Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৮, ২০২৬

বারুইপুর ‘এনকাউন্টার’ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক তরজা, বিজেপির দাবি ‘দৈববিচার’, তৃণমূলে মতভেদ, বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাইল কংগ্রেস

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বারুইপুর ‘এনকাউন্টার’ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক তরজা, বিজেপির দাবি ‘দৈববিচার’, তৃণমূলে মতভেদ, বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাইল কংগ্রেস

বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি ‘এনকাউন্টার’-এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক । ঘটনাকে ঘিরে বিজেপি, তৃণমূল এবং কংগ্রেস সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে । এমনকি তৃণমূলের অন্দরেও এই ইস্যুতে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।

তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র পুলিশি এনকাউন্টারকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গে ‘উত্তরপ্রদেশ মডেল’ চালুর অভিযোগ তুলেছেন । সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এ সব কী হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ?” তাঁর কটাক্ষ, “বাঙালিরা দয়া করে নতুন বাংলা, অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশ ২.০-কে স্বাগত জানান।” মহুয়ার দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ ‘জঙ্গলরাজ’-এর পরিচায়ক এবং এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী । তিনি আরও বলেন, বিজেপির শাসনব্যবস্থা আসলে ‘জঙ্গলের আইন’-এর প্রতিফলন ।

মহুয়ার বক্তব্যে উঠে আসে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’র প্রসঙ্গও । তাঁর অভিযোগ, আগে পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ছিল না; বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর উত্তরপ্রদেশের ধাঁচের রাজনীতি ও প্রশাসনিক কৌশল এ রাজ্যে আমদানি করা হয়েছে । বারুইপুরের এনকাউন্টারেও পুলিশের ‘অতি সক্রিয়তা’র ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি ।

অন্যদিকে, তৃণমূলেরই আরেক অংশ এই ঘটনায় সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে । ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ শিবিরের নেত্রী এবং কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা বলেন, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুলিশ এনকাউন্টার করতে পারে । তাঁর বক্তব্য, “যদি কোনও অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশের উপর হামলা চালায়, তাহলে আইনি বিধান মেনেই এনকাউন্টার করা যায় । সরকার যা বলছে, তাতে আমরা ভরসা রাখছি ।”

শিউলি আরও বলেন, তৃণমূল সব সময় ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির পক্ষে । তিনি আরজি কর কাণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় আনা ‘অপরাজিতা বিল’-এর প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সরকার ধর্ষণের মতো অপরাধে কঠোর শাস্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে । তবে তাঁর মত, এনকাউন্টার যেন সর্বদা আইনের সীমার মধ্যেই এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে ।

এনকাউন্টারকে ‘ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার’ বা ‘দৈববিচার’ বলে দাবি করেছে বিজেপি । দলের মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, এই ঘটনা অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা । বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, সরকার দেখিয়ে দিয়েছে যে কোনও অপরাধীকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রক্ষা করা হবে না । তিনি একই সঙ্গে কামদুনি গণধর্ষণ ও খুনের মামলার প্রসঙ্গ তুলে সেই মামলার নথি নতুন করে খোলার দাবিও জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, কংগ্রেসের মতে, কোনও অভিযুক্তের শাস্তি নির্ধারণের একমাত্র পথ বিচারব্যবস্থা । কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী বলেন, “আগে আদালতে প্রমাণ হোক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা সত্য । বিচারব্যবস্থা ঠিক করবে তাঁর কী শাস্তি হবে। আমাদের আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে ।”

এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও তুলেছে কংগ্রেস । পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এনকাউন্টার নিয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকায় একটি পুকুর থেকে এক নাবালিকার দেহ উদ্ধার হয় । অভিযোগ, তাঁকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে । এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রথম গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্ত ছিলেন প্রভাস মণ্ডল ।

পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় প্রভাস এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন । তাঁকে আটকাতে গেলে তিনি একটি গুলিও চালান বলে অভিযোগ । আত্মরক্ষার্থে এবং তাঁকে নিরস্ত্র করতে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায় । গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রভাসকে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন ।
এনকাউন্টারের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে । একদিকে যেখানে বিজেপি এটিকে অপরাধ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতীক বলে দাবি করছে, সেখানে তৃণমূলের একাংশ ‘উত্তরপ্রদেশ মডেল’-এর অভিযোগ তুলছে এবং কংগ্রেস বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রেখে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছে । ফলে বারুইপুরের এই ঘটনা আইন-শৃঙ্খলার পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কেরও অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!