথায় খড়্গ ঝুলছে–বহু আছে স্কুলটার পুরনো ছাত্র। কেউ সিক্স, এইট বা নাইন অবধি পড়ে ছেড়ে দিয়েছে–আজ গোঁফ , ফুঁড়ি হাঁকিয়ে ফুটের মালিক । অবচেতনে, পাবলিকের মুখে স্কুলটার গৌরবগাথা শুনলে, আত্মগৌরব বোধ করে ।
তাছাড়া, তপেশ ইদানীং শাসক দলের বিশেষ পান্ডা প্রতিনিধি। তিন তিনবার নির্বাচনে জিতেছে। ছোটখাট রাষ্ট্রমন্ত্রীও বটে–যদিও দপ্তরের নামটা পাবলিক বুঝতেও পারে না। কিন্তু ক্ষমতার মজা একটাই–বারো হাত লম্বা হলে বীচি তের হাত থাকবেই ।

জমির চরিত্র বদল করার ব্যাপারে ভূমি ও ভূমিরাজস্ব বিভাগের কত ছোটখাট  অফিসারকে যে ঘুশের সিন্ডিকেটে জড়িয়ে রাখত। স্থানীয় ক্লাব ও সন্তানদের মুখবন্ধকরা থেকে থানা যদুনাথের যাদুর হাত সর্বত্র। আর এইসব মানসিক চাপ হাল্কা করতে সপ্তাহান্তে তারাপীঠ গমন।

