Advertisement
  • স্মৃ | তি | প | ট
  • অক্টোবর ২১, ২০২৫

‘জগত পারাপারের তীরে’ ঈশান বাংলার কথাকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য

সঞ্জীব দেবলস্কর
‘জগত পারাপারের তীরে’ ঈশান বাংলার কথাকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য

বাঙালির ভুবন যখন দীপাবলির আলোয় উৎসবে নিমগ্ন, দিকে দিকে তখন বাজছে ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন’ দেখার সুরেলা আহ্বান; যখন পৃথিবীতে ‘চণ্ডীদাস—রামপ্রসাদের শ্যামার’ স্নেহস্পর্শ, ঠিক সেই সময়েই নিভে গেল একটি নক্ষত্র। কবি জীবনানন্দ দাসের মৃত্যুবার্ষিকীর মাত্র দু’দিন আগে চিরবিদায় নিলেন গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য। এত তাড়াতাড়ি তাঁর চলে যাওয়াটা যেমন আমাদের ধাক্কা দিয়েছে, তেমনি সবার অলক্ষ্যে তাঁর শেষকৃত্যটা হয়ে যাওয়াও আমাদের কাছে বড় বেদনার মতো বাজছে। হেমন্তের আকাশে তখনও দূর গগনের দীপগুলি নিভে যায়নি, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন এই নদী-নক্ষত্রের দেশে। আমাদের এক টুকরো রূপসী বাংলা—নিজস্ব ‘ইন্সফ্রি আইল’-এর কথাকার, এবার আমাদের আর কোনও শোকযাত্রায় হাঁটতে হবে না। বঙ্গভবনের প্রাঙ্গণে দু’দণ্ডের জন্য এসে তিনি শান্ত হয়ে শুয়ে পড়বেন না আর; তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে শ্মশানঘাটে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে কারও যাওয়ার আর প্রয়োজন রইল না।

মিথিলেশদা চলে গেলে মনে হয়, “চালতা ফুল কি আর ভিজবে না শিশিরের জলে, নরম গন্ধের ঢেউয়ে ? লক্ষ্মীপেঁচা কি আর গান গাইবে না তার লক্ষ্মীটির তরে ?” … আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা এই বিশ্বাসেই—“পৃথিবীর এই সব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল; এশিয়া ধুলি, আজ বেবিলন ছাই হয়ে আছে।” এত বাঙ্ময়, অথচ নীরব কথাকার মিথিলেশদা ছিলেন জীবনানন্দে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এক গল্পকার। জীবনানন্দের কবিতা তিনি পড়তেন দিন মাস পেরিয়ে, গভীর মনোযোগে, ধ্যানের মতো একাগ্রতায়। সেই কবিতার পঙ্ক্তিগুলি তাঁর পিছু নিত ছায়ার মতো, আর তিনি নিজেও হেঁটে চলতেন তাদেরই অনুসরণে, যেখান থেকে জন্ম নিত এই ভূমির আলো-হাওয়া, রৌদ্র-ঘাস-পাতা-ধুলো আর জোছনার গন্ধ মাখা তাঁর গল্প। আজ সেই পথচলা থেমে গেল—বরাক, জাটিঙ্গা কিংবা ধানসিঁড়িটির তীরে।

দেশজুড়ে যখন গড়পড়তা বাঙালি ‘বিদেশী’ বা ‘বহিরাগত’ তকমায় চিহ্নিত হয়ে অস্তিত্বের সংকটে দিন কাটাচ্ছে, ঠিক সেই সময় তাঁর অসংখ্য গল্পের ভেতর থেকে একটিমাত্র গল্প—‘স্বপ্নলোক’, প্রচারের আলোয় এলে অনেকে আজ তা পড়ে আফসোস করছেন। কী অসাধারণ, প্রাণ কেঁড়ে নেওয়া উচ্চারণ।

একসময়ে পরিচিত ছিল শান্ত সুবোধ নিস্তরঙ্গ শান্তির দ্বীপ-উপত্যকা বলে। সে সব কবেকার কথা ঘুচে গেছে কবে। এখন বড্ড উথাল পাথাল– মানসিক-আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক। তবু মন পড়ে রয়—কেঁদে কেঁদে ফেরে -–উড়ে বেড়ায় কোনও সোনালিডানা চিলের মতো ভিজে মেঘের দুপুরে বা জবুথবু শীত রাতে বরবক্র নদীপারে।

