Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ১৩, ২০২৫

পুলিশ মিউজিয়ামে এবার জনসমক্ষে শহিদ ক্ষুদিরামের ফাঁসির নথি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পুলিশ মিউজিয়ামে এবার জনসমক্ষে শহিদ ক্ষুদিরামের ফাঁসির নথি

‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি…’ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর-অক্ষয় নাম ক্ষুদিরাম বসু। মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাসতে হাসতে ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে শহিদ হয়েছিলেন তিনি, গেয়েছিলেন জীবনের জয়গান। মঙ্গলবার, সেই ফাঁসির রায়ের মূল নথি প্রকাশ্যে আনলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফোর্ট উইলিয়াম থেকে প্রাপ্ত ঐতিহাসিক দলিলটি দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। ঘোষণা করলেন, ‘এই নথি বাংলার গর্ব। জনগণের সামনে তা তুলে ধরা হবে। পুলিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হবে এই ঐতিহাসিক দলিল।’ জানা যাচ্ছে, মূল্যবান নথিটি রাখা হবে পুলিশের ইতিহাস কেন্দ্রিক মিউজিয়ামে, যাতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর কিশোরের আত্মবলিদানকে কাছ থেকে জানতে পারেন। ওই ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে, ‘ত্রৈলোক্যনাথ বসুর পুত্র ক্ষুদিরাম বসুকে মুজফ্‌ফরপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। সেশন কোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল খারিজ করা হচ্ছে।’ এই রায় দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কোর্টের দুই বিচারপতি, ১৯০৮ সালের ১৩ জুলাই।

তাঁর বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যার কণ্ঠে ছিল হাসি। শেষ ইচ্ছা ছিল মেদিনীপুরের মাটি ছুঁয়ে দেখা, দিদি-ভাগনের সঙ্গে দেখা করা, এবং কালীমায়ের পাদোদক পান করা। অথচ পূরণ হয়নি প্রায় কোনওটাই। ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৬ টায় মুজফ্‌ফরপুর জেলে যখন ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হয়, জল্লাদের দিকে তাকিয়ে তিনি শুধালেন, ‘ফাঁসির দড়িতে মোম দেওয়া হয় কেন?’ মৃত্যু যাঁকে স্পর্শ করেও স্পর্শ করতে পারেনি, সে কিশোরের নাম আজও বাংলার ঘরে ঘরে উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধা আর গর্বে। ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে জন্মানো ক্ষুদিরাম ব্রিটিশ রাজের শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন নির্ভীকভাবে। ১৯০৮ সালে অনুশীলন সমিতির সদস্য ক্ষুদিরাম, সঙ্গী প্রফুল্ল চাকীর সঙ্গে বিহারের মুজফ্‌ফরপুরে পৌঁছন ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব নিয়ে। বোমা ছোঁড়েন একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে, কিন্তু গাড়িতে ছিলেন না কিংসফোর্ড। মৃত্যু হয় ২ ব্রিটিশ নারী, কেনেডি মা ও মেয়ের। ঘটনার পর আত্মগোপনে যান ২ বিপ্লবী। ধরা পড়ার মুখে প্রফুল্ল আত্মঘাতী হন। গ্রেফতার হন ক্ষুদিরাম। আদালতে দাঁড়িয়ে সমস্ত দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। তাঁর বলিষ্ঠ জবানবন্দি তখন কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশদেরও। ফাঁসির আগের দিন আইনজীবী সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর কাছে ক্ষুদিরাম বলেছিলেন, ‘রাজপুত নারীরা যেমন আগুনে ঝাঁপ দিয়ে জহর ব্রত পালন করত, আমিও তেমন করেই আমার জীবন দিচ্ছি দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য।’ প্রবল আত্মবিশ্বাস আর জীবনবোধে বলিয়ান কিশোরের আত্মত্যাগ আজ ইতিহাস, কিন্তু সে ইতিহাসই যেন ক্রমাগত ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত এক হিন্দি ছবিতে শহিদ ক্ষুদিরাম বসুকে পরিচয় করানো হয়েছে ‘ক্ষুদিরাম সিং’ নামে। কেবল পদবি বদল নয়, বাংলার মেদিনীপুরের সন্তানকে দেখানো হয়েছে পাঞ্জাবি যুবক হিসেবে। বিষয়টি সামনে আসতেই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অভিযোগ তুলেছেন ভাষা সন্ত্রাসের। তাঁর প্রশ্ন, ‘স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের অপমান করার সাহস কে দিল?’ ইতিহাসবিদদের একাংশেরও মত, ভাষা বিকৃতি শুধু ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ নয়, এর পেছনে রয়েছে বিশাল চক্রান্ত। বাঙালির ঐতিহ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপুল ভূমিকা, লড়াইয়ের স্পৃহাকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করার প্রবণতার সঙ্গে এই ঘটনাকে একসূত্রে গাঁথছেন কেউ কেউ। তাঁদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে বাংলার বিপ্লবীদের অবদানকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার প্রয়াস চলছে। বেছে বেছে হিন্দি ছবিতে বাংলার বিপ্লবীদের পরিচয় বদলে দেওয়ার এই প্রবণতা তারই ইঙ্গিত দেয়। ভাষা সন্ত্রাস ও ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে সরব মুখ্যমন্ত্রী এদিন বিজেপিকে নিশানা করে বলেন, ‘ক্ষুদিরামের মতো পথিকৃৎ বিপ্লবীকে ‘সিং’ বানিয়ে, পাঞ্জাবি ছেলে বলে পরিচয় দিয়ে বাংলার আত্মত্যাগকে অপমান করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠুক বাংলা। বাংলার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ুক গোটা দেশে।’ ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির রায়ের সরকারি নথি, শুধু ইতিহাসের দলিল নয় বরং এক প্রতিজ্ঞার বার্তাবাহক। ভুলে যাওয়ার নয়, ভুলিয়ে দেওয়ার তো নয়ই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!