আজ অবিশ্যি যদুনাথ উচ্ছেদিত মানুষগুলোর কাতর আবেদন শুনতে শুনতে রুদ্রাক্ষের দানাগুলোয় আঙুল বোলাচ্ছিল । যাদের মধ্যে আজও আকাশচুম্বি ফ্লাটে ফকেও পুরনো জীবনের স্মৃতিতে একটা সম্পর্কের নেতিকতা রক্তে ডাক দেয় কিন্তু ক্ষোভেরও কারণ ঘটে–ব্যাটারা বুঝতেই চায় না, টের পেতে চেষ্টা করে না, চারপাশের জগৎ কী দ্রুতবেগে বদলাচ্ছে। বুঝতেই চায় না, কোন বিপদে কোন দাওয়াই  আগেই প্রস্তুত রাখতে হয়।
আস্ত  এক এক হারাজাদা ! এখন চিঁ চিঁ কাঁদলে হইবো?
সহানুভূনি নিয়েও, চুপচাপ মনের জ্বালায় বিড় বিড় করছিল।
এখন একা একা দুলালীর হাতের চা খেতে খেতে, বর্ণীলীর মতো নানা চিন্তা ছাপিয়ে উঠছিল ।
একটা পুরনো মামলা সংক্রান্ত ভাবনায়।
জমি কেনাবেচার পর্বের খুচরো একটা মামলা আজও বহাল। যেন একটা কাঁটার ডগটি আজও আঙুলের মাংস থেকে বেরুচ্ছেনা অথচ, নানা স্বাভাবিক কাজকর্মে কোনো ব্যাখ্যার ক্ষমতাটুকু ফুটিয়ে দিতেও অক্ষম। মনে হয়, এ কেসটায় হারতে হবে।
যদুনাথের পক্ষ হয়ে সওয়ালকারি পোষা অ্যাডভোকেট বিমল এখনও অক্সিজেন দিয়ে যাচ্ছে, ডিভিশন বেঞ্চে যাবে, প্রয়োজনে আরও–।
এ-সব সাদা হাতি পোষা । দাঁতের কলেজটার প্রতিষ্ঠার সময় জৈত সি-এর সঙ্গে শেয়ানে শেয়ানে লড়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে সে জমির কারবারে পুরোপুরি নেশাচ্ছন্ন ছিল । ‘নীলোৎপল’ ফার্নিচার দেখতই না।
মানুষটার মধ্যে স্পেকুলেশন-এর অদ্ভুত ক্ষমতা। ফাটকায় বিশেষজ্ঞ। ফার্নিচারের অমন রমরমা ব্যবসাটা ছেলেমেয়ে আর কর্মচারিদের ওপর ছেড়ে দিয়ে। উঠে যাওয়া বন্ধ কারখানার জমি ধানমাঠ, জলজমি, কারও বাগানবাড়ি কিনে কাগজ কলের মাটি ফেলে বাস্তুজমিতে রূপান্তরকরণ–শিল্পী বনে গেছল যদুনাথ। জমির চরিত্র বদল করার ব্যাপারে ভূমিও ভূমিরাজস্ব বিভাগের কত ছোটখাট  অফিসারকে যে ঘুশের সিন্ডিকেটে জড়িয়ে রাখত। স্থানীয় ক্লাব ও সন্তানদের মুখবন্ধকরা থেকে থানা যদুনাথের যাদুর হাত সর্বত্র। আর এইসব মানসিক চাপ হাল্কা করতে সপ্তাহান্তে তারাপীঠ গমন।  এমন কি, যদুনাথের এইসব পাগলামি দেখে ভুলু আইচ, খোকা সাহারা অবধি তাজ্জব । নিজেদের মধ্যে গোপন কথাবার্তা হত, কালুদার হলো কি? পাগোল ? শহরে এখন জমির সরকারি দর কত? শুনছি ‘নীলোৎপলা’ ফার্নিচারটা দেখিয়ে ব্যাংক লোন নিচ্ছে ?
কেউ আবার ম্যানেজারকে গোপনে ডেকে বলেছে, এত ক্যাশ পাচ্ছে কোত্থেকে ?
স্থানীয় স্টেটব্যাংক শাখাটির ম্যানেজার রত্নেশ্বর সেন একই আবাসনের বাসিন্দা ছিলেন। এক কোটি টাকা ঋণ দিয়ে, হাতটা জড়িয়ে বলেছিলেন, এটা আমার চাকরি, যদুদা! দেখবেন…ফাঁসব না তো?