এই যে প্রেক্ষাপট তিনি রচনা করেছেন, এখানে কখন যে ধানসিঁড়ি আর বরাক, জাটিঙ্গা, সুরমা, কুশিয়ারা, মধুরা, ধলেশ্বরী একাকার হয়ে মিশে যায়, আমরা টেরই পাই না। এপার বাংলা, ওপার বাংলা, কিংবা ‘অপর’ আরেক বাংলায়—লক্ষ কোটি অক্ষর মুদ্রাযন্ত্রে পিষ্ট হয়েছে; তবুও এই নির্বাসিতা বাংলার বিষণ্ন কথকতা কি কোথাও তেমনভাবে ধরা দিয়েছে ? সবুজ-শ্যামল বাংলার মাঠ-প্রান্তর থেকে উৎখাত হয়ে স্বপ্নের মায়ালোকে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর বুকের গভীরে যে কান্না থামে না—সেই কান্নারই গোপন প্রতিধ্বনি, সেই নীরব আর্তির নিসর্গ, মুথা ঘাসের জঙ্গলে জামরুল-আমলকি গাছ থেকে শিশিরের শব্দে ঝরে পড়া ফলের সুবাসের মতো—এই সব অভিজ্ঞতার সঞ্চিত ধনরত্ন ছড়িয়ে আছে মিথিলেশ ভট্টাচার্যের গল্পগুলোর মধ্যে। কিন্তু হায়, আজকের বাঙালির বুঝি আর সময় নেই, এই পৃষ্ঠাগুলো খুলে দেখারও যেন আগ্রহ আর বাকি নেই।

শৈলভূমি শিলং রোড ধরে সোনাপুর যাবার কালে নির্জন পাহাড়ি পথে গাড়ি থামিয়ে মাইলের পর মাইল ব্যপ্ত হরিৎ সমতল বাংলাভূমি দেখে নিদারুণ অভিভূত হয়ে পড়া এক যুবকের কথা শুনিয়েছেন মিথিলেশ যেখানে আচমকা কচি কলাপাতায় মোড়া হরিণের মাংস নিয়ে আসা এক শিকারি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে এ মাংস, জিজ্ঞেস করায় ‘সমতল ভূমির দিকে তার নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত তর্জনী নির্দেশ করে।’ ঘটনার অভিঘাত লেখককে মনে করিয়ে দিল জীবনানন্দ দাশের ‘শিকার’ কবিতাটিকে। তিনিও লিখলেন:  “স্বপ্নের হরিণেরা ময়ূরের সবুজ নীল ডানার মতো ঝিলমিলে এক ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল—কচি বাতাবি লেবুর মতো সবুজ সুগন্ধি ঘাসের গালিচায় জীবনটাকে কানায় কানায় উপভোগ করবে ভেবে– হঠাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে শিকারি এল–কসাইয়েরা এল–একটা অদ্ভুত শব্দও হ’ল–অনেকগুলো শব্দ হ’ল… অনেক অনেক হরিৎ সমতল আর নদীর জল মচকা ফুলের মতো লাল হয়ে গেল !”

এই সেদিনের কথা, এবারকার একটি শারদীয় পত্রিকায় তাঁর ‘লাইপাতা শাক’ গল্পটি পড়ে বলেছিলাম, আমার সামর্থ্য থাকলে আপনাকে একটি সোনার কলম উপহার দিতাম। তিনি হেসে বলেছিলেন, “সোনার কলমের থেকেও দামি তোমার কথা !” ভালোবেসে বলা এই তাঁর সঙ্গে এ অকিঞ্চিতকর লেখকের শেষ কথা।

আমাদের দুর্ভাগ্য, মিথিলেশদাকে তাঁর কেতাবছুট স্বভাষীরা চিনতে পারল না। মিথিলেশ ভট্টাচার্য শুধু গল্প লেখেননি, এ সব লেখা তো নির্বাসিতা ভূখণ্ডের এক নীরব আর্তি। তাঁর গল্পের ভেতর যে-ধানসিঁড়ি, যে-বরাক, যে-অন্ধকারের ভিতর দীপজ্বালানো ‘স্বপ্নলোক’, সেই স্বপ্নলোকের দিকে আজও আমাদের চোখ মেলে তাকানো বাকি রয়ে গেল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!