Advertisement
  • এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • নভেম্বর ১৪, ২০২৫

পান্থজনের নির্মাণ আর বির্ণিমাণ । প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক সাধন চট্টোপাধ্যয়কে নিয়ে তৈরি হচ্ছে তথ্যচিত্র

প্রান্তিক দর্শন, জীবন ঘষে জ্বলে ওঠা ধিকিধিক আগুন, একবুক গ্রাম বুকে বয়ে হেঁটে চলার অক্ষয় জেদ, তদপরি বাঙালি সংস্কৃতির ভাঙা-গড়া, স্থবিরতা আর উত্তেজনার আখ্যান ঘিরে নির্মিত হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র, পরিচালক কৌশিক ঘোষ

ইমরাজ হাসান
পান্থজনের নির্মাণ আর বির্ণিমাণ । প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক সাধন চট্টোপাধ্যয়কে নিয়ে তৈরি হচ্ছে তথ্যচিত্র

‘বাঙালি স্মৃতিবিস্মৃত জাতি’— বহুজনের ভাষ্যে বারবার এ কথা শুনেছে বঙ্গীয় তট। একবিশং শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তার সাথে যুক্ত হচ্ছে স্মৃতিকে অস্বীকার আর অর্থ-খ্যাতি-যশের প্রতি প্রবল লোভ। অথচ সাহিত্যমুখী, শিল্পবোদ্ধা, হাজার বছরের ইতিহাস কাঁধে এ জনপদ দিয়েছিল নির্মাণ আর সৃজনশীলতার অগ্রাধিকার। একেকটা কবিতা হয়ে উঠতো স্লোগান, গল্প আর প্রবন্ধ, ছবির দ্রোহে আত্মনির্মাণের পথে সে ছিল প্রান্থজনের পথিক। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিম, বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্কর, কাজী ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বুদ্ধদেব বসু— দীর্ঘ ইতিহাসের সে ঐতিত্যের ধারা বহন করবে কে? কে বইবে লিটল ম্যাগাজিন আর পথনাটকের অহং। গ্রাম ক্রমশ শহর হতে চাইছে, আর ক্ষয়িষ্ণু শহর হয়ে উঠছে নীরস গ্লানির বধ্যভূম; দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাঁড়ানোই তো দস্তুর, অবসম্ভাবী। এখানেই ফিরে দেখা, ফিরে আসার আখ্যান নির্মিত হয়।

সাধন চট্টোপাধ্যায় জানালেন, ‘এই প্রাপ্তি আমার ব্যক্তিগত নয়, আমি এখনো পুরোপুরি লেখক হয়ে উঠতে পারিনি। তাই এ প্রাপ্তি বাংলার সাহিত্যধারার, মূল-ধারা বহির্ভূত অশ্রূত শব্দের কারিগরদের

বাংলা সাহিত্য জগতে তিনি এক নীরব অথচ স্থিতধী উপস্থিতি। প্রচারবিমুখ, প্রান্তিক অথচ দৃঢ় এক কথাশিল্পী, সাধন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রান্তিক দর্শন, জীবন ঘষে জ্বলে ওঠা ধিকিধিক আগুন, একবুক গ্রাম বুকে বয়ে হেঁটে চলার অক্ষয় জেদ, তদপরি বাঙালি সংস্কৃতির ভাঙা-গড়া, স্থবিরতা আর উত্তেজনার আখ্যান ঘিরে নির্মিত হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র, পরিচালক কৌশিক ঘোষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপর বহু আগে তৈরি হয়েছে কাব্যমাখা সেলুলয়েড, নবারুণের আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ আর তাঁর চরিত্রদের দুর্বার বিদ্রোহ কিউ-এর ক্যামেরায় দেখেছে মহানাগরিকের মধ্যবিত্ত ভাবনার চরিত্র। লিটল ম্যাগাজিন ঘিরে সরকারি অনুদানে তৈরি হয়েছে এলোপাথাড়ি ধুলোবালি আর রক্তের কথা। অলোকরঞ্জনের প্রচেষ্টায় অমোঘ দৃশ্যকল্প রচিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠান বিরোধী ‘হাংরি’ লেখক-কবি শিল্পীরা সেলুলয়েড ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসতে চেয়েছেন বারবার। পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘ছেঁড়া তমসুক’-এ প্রতিষ্ঠানের ছক ভেঙে শক্তির সেই দৃঢ় উচ্চারণ কিংবা গৌতম ঘোষের ‘কালবেলা’য় বিনয়ের ছায়া, ঋতুপর্ণের ছবিতে জয়ের শান্ত নিবিড় অথচ অস্থির ভূবন। কিন্তু এসবের বাইরে ? যাঁদের কলম ক্রমাগত হানছে গদ্যের হাতুড়ি, প্রজন্মের অস্তিত্ব, ছিন্নমূলের অব্যক্ত যন্ত্রণা আর অপেক্ষার কথা শোনায়, তথাকথিত প্রতিষ্ঠানের বাইরে যারা একার্ণব, তাঁদের কথা বলবে কে? আরম্ভ-র সাথে স্বল্প কথায় সাধন চট্টোপাধ্যায় জানালেন, ‘এই প্রাপ্তি আমার ব্যক্তিগত নয়, আমি এখনো পুরোপুরি লেখক হয়ে উঠতে পারিনি। তাই এ প্রাপ্তি বাংলার সাহিত্যধারার, মূল-ধারা বহির্ভূত অশ্রূত শব্দের কারিগরদের। আমি প্রথমে রাজি হইনি, কিন্তু পরে কৌশিকের নিরলস প্রচেষ্টা আর আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে রাজি হয়েছি।’

