- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- নভেম্বর ১২, ২০২৫
পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ‘নীরব সামরিক অভ্যুত্থান’। সংবিধানের আমূল সংশোধনে ক্ষমতার সর্বময় আসনে জেনারেল আসিম মুনির
পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বরাবরই প্রবল, সেনাশাসনও নতুন কিছু নয়। এর আগে ‘ক্যু’ হয়েছে বারবার। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অভূতপূর্ব, বিস্ময়কর। গুলি কিংবা রক্তপাত নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি শিরায় প্রবেশ করছে সেনাশাসনের অদৃশ্য থাবা। সংবিধানের আড়ালে চলছে এক নিঃশব্দ অভ্যুত্থান, যার কারিগর পাক-সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সোমবার ইসলামাবাদের সেনেটে পাস হয়েছে বিতর্কিত ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল। এই সংশোধনীর পর পাকিস্তান কার্যত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে রূপান্তরিত হতে চলেছে এক সাংবিধানিক সামরিক রাষ্ট্রে, যেখানে নির্বাচিত সরকারের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা থাকবে সেনাবাহিনীর হাতে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে এক নতুন পদ— ‘চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্স’ বা ‘সিডিএফ’, যার হাতে থাকবে তিন বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। সংবিধান সংশোধনের পর ওই পদে বসবেন আসিম মুনির। ফলে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকবে না সেনাপ্রধানকে সরানোর ক্ষমতা। রাজনীতিবিদরা নামমাত্র থাকবেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন মুনির একাই। ইসলামাবাদের এক বিশ্লেষকের মন্তব্য, ‘এটি রক্তপাতবিহীন অভ্যুত্থান। সেনাবাহিনী বন্দুক ছাড়াই রাষ্ট্র দখল করছে।’ পাকিস্তানের ইতিহাসে সেনাশাসনের দৃষ্টান্ত নতুন নয়। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান, ১৯৭৭-এ জিয়া-উল-হক এবং ১৯৯৯-এ পারভেজ মুশারফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু আসিম মুনিরের কৌশল অনেক গভীরে। তিনি বন্দুক নয়, ব্যবহার করছেন সংবিধানকেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি একটি ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’, যার পরিণতিতে আগামীতে পাকিস্তান গণতন্ত্রের মেকি ছায়ায় থেকেও সামরিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে।
সবচেয়ে বিতর্কিত পরিবর্তন এসেছে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয়। এখন থেকে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে সেনাবাহিনীর হাতে। তৈরি হচ্ছে ‘জাতীয় কৌশলগত কমান্ডের প্রধান সেনানায়ক’ নামের নতুন পদ, যেখানে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়ছে। সাবেক মানবাধিকার মন্ত্রী শিরিন মাজারি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই সংশোধনী পারমাণবিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এখন থেকে যুদ্ধ কিংবা প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত এক ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে, যা গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে ভেঙে দেবে। অন্য দেশের পক্ষেও বিপজ্জনক হতে পারে।’
তবে এখানেই শেষ নয়। বিচারব্যবস্থার কাঠামোয়ও ঢুকছে সেনার প্রভাব। সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি হবে একটি নতুন আদালত— ‘ফেডারেল সংবিধানিক আদালত’ বা ‘এফসিসি’। সেখানে সংবিধান-সংক্রান্ত মামলাগুলির শুনানি হবে। কিন্তু এই আদালতের বিচারপতিরা নিযুক্ত হবেন সরকার ও সেনার যৌথ পরামর্শে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়বে। পাকিস্তানের খ্যাতনামা আইনজীবী মখদুম আলি খান বলেছেন, ‘এই পরিবর্তন পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থার জন্য মৃত্যুবার্তা। সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদা আর দেশের সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে থাকবে না— সে কেবলই একটি নিম্ন আদালকে পরিণত হবে।’ ব্যাপকহারে এই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আসিম মুনির পেতে চলেছেন ‘আজীবন দায়মুক্তি’। এর অর্থ, তিনি আজীবন পদমর্যাদা ও সুবিধা ভোগ করবেন এবং কোনো অপরাধ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগেও তাঁকে আইনের বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। পাকিস্তানের নাগরিক মহলের আশঙ্কা, এই আইন চালুর পর আসিম মুনিরকে কেউ ছুঁতে পারবেন না। তিনি সংবিধানের ঊর্ধ্বে অবস্থান করবেন, রাষ্ট্রের ভিতর এক সমান্তরাল রাষ্ট্র তৈরি হবে।
সংবিধান সংশোধন ঘিরে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার বলছে, এই সংশোধনীর লক্ষ্য দেশের প্রশাসনিক ও প্রতিরক্ষা কাঠামোতে সমন্বয় আনা। কিন্তু বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছেন, এটি আসলে শেহবাজ ও মুনিরের মধ্যে এক গোপন অশুভ আঁতাতের ফল। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পাক-সংসদে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে ওয়াকআউট করেছে। দলের মুখপাত্র জুলফি বুখারি বলেছেন, ‘এটি পাকিস্তানের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক। জনগণকে আবার একনায়কতন্ত্রের কাছে সঁপে দেওয়া হচ্ছে।’ তবে অবাক করা বিষয়, সাধারণ পাকিস্তানি নাগরিকদের মধ্যে এখনো তেমন প্রতিবাদ দেখা যায়নি। করাচি ও লাহোরের সংবাদমাধ্যমগুলির খবর, মানুষ এই পরিবর্তন নিয়ে দ্বিধায়— কেউ মনে করছেন, সেনাবাহিনীর হাতে দেশ নিরাপদ, আবার কেউ বলছেন, এটি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আত্মার বিনাশ। বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র ও সেনাশাসনের দ্বন্দ্বে পাকিস্তান বহু দশক ধরে দোদুল্যমান, কিন্তু এবার ইতিহাস যেন এক চূড়ান্ত মোড় নিতে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান প্রবেশ করছে এক ‘বৈধ সামরিক শাসন’-এর যুগে, যেখানে সংবিধানও থাকবে সেনার নিয়ন্ত্রণে। যা জিয়া-উল-হক চেয়েছিলেন, মুশারফ পারেননি, তাই বাস্তবায়িত করতে চলেছেন আসিম মুনির। বন্দুক নয়, সংবিধানের কলম দিয়েই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে এক নতুন সামরিক সাম্রাজ্য।
❤ Support Us








