- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- অক্টোবর ৯, ২০২৫
সাহিত্যে নোবেল পেলেন হাঙ্গেরির লাজ়লো ক্রাজ়নাহোরকাই
অসহায় মানুষের গভীর জীবনচিত্র চিত্রিত করে সাহিত্যে নোবেল পেলেন হাঙ্গেরির লেখক লাজ়লো ক্রাজ়নাহোরকাই বৃহস্পতিবার, সুইডিশ একাদেমি ঘোষণা করেছে, ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হচ্ছে মধ্য ইউরোপীয় কথাশিল্পীর হাতে। একাদেমি বিবৃতিতে লিখেছে, ‘ভবিষ্যতের প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে, ধ্বংস আর অরাজকতার আতঙ্কের মধ্যেও তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে শিল্পের শক্তিকে আবারও প্রমাণ করেছেন।’
প্রায় ৪ দশকের সাহিত্যজীবনে ক্রাজ়নাহোরকাই সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য জগত—যেখানে মানবিক দুর্দশা, অস্তিত্বের টানাপোড়েন এবং সমাজব্যবস্থার পতনের মধ্যেও আশার ক্ষীণ আলো খুঁজে পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে যাঁর পাঠক, কিন্তু তিনি নিজে প্রচারের আলো থেকে অনেকটাই দূরে। ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির সীমান্তবর্তী শহর গিউলায় জন্ম তাঁর। সাহিত্যের জগতে প্রবেশ ১৯৮৫ সালে, প্রথম উপন্যাস ‘সাতানতানগো’ দিয়ে। সমাজতন্ত্র-পরবর্তী হাঙ্গেরির এক পরিত্যক্ত গ্রাম, মানুষজনের অস্তিত্বহীন জীবনের টানাপোড়েন— এই উপন্যাস প্রকাশমাত্র বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে দেয়। কয়েক দশক পরে, ২০১৩ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ পায় ‘বেস্ট ট্রান্সলেটেড বুক অ্যাওয়ার্ড’। বিখ্যাত পরিচালক বেলা তার এই উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন ৭ ঘণ্টার এক চলচ্চিত্রে—যা নিজগুণেই হয়ে ওঠে অনন্য শিল্পকীর্তি।
ক্রাজ়নাহোরকাই-এর ‘দ্য মেলানকোলি অফ রেজিস্ট্যান্স’, ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’, ‘বারন ভেঙ্কহেইম’স হোমকামিং’—একের পর এক উপন্যাসে উঠে এসেছে অরাজকতা, ধ্বংস, আতঙ্ক, বিশ্বাসভঙ্গের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার এক যন্ত্রণাময় সংগ্রাম। আমেরিকার সাহিত্যসমালোচক সুসান সনট্যাগ তাঁকে একবার বলেছিলেন ‘সমসাময়িক সাহিত্যের অ্যাপোক্যালিপটিক মাস্টার’। আর জার্মান সাহিত্যিক ডব্লিউ.জি. সেবাল্ড বলেছিলেন ‘এক বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন’। ক্রাজ়নাহোরকাই-এর লেখার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর গদ্যভঙ্গি— লম্বা, শ্বাসরুদ্ধকর বাক্য, যেখানে প্রায় কোনো বিরামচিহ্ন নেই, নেই কাঠামোগত ভাঙন। পাঠক যেন পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই যন্ত্রণার ভিতরে ঢুকে পড়েন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আলাদা করে উল্লেখযোগ্য তাঁর ‘সেইওবো দেয়ার বেলো’ (২০০৮)। সেখানে তিনি চোখ ফেরান পূর্ব এশিয়ার দিকে—জাপান, চিন, কোরিয়া। শিল্পসৃষ্টি, সৌন্দর্য, সময় ও নশ্বরতার মেলবন্ধনে গড়া এক অনবদ্য গদ্যরচনা। সে বইয়ের শুরুতেই রয়েছে একটি তুষার-সাদা বক, কিয়োটোর কামো নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে, শিকারের অপেক্ষায়—যার অস্তিত্বই বোঝে না আশপাশ দিয়ে চলা শতশত মানুষ। শিল্পীর অবস্থান যেন ঠিক তেমনই, বলছেন লেখক।তাঁর সাম্প্রতিকতম লেখা ‘হার্ষ্ট ০৭৭৬৯’-এ আবার ফিরে আসেন ইউরোপীয় বাস্তবতায়। জার্মানির থুরিংগিয়ার ছোট শহরে সামাজিক অবক্ষয়, অরাজকতা ও সঙ্গীত-ঐতিহ্যের দ্বন্দ্বে লেখা এক উপন্যাস—যেখানে সহিংসতা আর বাখের সংগীত পাশাপাশি দাঁড়ায়।
ক্রাজ়নাহোরকাই-এর লেখার ভঙ্গি কখনওই সহজপাচ্য নয়। অনেক পাঠকের কাছেই তিনি ‘কঠিন লেখক’। কিন্তু যে পাঠক ধৈর্য ধরে তাঁর লেখার ভিতর ঢোকেন, তাঁর কাছে ধরা দেয় এক নতুন অনুভব। তাঁর চরিত্ররা বারবার ছুটে চলে, কখনো মেলভিল-আক্রান্ত নিউ ইয়র্কে, কখনও বুদাপেস্ট থেকে নিউ ইয়র্কে, কখনোবা নিজের শহরের এক অলিগলিতে, যেখানে ধ্বংসের মধ্যেও খোঁজ চলে সৌন্দর্যের। নোবেল কমিটি তাঁর সাহিত্যকে শুধু ইউরোপ নয়, ‘সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বসংকটের সাহসী প্রতিক্রিয়া’ বলে বর্ণনা করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে তিনি প্রথম হাঙ্গেরিয়ান লেখক হিসেবে জেতেন ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ। পেয়েছেন হাঙ্গেরির সর্বোচ্চ সাহিত্যসম্মান কসুথ প্রাইজ। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরস্কার ঘোষণার সময় লেখক নিজে ছিলেন হাঙ্গেরিতে নিজের বাড়িতে। তাঁর ঘনিষ্ঠমহল জানিয়েছে, পুরস্কারের খবরে তিনি ‘বিস্মিত, কৃতজ্ঞ, কিন্তু নিজের মতো করেই শান্ত।’
বলা বাহুল্য, এ সম্মান যে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের এক বিপুল স্বীকৃতি, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এর আগে ২০০২ সালে প্রথম হাঙ্গেরীয় লেখক হিসাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ইমরে কার্তেজ। যিনি হলোকস্টের আধা-আত্মজীবনীমূলক বিবরণের জন্য সর্বাধিক পরিচিত।
❤ Support Us