সাধন চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৪৪ সালে বরিশালের মাধবপাশার কাছে শোলনা গ্রামে জন্ম। দেশভাগের টানাপড়েনে তিন বছরের উদ্বাস্তু শিশু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি। এরপর ১৯৫৩ থেকে সুকচর-পানিহাটিই তাঁর ঠিকানা— আরো পরে শিক্ষকতা পেশা, আর সেই পেশার ফাঁকেই অবিচল সাহিত্যসাধনা। দু-হাতে লিখেছেন অজস্র গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ। দীর্ঘ সময় ধরে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই লেখকের পরিচয় কেবল কথাসাহিত্যিক হিসেবে নয়, বরং এক প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভঙ্গির ধারক হিসেবেও। মূলধারার ঢেউ থেকে দূরে দাঁড়িয়েই নিজের ভাষায় সমাজকে অনুবাদ করেছেন তিনি। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গদ্য কঠোর, অথচ সংযত। গল্প আর প্রবন্ধে বাস্তব ও বিমূর্ততার সংমিশ্রণে তৈরি করেন এক প্রতিবাদী নিস্তব্ধতা—যেখানে সমাজ, ইতিহাস ও মানুষ মিলেমিশে তৈরি করে নিঃশব্দ প্রতিরোধের আভাস। তিনি কখনো ‘বাজারের লেখক’ হতে চাননি। বরং পাঠকের বিবেককে নাড়া দেওয়ার সাহিত্যে বিশ্বাসী তিনি। তাঁর নীরব সমগ্রতা ছিল স্রেফ অন্তর্মুখিতা নয়—এ ছিল এক রাজনৈতিক অবস্থান। প্রচার থেকে দূরে থাকা, আত্মপ্রকাশের সংযম, নিজের গুছিয়ে নেওয়া ভাষা, এসবই এক প্রতিবাদের ভাষ্য। তিনি বিশ্বাস করেন, সত্যিকারের সাহিত্য কখনও উচ্চকিত কণ্ঠস্বর নয়। বরং তা এক নীরব উচ্চারণ, যা পাঠকের ভেতর দীর্ঘ প্রতিধ্বনি তোলে।

পরিচালক কৌশিক ঘোষ জানালেন, তাঁর ভাবনা আর নির্মাণের কথা। নভেম্বরের শুরু থেকে চলেছে শ্যুটিংয়ের কাজ। লেখক আর তাঁর গল্পের কথন ফুটে উঠবে ছবিতে। উঠে আসবে নাগরিক দ্বন্দের কথা, সাহিত্যের দোলাচলের কথা। উঠে আসবে লেখকের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় আর গল্পের পিছনে যে গল্প, স্রোতের মতো বহমান সৃষ্টিআকাঙ্ক্ষার কথা। তিনি বললেন, আজ যখন সমাজ, সাহিত্য ক্রমেই হয়ে উঠছে দ্রুত-গ্রাস্য এক পণ্য, তখন সাধন চট্টোপাধ্যায়ের লেখার দিকে তাকালে মনে পড়িয়ে দেয়—লেখা মানে সময়ের সঙ্গে দ্বন্দ্বে নেমে পড়া। প্রান্তের আলো যে কখনও নিভে যায় না, নীরবতারও যে তীব্র তরঙ্গ থাকে—এই বোধটাই তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়। আমরা চাই, সেই বোধকেই ছড়িয়ে দিতে লোক থেকে লোকতরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। বহুমাত্রিক এই প্রচেষ্টার রূপ জানুয়ারির শেষ দিকে দর্শকের কাছে পৌঁছে যাবে বলে আশাবাদী পরিচালক। যৌথখামারের অনন্য এই প্রচেষ্টায় কৌশিক ঘোষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জুড়ে আছেন দেবগৌতম। তিনি তথ্যচিত্রের এডিটিং, ক্যামেরা পরিচালনার দায়িত্বে। সঙ্গীতের মুছূর্ণায় অন্য অবকাশ তৈরি করবেন ম্যাডোনা চ্যাটার্জী। আমরা আশাবাদী। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের নিবিড় যে অবলোকন তা সাদরে গ্রহণ করবেন, ঐতিহ্য আর প্রজন্মধারার বহমান স্রোতের কাছে অল্পকিছুক্ষণ অখণ্ড সংযোগে দাঁড়িয়ে থাকবেন সাহিত্য আর শিল্পের প্রেমিক-প্রেমিকারা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!