যদুনাথ হেসে, ছোট্ট প্যাকেটটি হাতে দিয়ে বলেছিল, মা তারা!
ছি! ছি! রত্নেশ্বর লজ্জায় ছোট্ট জিভটুকু কাটতে, যদুনাথ অভয় দিযেছিল কী বলেন সেন মশায়। …ফাসবেন! জগৎজননী আছেন কী করতে?
মানুষের জীবন তো! …আজ আছে কাল নেই!
হেসে ছিল যদুনাথ। হক কথা সেন মশায়। …ফার্নিচারের ব্যবসা আর পাঁচতলা খানের সিকিউরিটি তো আমার সঙ্গে সঙ্গে যাবে না!
ছি! ছি! মিন করছি না ! রত্নেশ্বর সত্যিই লজ্জা পেয়েছিলেন ।
আড়ালে ভুলু আইচ বলত, এক কোটি লোন নিয়েছে রত্নেশ্বর সেনকে খাতির করে? …জমির দাম কত বাড়তে পারে? ধরলাম ৩ গুন?
তলে তলে ব্যবসায়ীদের পরস্পরের ঈর্ষায়, ভুলু আইচ বা খোকা সাহারা অনুমানই করেনি, কৃত্রিম ভাবে জমির দাম—এই শখের পুরের—কত গুন, কীভাবে বাড়িয়ে তোলার মন্ত্র আছে। এখন এ শহরে জমি কেনা-বেচা রূপকথার কোনো ঘটনা যেন। সদ্য আদম শুমারির রিপোর্টে ছলক্ষ জনসংখ্যা হয়ে গেছে।
রত্নেশ্বর আজ নেই। অবসরের এক মাসের মধ্যে আচমকা অপ্রত্যাশিত ম্যাসিব অ্যাটাক। যদুনাথ কিন্তু মা তারার আশীবার্দে সেন মশাইয়ের উপকারটুকু ভোলে নি। পিতৃহারা মেজ সন্তানটিকে জৈত সিংয়ের কলেজে স্থায়ী পদে ঢুকিয়ে দিয়েছিল।
চা খেয়ে যদুনাথের তিনতলায় ঢুকে, বিস্ময়ে বলল, তোমরা যাও নাই? বসেই আছ আমার জন্য?
ফুটে নিয়মিত ছাত টাঙ্গিয়ে গেঞ্জিবেচা জগা বলে, বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে পথে বসে আছি! …বুলডোজারে করলেও…মরতে রাজি দল…পথ না বাতলানো অবধি…
কী করবা? যদুনাথ চোখ নাচায় । আমার পথ আটকাবা ? ঘিরাও করবা ?
পুষ্পা ফশ করে বলে উঠল, আপনি বলে দেন কী করব? …বুঝেছি আমরা, সমিতিটমিতি সব মেকুর বনে গেছে!
আপনি ফোন করেন প্রবীর দারোগাকে। একজন মত দেয়।
না, না। এস.ডি ও কে ডাকেন আপনি! দ্বিতীয় জন পরামর্শ দেয়।
চাই ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ফোনে কথা কন! তৃতীয় জনের বক্তব্য ।
যদুনাথ খুব ঘনিষ্ঠ মহল ছাড়া লুজ টক করে না। নানা পরিবেশে রসের কথা বলে মানুষকে জমিয়ে দিতে পারে কিন্তু শ্লীল-অশ্লীলের সীমা মেনে চলে । হঠাৎ এখন, এস.ডিও, ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাকার উঁচু উঁচু পদকে ফোনে ভেসে আনার প্রস্তাবে বুথে উঠতে পারেনা যদুনাথকে এইসব পুংগিরপুতরা কী ভাবে?
মা-এর কিছু মনে কইরো না! বলেই পুরুষদের দিকে তাকিয়ে, বিশেষত জগার দিকে, আঙুলে গোল পাকিয়ে দেখায়, তোমগো প্যান্টের তলায় যার যার ঠিক আছে তো?…আমার ফোনে ম্যাজিস্ট্রেট দুইটা আসব, এসডিও জিহুজুর বলে হাজির হব…কী ভাব আমারে?

