- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৩১, ২০২৬
জইশ-যোগ সন্দেহ, বর্ধমান থেকে গ্রেফতার যুবক। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
একদিকে ছোটো ব্যবসার আড়ালে স্বাভাবিক জীবনযাপন, অন্যদিকে সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ— তদন্তকারীদের দাবি, এই দ্বৈত পরিচয় নিয়েই দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপন করে ছিল এক সন্দেহভাজন জইশ-ই-মহম্মদ সদস্য। শুক্রবার ভোরে পূর্ব বর্ধমান শহরের অভিজাত আবাসনে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। ধৃতের নাম হামিদ মণ্ডল। তবে এটাই তার প্রকৃত পরিচয় কি না, তা নিয়েও সংশয়ে তদন্তকারীরা।
‘এসটিএফ’ সূত্রের দাবি, ধৃতের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যাতায়াতের রুট, সফরসূচি এবং গতিবিধি সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উদ্ধার হয়েছে। সে কারণেই তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন— শুধু তথ্য সংগ্রহই কি উদ্দেশ্য ছিল, না কি তার নেপথ্যে আরও বড়ো কোনো নাশকতার ছক লুকিয়ে রয়েছে? তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘ দিন নেপালের কাঠমান্ডুতে থাকার পর হামিদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢোকে। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে। প্রথমে হাওড়ার পিলখানায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস শুরু করে। পোশাক তৈরির একটি কারখানায় কাজ করত। কয়েক মাস আগে পূর্ব বর্ধমানের দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে রেনেসাঁ কমপ্লেক্সে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। সেখান থেকেই ছোটো ব্যবসার আড়ালে নিজের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।
শুক্রবার ভোরে ওই আবাসনে অভিযান চালিয়ে হামিদকে আটক করে ‘এসটিএফ’। তল্লাশিতে তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ছয়টি মোবাইল ফোন, একাধিক ডিজিটাল স্টোরেজ ডিভাইস এবং বেশ কিছু নথি। তদন্তকারীদের দাবি, এগুলির মধ্যে কয়েকটিতে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। ইতিমধ্যেই সমস্ত সামগ্রী ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দাদের দাবি, হামিদের যোগাযোগ ছিল পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনের একাধিক হ্যান্ডলারের সঙ্গে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কাশ্মীরে সক্রিয় জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এমনকি পুলওয়ামা হামলার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র মিলেছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। যদিও এ সমস্ত তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বর্ধমানে আসার আগে হামিদ কলকাতার নিউটাউনের একটি আবাসনে দীর্ঘ দিন ভাড়া থাকত। ওই এলাকা মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের খুব দূরে নয়। তদন্তকারীদের দাবি, সে সময় থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াতের বিভিন্ন রুট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিল। মোবাইল টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে, তিনি নিয়মিত কোন কোন এলাকায় যাতায়াত করতেন, মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা বলয়ের আশপাশে তাঁর উপস্থিতি কতটা ছিল। ‘এসটিএফ’-এর কর্মকর্তাদের দাবি, ধৃতের কাছ থেকে এমন কিছু নথিও উদ্ধার হয়েছে, যাতে মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মসূচির সময়সূচি, যাতায়াতের সম্ভাব্য রুট, গাড়ি কোথায় থামে এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। তবে এগুলি সরকারি নথি কি না, অথবা কী ভাবে তার কাছে পৌঁছেছিল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা। সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ধৃতের প্রকৃত পরিচয় নিয়েও ধোঁয়াশা কাটেনি। নিজেকে কাশ্মীরের বাসিন্দা বলে দাবি করলেও, গোয়েন্দাদের একাংশের সন্দেহ, সে ভুয়ো পরিচয়ে দীর্ঘ দিন ভারতে বসবাস করছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। ভারতে প্রবেশের রুট, ব্যবহৃত নথিপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের খতিয়ানও খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের আরও আশঙ্কা, হামিদ একা নয়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তার সহযোগী বা ‘স্লিপার সেল’-এর সদস্যরা ছড়িয়ে রয়েছে। এ নিয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। নিউটাউন ও বর্ধমানে যাঁরা তাকে ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়েছিলেন, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
প্রসঙ্গত, বর্ধমানে জঙ্গি-যোগের অভিযোগ এই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের কার্যকলাপ নিয়ে গোটা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল। সে ঘটনার এক দশকেরও বেশি সময় পরে আবার একই জেলার নাম জঙ্গি-তদন্তে উঠে আসায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে প্রশাসনিক মহলে। তবে ‘এসটিএফ’-এর এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ধৃতের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য উদ্ধারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছেন না গোয়েন্দারা।
❤ Support Us






