- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ৩০, ২০২৫
এআই দিয়ে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ! শেখর কাপুরের পরিচালনায় মুক্তির পথে কল্পবিজ্ঞান সিরিজ ‘ওয়ারলর্ড’
‘এবারের যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের নয়, কল্পনারও।’ নিজের নতুন কল্পবিজ্ঞান ধারাবাহিক ‘ওয়ারলর্ড’ প্রসঙ্গে এমনটাই বলেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক শেখর কাপুর, ভারতের চলচ্চিত্র জগতের এক প্রবাদপ্রতিম নাম। ‘মাসুম’ থেকে ‘এলিজাবেথ’, ‘ব্যান্ডিট কুইন’ থেকে ‘দ্য ফোর ফেদারস’, প্রতিটি চলচ্চিত্রে তিনি নিজের ভাবনা, ভাষা আর নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে তুলেছেন নতুন আঙ্গিকে। তবে এইবার তিনি যা করছেন, তা শুধু নিজের চলচ্চিত্রগত যাত্রাতেই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শেখর কাপুরের নতুন চমকপ্রদ সিরিজটি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-র সাহায্যে। মঙ্গলবার মুক্তি পেয়েছে এই বহুল প্রতীক্ষিত সিরিজের টিজার। আগামী ২-৩ মাসের মধ্যেই সিরিজের প্রথম পর্ব দর্শকদের সামনে আসতে চলেছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক।
শেখর কাপুর জানিয়েছেন, ‘ওয়ারলর্ড’-এর গল্প এক রহস্যময় যোদ্ধাকে ঘিরে, যার অস্তিত্ব একাধিক ডাইমেনসনে দেখা যাবে। মারাত্মক আঘাত পেয়ে, মৃত্যুপ্রায় অবস্থায়, অন্য এক জগতের প্রেমিকা তাঁকে নিজের জগতে টেনে নেন। এ যেন মৃত্যু আর বেঁচে থাকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্য এক প্রেমগাথা। এই ধারণা শুধু বিজ্ঞানের সীমা ছুঁয়ে যায় না, বরং প্রেম, আত্মত্যাগ ও অস্তিত্ববাদের দার্শনিক প্রশ্নগুলোকে নতুন করে তুলে আনে। কপূরের কথায়, ‘এই প্রেমে আছে এক অনন্ত সংযোগ, যেখানে সময় আর বাস্তবতার সীমা মুছে যায়।’ সিরিজে রয়েছে গোটা মহাবিশ্বকে শক্তি যোগানো এক আদিম শক্তির উৎস, অদৃশ্য স্ফটিকের উপস্থিতি। নিউট্রিনোর চেয়েও ক্ষুদ্র ওই মৌলিক কণা নাকি ‘বিশ্ব সৃষ্টি করেছে’। সিরিজে কেবল অভিনব গল্প বলা নয়, বরং নির্মিত হয়েছে এক নতুন সৃজনশীল দর্শন। ‘ওয়ারলর্ড’-এর চরিত্র, সেট ডিজাইন, সব কিছুই উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে সাধারণ সৃষ্টিশীলদের জন্য। মাত্র এক পয়সার বিনিময়ে সেগুলি ব্যবহার করে যে কেউ নিজের প্রজেক্ট বানাতে পারবেন, তবে শর্ত একটাই—তাঁর সৃষ্টিও হতে হবে ওপেন সোর্সের মাধ্যমে। শেখর কাপুর বলেছেন, ‘একটা গল্প থেকেই জন্ম নিতে পারে শত শত গল্প। একটাই বীজ, যেখান থেকে গজিয়ে উঠতে পারে আস্ত এক রেইনফরেস্ট।’
‘ওয়ারলর্ড’—একটি নাম, এক গল্প, এবং এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ। এটি কেবলমাত্র একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনি নয়; বরং একটি প্রযুক্তিনির্ভর সৃষ্টিশীল বিপ্লব। কারণ, এই সিরিজের গোটা প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে। যেখানে একটি চলচিত্র বা সিরিজ নির্মাণে মাসের পর মাস ধরে ভিএফএক্স, অ্যানিমেশন ও প্রি-প্রোডাকশনের কাজ চলে, সেখানে ‘ওয়ারলর্ড’-এর সম্পূর্ণ দৃশ্য নির্মাণ শেষ হচ্ছে মাত্র ২ সপ্তাহে। এবং এখানেই লুকিয়ে আছে পরিচালকে মূল বার্তা—চলচ্চিত্র এখন আর বড়ো স্টুডিও, মোটা বাজেট, কিংবা অভিজাত প্রযুক্তির খাঁচায় আবদ্ধ থাকবে না; বরং যেকোনো সৃষ্টিশীল মন আজ সিনেমার জগতে প্রবেশ করতে পারে শুধুমাত্র কল্পনার শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে। এ প্রজেক্টে কপূরের সঙ্গী মুম্বই ভিত্তিক জেনারেটিভ এআই সংস্থা ‘স্টুডিও বিএলও’। এই সংস্থা দুবাই, লন্ডন ও লস অ্যাঞ্জেলেসেও নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে রমরমিয়ে। এদের ঝুলিতে রয়েছে ‘দ্য হার্টব্রেক ছোঁড়া’ ও ‘পুরানা প্যায়ার’-এর মতো জনপ্রিয় কাজ। ‘ওয়ারলর্ড’ সিরিজটির সঙ্গীত পরিচালনা করছেন কার্তিক শাহ।
তবে ‘ওয়ারলর্ড’-এর সবচেয়ে অভিনব দিক সম্ভবত এর ভিজ্যুয়াল কনসেপ্ট, বিশেষ করে মহাকাশযানগুলির ডিজাইন। শেখর এখানে রূপ দিয়েছেন এমন জৈব মহাকাশযানের, যা জেলিফিশ-এর মতো বেঁচে থাকে, নিজেকে নিজেই সারাতে পারে, চলাচল করতে পারে মহাবিশ্বের শক্তির প্রবাহে। রকেটের ধোঁয়া নয়, এখানে গতি নির্ভর করে কণাগত শক্তির স্রোতের ওপর, যেন মহাবিশ্ব নিজেই যেন বাতাস, আর স্পেসশিপ তার পালতোলা নৌকা। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখর কাপুরের বিশ্বদর্শনেরই প্রতিফলন। তিনি প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, বিশেষ করে রেইনফরেস্ট থেকে। যেখানে প্রতিটি উদ্ভিদ, প্রতিটি প্রাণী একে অন্যকে সাহায্য করে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। ‘ওয়ারলর্ড’ ঠিক তেমনই—একটি বীজ যা থেকে তৈরি হবে এক স্বনির্ভর, স্বচালিত সৃষ্টিশীল জগত। এ প্রকল্পের পরিধি এখানেই থেমে নেই। পরিচালক শেখর মুম্বইয়ের একেবারে প্রান্তিক এলাকায় ধারাভিতে পরিকল্পনা করছেন একটি এআই-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র স্কুল গড়ে তোলার। যেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেসব তরুণদের হাতে সিনেমার হাতিয়ার তুলে দেওয়া হবে, যাঁদের আগে এ নিয়ে স্বপ্ন দেখারও সুযোগ ছিল না। ‘ওয়ারলর্ড’ যেন একটি ভবিষ্যতের জানালা, যেখানে শিল্প, বিজ্ঞান এবং কল্পনা এক সুতোয় বাঁধা। আর সেই জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক শৈল্পিক দার্শনিক, শেখর কাপুর।
❤ Support Us