অলঙ্করণ: দেব সরকার

সাধে তোমাগো পুংগির পুত কই? … মাতশ্বরের কাছে যেতে পার না?… ভুলু আইচ, খোকা সাহারা কোথা?
এবার মেয়েদের মধ্যে পুষ্প বলে ওঠে, বেশ, বালগঢ়া নিয়া বুলডোজের সামনেই ঝাপাব…দেখি তখন কেউ সাড়া দেয় কিনা!
দ্বিতীয় মহিলাটি বলে, চল্লিশ ফুট দুদিকে রাস্তা হবে, আর দুফুট কি আমাদের দেয়া যায় না?
পুষ্পা বলে, চল্লিশ ফুট রাস্তা? এরোপ্লেন নামবে নাকি?
যদুনাথ এবার হাসে।
না চলুক!… তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে প্লেন ধরার সুবিধে হবে তো! …বাধা দিতে পার? উন্নতি ঠেকানো চলে?
এবার পরিমল সমূহ বিপদ টেরে পেয়ে আলোচনা গোটাতে চায়। বলে, ফুটের দোকান গুলোর তিন-তিনটে সমিতি …কেউ গা লাগছে না। আমার সাধারণ বুদ্ধি কয়, যার যার টিন টালি, বেড়া নিজেরা খুলে নাও।…
হক কথা! যদুনাথ খেই ধরে, বুলডোজারে ওইসব গুড়া করে দিলে, বিকল্প জায়গা মিললেও বসবা কেমনে? সময় নষ্ট কইরো না!
বিকল্প? চোয়ালভাঙা, গর্তে দৃষ্টি নিয়ে একজন বলে। বোঝা যায় বয়স বেশি নয়। যদুনাথ যুবটিকে ব্যাঙ্গ কন্ঠে বলে, বিকল্প নাই কিছু শখের শহরে? …এলাকার সব ফুটপাত পুলিশের হাতে গেছে?
যুবকটির একটু মাথাগরম। একদা নকশাল দলে নাম লিখিয়ে জেল খেটেছিল। বহু ঘাটের জল খেয়ে যখন ভাগ্যের মার খেয়ে সূক্ষ্ণ ধান্দাবাজি ছাড়া কিছু বোঝে না। আবার মাতব্বরেরা চ্যালাদের সঙ্গেও লাইন রেখে চলে। বোঝে ক্ষমতাই পেশি শক্তিকে পোষে, আর লোকাল থানা-পুলিশ তাদের হুকুমে চলে। কব্জায় কেন যাবে কাকা? … জেল খানার দিকটা ফাঁকা… ফুটের দোকান বসালে খদ্দের যাবে?
যদুনাথ এসব যুবকদের নানা পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করেছে। হেসে বলে, তোমার ঝাপ কুনটা?
পরিমল বলে, খোকা সাহার সামনের ফুটে।
কারবার?
এবার অনুগত কন্ঠে যুবকটি বলে, কাকা! ছোটখাট প্লাস্টিকের গামলা-বালতির!
এই প্রথম যদুনাথ লক্ষ করল, ছোকড়ার বাঁ হাতের কব্জিটা ঠুন্ডা। কোনো কালে বোম-টোম-য়ে উড়ে গেছে।
এবার স্নেহের হাসিতে যদুনাথ, বাপু ঝড় এলে মাথা নিচু করা জানতে লাগে…নিজেরা যার যার মালপত্তর আছে সরিয়ে নাও…একটা পথ পেলে না হয় তা নিয়া ফের বসবা…প্রশাসনকে সরাসরি গুঁতোতে নাই !
পুষ্পর কেন জানি, মনে হচ্ছিল যদুনাথ জ্যাঠা কী যেন আড়াল করতে চাইছে । গুহ্য খবর কিছু সে জানে । এইসব সরাসরি ভুক্তভোগিদের কাছে ভাঙতে চাইছে না ।
যদুনাথের সঙ্গে পুরনো আত্মীয়তার সম্পর্কটুকু মনে আছে কিনা, পুষ্প মাঝেমধ্যেই বুঝে উঠতে পারে না । এগার দিনের অগৌচের আত্মীয়  ‘মাতব্বর’- – শখের পুরের বিধানসভার জনপ্রতিনিধি । চলতি কথায় এম. এল. এ । বেশ কয়েকবার জিতেছে। যেমন করেই হোক। জিতে সফল হওয়াটাই বড় কথা । ‘মাতব্বর’-এর ভাবমূর্তি সামান্য উজ্জ্বল থাকলে, খুনের মামলায় জড়ানো না হলে, রাষ্ট্রমন্ত্রী দৌড়ে নাম উঠত অন্তত। তাঁরই মৃত্যু স্ত্রীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়া পুষ্পা। খুবই ট্রাজিক কাহিনি। চতুর্থ সন্তানটির প্রসব কালে, রক্তের উচ্চচাপে মারা যায়। তখনও গেরস্থের মূত্যুর  জন্য ডাক্তার-নার্স পেটানো, হাসপাতালে-নার্সিংহোম ভাঙচুরের প্রচলন হয়নি।
আজ ‘মাতব্বরের’ ছেলেমেয়ে প্রতিষ্ঠিত। রাজনীতির সাফল্যে দ্বিতীয় দারপরিগ্রহের প্রশ্নই নেই ।  ফলে শখেরপুরে কোনো কোনো মহলে জোরালো স্ক্যান্ডাল আছে। বিশেষ করে, ‘নিম্নরুচির’ মহিলা মহলে এ জন্যই চাপা ঠেস রসালো ফেনিল হয়ে আছে।
বিশেষত শখেরপুর আধুনিক ও উন্নতির জোয়ারে সমৃদ্ধ ফ্ল্যাটবাড়ি, প্রমোটারকে পুরনো ঘরবাড়ি দিয়ে দেওয়া, প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষে যারা ঘষামাজা অন্দরমহলে রোজ গেরস্থলির কাজ করতে নানা এলাকা থেকে আসে।
সকালে গাড়ি করে নামে, স্টেশন চত্বরে কোদাল ঝুড়ির হাট বসে যায়। আর আবাসনের পথে হাঁটে কাজের মহিলারা। গোপন মহলে, মধ্যবিত্ত সংসারগুলোর আভ্যন্তরীণ সম্পর্কের সত্য-মিথ্যা, আধা কল্পনায় একটি ক্লেদঙ্কর মিথ জেগে থাকে। দুপুরে অলস গিন্নিবান্নিরা এসব নিয়ে টোটকা রসে অভ্যস্ত হয়। বাতাসে তার বীজ ছড়ায়।
যে-বউটা ঢোকে মাতশ্বরের বাড়ির হেঁসেলে, ক্ষমতার দেমাকে পা পড়ে না। তার স্ট্যাটাস ঝলক। হয়তো নীলা নামের কোনো মেয়েকে টেনেই মাতশ্বরের কথা উঠল।
জনৈক চিত্রা অবাক হয়ে সন্ধ্যাকে বলবে, ওরা দূর সম্পর্কের ভাই-বোন হয় না?
সন্ধ্যা রহস্যের হাসিতে মন্তব্য করবে, মায়-পোয় ছাড়া সংসারে কেউ মাছ খায় না বল্লেই হবে? বিনি হাসতে হাসতে গড়িয়ে বলবে, কেউ সতী কিনা নিঘ্ঘাৎ বুঝা যায়, মইরা ছাই হলে।
চিত্রা বলবে, মায়-পৌতেও মাছ খায় আইজকাল।
বিনি চমকাবার অভিনয়ে বলবে, কেমুন?
চিত্রা মজিয়ে মজিয়ে বলবে, পুলিশ-বাড়িটায় যেখানে কাজ করি, মাইয়াটা সোয়ামির ঘর না কইরা চইলা আসছে… মায়রে নালিশ জানায়, জামাই আর শাশুড়ির সম্পর্ক নাকি ভালো না। সন্ধ্যাকে ঠ্যালা দিয়ে বিনি বলবে, যাঃ ।
মাইরি! চোখ ছুইয়া কইলাম! ওরা হেসে কপালে কলির সন্ধ্যের জন্য হাত রাখবে ।

ক্রমশ..


চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই, কেউ যদি মিল খুঁজে পান তাহলে তা অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয় ।



❤ Support Us
error: Content is protected !!