Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ২০, ২০২৬

শিলংয়ে ভেঙে ফেলা হবে ঐতিহাসিক ‘বিধান ভবন’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
শিলংয়ে ভেঙে ফেলা হবে ঐতিহাসিক ‘বিধান ভবন’

যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ি শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাবান সার্কিট হাউস বা ‘বিধান ভবন’-এর দিন ফুরোল। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, ভারতরত্ন ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের নির্মিত শিলংয়ের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভেঙে ফেলার পথে আর কোনো আইনি বাধা রইল না। মেঘালয় হাই কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, জরাজীর্ণ এই ভবনকে আর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে সার্কিট হাউস চত্বরে ডক্টর রায়ের আবক্ষ মূর্তি এবং একটি স্মারক ফলক স্থাপন করা হবে।

শিলংয়ের লাবান এলাকার কেনচেস ট্রেসে অবস্থিত এই বাড়িটি বর্তমানে সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, স্থানীয়দের কাছে তা এখনো ‘বিধান ভবন’ বা ‘রায় ভিলা’ নামেই পরিচিত। ১৯২০-এর দশকের গোড়ায় ডক্টর বিধানচন্দ্র রায় এ বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির পরিকাঠামো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। সরকারি সূত্রের দাবি, বাড়িটির অধিকাংশ অংশ অত্যন্ত জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় এবং সার্কিট হাউসে স্থানাভাব দেখা দেওয়ায় নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় মেঘালয় সরকার।

শুধু নবীন বাংলার নির্মাতা হিসেবেই নয়, আধুনিক শিলঙের অন্যতম রূপকার হিসেবেও তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। তাঁর বাবা প্রকাশচন্দ্র রায় শিলংয়ে ব্রাহ্ম সমাজের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে,  চিকিৎসক,  সমাজসংস্কারক এবং পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের বহু আগে থেকেই শিলংয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বিধানচন্দ্রের। শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিলেন। শুধু বিধানচন্দ্র নন, ঐতিহ্যবাহী এই ভবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসুর নাম।

মেঘালয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত বছরের ১২ নভেম্বর রবীন্দ্র-অনুরাগী মালবিকা বিশারদ মেঘালয় হাই কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৌমেন সেনের কাছে একটি অভিযোগপত্র পাঠান। পাশাপাশি রাজ্যপালের কাছেও স্মারকলিপি জমা দেন তিনি। তাঁর অভিযোগ ছিল, ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি ভবনকে ভেঙে ফেলার আগে তার সংরক্ষণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা উচিত। মালবিকার বক্তব্য, ১৯২৩ সালে শিলংয়ে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত বিধান ভবনে যেতেন। ওই বাড়িতে কবিগুরুর জন্মদিনও উদ্‌যাপিত হয়েছিল। ১৯২৯ সালে তৃতীয় বার শিলং সফরে এসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও এ বাড়িতেই ছিলেন। সে কারণে ভবনটিকে ‘মেঘালয় হেরিটেজ আইন’-এর আওতায় এনে সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।

ওই আবেদনের ভিত্তিতেই হাই কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত জনস্বার্থ মামলা রুজু করে। পরে প্রধান বিচারপতি রেবতী মোহিতে ডেরে এবং বিচারপতি ওয়ানলুরা ডিয়েংদোহের ডিভিশন বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে শুনানি শুরু করে। আদালতের নির্দেশে ‘মেঘালয় হেরিটেজ অথরিটি’ ভবনটি পরিদর্শন করে। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্তে পৌঁছয় যে, ‘মেঘালয় হেরিটেজ রেগুলেশনস–২০১৩’-এর ৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী লাবান সার্কিট হাউসকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মর্যাদা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করছে না। আদালতে দাখিল করা হলফনামায় নগর বিষয়ক দফতরের অধিকর্তা এবং ‘মেঘালয় হেরিটেজ অথরিটি’র সদস্য-সচিব প্রফুল্ল কুমার জানান, ভবনটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, কাঠামোগত ভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে একটি স্মারক ফলক স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

শুনানিতে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, ভবনটিকে বর্তমান অবস্থায় সংরক্ষণ করা বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তে ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের স্মৃতিকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব দেয় আদালত। আদালতের এ সুপারিশ মেনে নেয় মেঘালয় সরকার। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল এ. কুমার আদালতে পূর্ত দফতরের একটি রিপোর্ট পেশ করেন। সেখানে জানানো হয়, লাবান সার্কিট হাউসের প্রাঙ্গণে একটি পরিকল্পিত ও সুষম উদ্যান গড়ে তোলা হবে। ওই উদ্যানের মধ্যেই স্থাপন করা হবে ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের আবক্ষ মূর্তি এবং তাঁর অবদান ও বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা একটি স্মারক ফলক। এই সংক্রান্ত নকশা, আলোকচিত্র ও বিস্তারিত পরিকল্পনা আদালতে ‘এক্সহিবিট-এক্স’ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

‘মেঘালয় হেরিটেজ অথরিটি’ একই বৈঠকে রাজভবন, অর্থাৎ ‘লোক ভবন’-কে ‘হেরিটেজ অ্যাক্ট’-এর অধীনে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার স্বীকৃতি দিলেও বিধান ভবনের ক্ষেত্রে সে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। সব দিক বিবেচনা করে গত ১৭ জুন হাই কোর্ট জানিয়ে দেয়, পুরনো ভবনটি এতটাই জরাজীর্ণ যে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ ছাড়া অন্য কোনো বাস্তবসম্মত পথ নেই। মামলার নিষ্পত্তির সময় আদালত ‘অ্যামিকাস কিউরি’ এস. চক্রবর্তীর ভূমিকাকেও বিশেষ ভাবে প্রশংসা করেছে। তাঁর  সহযোগিতাতেই মামলার গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ ডিভিশন বেঞ্চের। তবে আদালতের এ সিদ্ধান্তে শিলংয়ের নাগরিক সমাজের একাংশের আক্ষেপ, যে ইট-পাথরে বিধান রায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র, কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত  কাঠামো আর থাকবে না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!